পুকুর চুরি থেকে সোনা চুরি- এরপর কী?

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৩ পিএম

পিসি সরকারের নাম-ডাক শুনেছি, কিন্তু তাঁর কেরামতি ঠিক সেভাবে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে জুয়েল আইচের কেরামতি দেখেছি তারিয়ে তারিয়ে। নিরীহ দর্শন দুই হাতের মুঠো থেকে কত কী যে গায়েব করেছেন তিনি! আর দর্শক সারি থেকে ভেসে এসেছে তুমুল করতালি।  সেই যে চোখ ছানাবড় হলো, তো হয়েই আছে এখনো। এখন আর জুয়েল আইচের দরকার হয় না তেমন। কাস্টমস থেকে শুরু করে রিজার্ভ, সব জায়গায় এখন ভালো করে চোখ রাখলেই এই গায়েব করার কেরামতি নজরে পড়ে। কখনো সোনা গায়েব হয় তো, কখনো স্বপ্ন, এমনকি পরিচয়।

এ অঞ্চলে জাদু মানেই হিংটিং ছট। এ যেন জাদুকরদের এক অমোঘ মন্ত্র, যা আওড়ালেই ঘটে যায় অভাবিত কোনো কিছু। যাত্রীবোঝাই ট্রেন থেকে শুরু করে হাতে রাখা রুমাল কিংবা কয়েন, কত কী চোখের সামনে থেকে গায়েব করেছেন তাঁরা। এমনকি মানুষও!

এখন আর স্বীকৃত জাদুকরের প্রয়োজন পড়ে না। গোটা দেশই যেন জাদুর মঞ্চ হয়ে উঠেছে। যে যেমনভাবে পারছে তার জাদুর রুমালটি একটু নেড়ে দিচ্ছে, আর অমনি সব গায়েব।

সর্বশেষ ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই স্থাপনার ভেতরে থাকা লকার থেকে সাড়ে ৫৫ কেজি সোনা গায়েব হয়েছে। এ নিয়ে আবার বড় হইচই চলছে। দেশের মানুষ এমনভাবে চোখ বড়বড় করে এ খবর পড়ছে বা দেখছে, যেন এমন কিছু কস্মিনকালেও তারা শোনেনি বা দেখেনি। যেন সোনা গায়েব হতেই পারে না।

কী অদ্ভুত! ‘পুকুরচুরি’ বলে শব্দবন্ধ যে দেশে চালু আছে সেই অনাদিকাল থেকে, সেই দেশের জনতার বিস্ময়-ক্ষমতা দেখলেও তাক লাগে। যে দেশের নানা অঞ্চলে সেতুর র‌্যাম্প থাকে তো সেতু থাকে না, সেতু থাকে তো র‌্যাম্প থাকে না, যে দেশে রাস্তার সমান্তরালেও সেতু তৈরির এক অভাবিত দক্ষতার নিদর্শন খুঁজলেই পাওয়া যায়, সে দেশে সামান্য সোনা চুরি নিয়ে এত হইচই হবে কেন?

চুরির তালিকা থেকে যখন ইট-কাঠ-কংক্রিট, নদীর বালু কিছুই বাদ যায় না, তখন সোনা আর কী দোষ করল। তার জন্মই তো হয়েছে চুরির জন্য। কারণ, সোনা, আর অর্থকড়ি তো সেই কবে থেকেই মোক্ষ। সে তো চুরি যাবেই। যতই পাহারা থাক।

পাহারা? সেও এক দারুণ ব্যাপার এই দেশে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তো সেই কবেই বলে গেছেন, ‘প্রহরী সেখানে চোখা চোখ নিয়ে সুন্দর শয়তান’। বিদ্রোহী কবি একটু বেশিই বলে ফেলেছেন? ছেড়ে দিন। বরং মহামতি চাণক্যের দিকে নজর দেওয়া যাক।

চাণক্য বলছেন, রাজ কর্মচারীর পক্ষে রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। কতটা অসম্ভব, তাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, জলের মাছ জল পান করছে, কি করছে না, তা যেমন নির্ণয় অসম্ভব, ঠিক তেমন রাজ কর্মচারীর তহবিল তসরুপও দেখা অসম্ভব।

তাহলে তো মিটেই গেল। এত হল্লা কেন তবে? হল্লার কারণও চাণক্য বলছেন, রাজ-সম্পদের কোনোরূপ বিঘ্ন উপস্থিত হলে প্রজার সম্পদের বিশেষ হানি হয়। এই সম্পদহানির রকম-সকম ঠিকঠাক না বুঝলেও আমরা প্রজাকূল ঠিক বুঝে যাই কী ক্ষতিই না হয়ে গেল। এটা অনেকটা গা শিরশিরিয়ে ওঠার মতো। কেন হচ্ছে বোঝা না গেলেও অনুভূতিটা হয়।

দেশের মানুষ সম্ভবত এই শিরশিরিয়ে ওঠার অনুভূতিতেই আছে। জাদুর মঞ্চের সামনে গোল হয়ে বসে থাকতে থাকতে গায়ে খিল পড়ে গেলেও আর নড়তে পারছে না ওই শিহরণের কারণেই।

সত্যিই রাস্তা-ঘাট, ছোট থেকে মাঝারি সেতুর র‌্যাম্প, রাস্তা, বাজারে গেলে চোখের সামনে পকেট কাটা ইত্যাদি নিত্য ঘটনা যখন ডাল-ভাতে পরিণত হয়, তখন তো আকর্ষণ টিকিয়ে রাখতে একটু-আধটু শিহরণের প্রয়োজন পড়ে। পুকুরচুরি থেকে রিজার্ভ চুরি- সবকিছুই গা সওয়া হওয়ার পরও আমরা মাঝে মাঝে শিহরিত হই। ফের গোল হয়ে বসি। কখনো ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে চুরির চেষ্টা, কখনো কোনো সিঁদ না কেটেই টাকা হাপিশ হতে থাকে। আমরা শিহরিত হই।

সোনা গায়েব তো সর্বশেষ সংযোজন। এর আগে কয়েক কোটি মানুষের জন্ম নিবন্ধনের তথ্য গায়েব হয়েছে সরকারি তথ্যভাণ্ডার থেকে। সুনির্দিষ্ট সংখ্যায় বলবার উপায় নেই। তবে গুঞ্জন আছে-সংখ্যাটি ৫ কোটির মতো।

শুধু গায়েব করাই এখানকার জাদুকরদের একমাত্র কেরামতি নয়। বরং নানামাত্রিক হাতসাফাই চলে প্রতিনিয়ত। রাস্তার পাশে প্রায়ই যেসব জাদুকরের দেখা মেলে, তাঁদের তো কত রকম কেরামতি আছে। তাঁরা প্রায়ই নিজের হাত থেকে গায়েব করা কয়েন বের করে আনেন অন্যের পকেট থেকে। কিন্তু এই জাদুবাস্তবতার দেশে গায়েব হওয়া কয়েন অন্যের পকেটে ঝকমকিয়ে উঠলেও তা ফেরত আর আনা যায় না।

তো এই যে দেশের অবস্থা, সে দেশের মানুষ সামান্য সোনা গায়েব নিয়ে এত হা-হুতাশ করলে চলবে? সে কি আর প্রশ্ন তোলার যোগ্যতা রাখে যে, কেন ওই জব্দ সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর না করে সাময়িকভাবে রাখার জন্য বরাদ্দ গুদামে দীর্ঘদিন রাখা হলো? কেন সেই গুদামের পাশ থেকে চোর আটকের ঘটনা দীর্ঘ এক মাস পর সামনে এল? কেন বিমানবন্দরের মতো কেপিআই এলাকায় কোনো লোকের অনুপ্রবেশ ও সে জন্য আটকের মতো ঘটনাকে ‘সামান্য’ বলে অভিধা দেওয়া হলো? কেন সোনা চুরি ও সেই চোর পাকড়াওয়ের ঘটনাকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত ছাড়াই ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে দাবি করা হচ্ছে?

এসব প্রশ্ন অবান্তর। কোনো মানেই হয় না। এসব প্রশ্ন তুললে শো-এর মজা শেষ। কে না জানে, ম্যাজিক শোয়ে এমন প্রশ্ন করলে প্রশ্নকারীকে দর্শকসারি থেকে উঠে যেতে হয়। এটাই নিয়ম। দেশ যতই জাদুবাস্তবতার হোক, হিংটিং ছটের হোক, নিয়মের ব্যত্যয় নৈব নৈব চ।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন 

বাংলাদেশে মবের ইতিহাস দীর্ঘ, যা ‘গণপিটুনি’ নামে পরিচিত। যদিও এই সংকট শুধু বাংলাদেশের একার নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ‘ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৫’ অনুসারে, দলীয়ভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে...
কুমিল্লার মুরাদনগরের এক হিন্দু নারী–তাঁর শরীর, আত্মা ও সম্মান–সবকিছু যেন এ রাষ্ট্র, এ সমাজ, এ সভ্যতার কাছে একবারে অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ, সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে...
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে এক আল্টিমেটাম শেষ হলো আজ সোমবার। প্রায় কাছকাছি সময়ের আরেকটি আল্টিমেটাম এসে হাজির। এবারও ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম। শেষ হবে আগামীকাল মঙ্গলবার। এই সময়ের মধ্যে পদত্যাগ...
‘রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে রাস্তায় প্রকাশ্যে স্বামী-স্ত্রীকে দা দিয়ে কুপিয়েছে বখাটে কিশোর চক্রের সদস্যরা। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই ২ হামলাকারীকে গণপিটুনি...
জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড আইআরজিসি।
যশোরের শার্শায় একই বাড়িতে বাবা ও দুই শিশু সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে শার্শা থানা-পুলিশ। শিশু দুটিকে হত্যার পর তাদের বাবা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। বিষয়টি...
রাজধানীর বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে ঘষামাজা করে চলছে আবারও চালুর প্রস্তুতি। তবে সংস্কারের কোনো অনুমতি ছাড়া এ ধরনের সংস্কারকাজ সম্পূর্ণ বেআইনি বলে...
খুলনা ভৈরব নদের জেলখানা ঘাট এলাকায় ট্রলার ও ফেরি সংঘর্ষে হয়েছে। এতে ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কেউ নিখোঁজ আছে কিনা তা...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর