‘রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে রাস্তায় প্রকাশ্যে স্বামী-স্ত্রীকে দা দিয়ে কুপিয়েছে বখাটে কিশোর চক্রের সদস্যরা। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই ২ হামলাকারীকে গণপিটুনি দিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশে সোপর্দ করে স্থানীয়রা।’
এটি একটি প্রকাশিত সংবাদের ভূমিকা। এর শিরোনাম হলো, ‘উত্তরার রাস্তায় প্রকাশ্যে কোপানো হলো স্বামী-স্ত্রীকে’।
এ ঘটনার অগ্রগতি হলো যে, জনতা কর্তৃক পুলিশে সোপর্দ করা ২ হামলাকারীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তবে এমন সংবাদের ক্ষেত্রে প্রথমেই যা উৎপাদিত হয়, তা হলো আতঙ্ক। ২ হামলাকারীকে গ্রেপ্তারের তথ্যের স্বস্তির তুলনায় এই প্রকাশ্যে কোপানোর আতঙ্ক বেশি সংক্রামক। এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এমন আতঙ্ক ক্রমশই প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। মানুষ ভয় পাচ্ছে। যদিও আমাদের দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাম্পতিককালেই বলেছেন যে, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো আছে। সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু উপদেষ্টার বলা এই ‘মোটামুটি ভালো’ আসলে কতটা ভালো?
একটি ঘটনা তো জানা হলোই। এমন আরও ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। এই মাসেরই শুরুর দিকে নাটোরের সিংড়ায় নামাজ পড়তে মসজিদে ওঠার সময় ওসমান গনি বাবু নামে এক চাল ব্যবসায়ীকে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। আবার এর পরদিনই রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ দুই পক্ষের গোলাগুলিতে দুজন আহত হয়েছে। চাইলে এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যাবে। কোথাও প্রকাশ্যে কোপানো হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে গুলি। এসবের পেছনে কখনও স্বার্থের সংঘাত দেখা যাচ্ছে, কখনও কেবলি ‘পেটি ক্রাইম’ হিসেবেই প্রতিভাত হচ্ছে। ইদানিং এসব অপরাধের খবরই যেন সংবাদমাধ্যমে বেশি আসছে।
আরও পড়ুন:
এই সর্বশেষ কথাটিতে কেউ কেউ আপত্তি জানাতেই পারেন। কিন্তু পরিসংখ্যান সেই আপত্তি মেনে নিতে দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রে, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) বা অন্য যেসব সংস্থা নানা অপরাধের পরিসংখ্যান প্রকাশ করছে, সেগুলোতেই স্পষ্ট যে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনমন ঘটেছে। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। বেড়েছে ছিনতাই, রাহাজানিও। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি বেড়েছে, সেটি হলো নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি। চাইলেই আশপাশের ১০ জনকে জিজ্ঞেস করে দেখা যায়। দেখা যাবে যে, বেশির ভাগের মধ্যেই এই ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আছে। পরিচিত এক বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তি তো প্রয়োজন থাকলেও দুটি মোবাইল ফোনসেট নিজের কাছে রাখতে এখন ভয় পান! কারণ উনি আস্থাহীনতায় ভুগছেন। এবং এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোরই, তথা সরকারেরই।
আরও পড়ুন:
অথচ বেশ কিছুদিন আগে মোবাইল ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়ে পুলিশের এক বড়কর্তা দিয়েছিলেন মোবাইল ফোন নিরাপদে রাখার বয়ান। নাগরিকেরা আসলে কীভাবে নিরাপদে রাখবে? ব্যাংকের লকার সাথে করে নিয়ে ঘুরবে? এগুলো মূলত অহেতুক উপদেশ। এর চেয়ে সোজা ভাষায় বলে দিলেই তো হয়—‘আমরা পারছি না, আপনারা নিজেদেরটা নিজেরা বুঝে নেন’! পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজই হলো নাগরিকের মনে নিরাপদবোধের অনুভূতির জন্ম দেওয়া। কিন্তু সেই কাজেই বাহিনীগুলো তথা সরকার এখন পর্যন্ত ব্যর্থ।

এই যেমন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজধানীতে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে অংশ নিয়ে মন্তব্য করলেন এই বলে যে, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো আছে। সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ‘মোটামুটি ভালো’—এই শব্দবন্ধের অর্থ কি? অবশ্যই খারাপের থেকে বেশ ঊর্ধ্বে এবং একেবারে ‘ভালো’ থেকে কিছুটা নিচে। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যানই এই বিশেষণের পক্ষে কথা বলছে না। বাংলাদেশের পুলিশের দেওয়া ক্রাইম স্ট্যাটিসটিক্স অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সারা দেশে নানা ধরণের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মোট ৪ হাজার ৪৬১টি। ওই মাসে সারা দেশে মোট মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৬২২টি। অপরাধে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর। মোট রেঞ্জ আছেই ৯টা। এর মধ্যেই ৫টাতেই দেখা যাচ্ছে বাড়বাড়ন্ত। আর নতুন বছরের প্রথম মাসে সারা দেশে মোট মামলা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৭২টি। মোট অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ৪ হাজার ৬৯২টি। অপরাধের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রেঞ্জগুলোর মধ্যে কেবল খুলনা ছাড়া আর সবগুলোতেই সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমেনি।
আরও পড়ুন:
পুলিশের নিজেদেরই দেওয়া এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ থেকেই বোঝা যায় যে, অপরাধের সংখ্যা বেড়েছেই, কমেনি। তাহলে এই পরিস্থিতি কোন দিক দিয়ে ‘মোটামুটি ভালো’র তকমা পায়? হ্যাঁ, এখন যদি বাংলা বিশেষণের অর্থ বদলে দেওয়া হয়, তবে ভিন্ন কথা। অথবা ভালো–মন্দ পরিমাপের যুক্তি(কু!) হিসেবে যদি বলা হয় যে, ‘রাস্তায় নামামাত্রই এখনও তো কেউ আপনাকে লুটে নিচ্ছে না’, তাহলে ঠিকই আছে।
যে কোনো সময়ই সমস্যার ঊদ্ভব হতে পারে। একটি দেশের ক্ষেত্রে সেটি আরও বড় সত্য। দেশ মানে ভৌগোলিক আয়তনের হিসাবে বেশ বড় এক এলাকা। আইনশৃঙ্খলাজনিত নানা সমস্যাই দেখা দিতে পারে। তবে এসব সমস্যার কার্যকর সমাধানের প্রধান শর্তই হলো, আগে সমস্যাটির অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া। তবেই এর সঠিক সমাধানের দিকে এগোনো যাবে। শুধু বিশেষণমূলক শব্দ ব্যবহার করে বার বার ‘ভালো’ বলতে থাকলেই, সেটি ভালো হয়ে যাবে না। যারা পুরস্কারটি দেবেন, অর্থাৎ এ দেশের হতভাগ্য জনতা, তাদের ভালোবোধ করতে হবে আগে। কিন্তু সেই জায়গাটিতেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি।
ফলে বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছু আসলে হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে আড়াই লাখ বুলেট ও ১ হাজার ৪০০ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকদের সম্প্রতিই নির্দেশনা দিয়েছেন প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অব. লে. জে. আব্দুল হাফিজ। এই একটি তথ্যই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা বোঝাতে যথেষ্ট।
আরও পড়ুন:
এখন আসলে প্রয়োজন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ। জনগণকে এই অনুভূতি উপহার দিতে হবে যে—২৪ ঘন্টা দৈর্ঘ্যের একটি দিনের যে কোনো সময়ই তারা বাড়ির ভেতরে বা বাইরে নিরাপদে থাকতে পারবে। বিপদে পড়লেও সরকার কর্তৃক সহায়তা পাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে। জনগণকে এতটুকু নিশ্চয়তা না দিতে পারলে আদতে সরকারের কোনো পদক্ষেপই দিনশেষে সর্বাগ্রে সফলতা পাবে না। কারণ মানুষ যদি নিজের জানমালের নিরাপত্তা নিয়েই সন্দিহান থাকে, তবে আর অন্য কোনো কিছুতে আস্থা রাখবে কী করে?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


নাটোরে মসজিদে ওঠার সময় ব্যবসায়ীকে গুলি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো আছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
এখনো উদ্ধার হয়নি ৫ আগস্টের পর লুট হওয়া ১৪০০ অস্ত্র, আড়াই লাখ বুলেট
