আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা দিবস। ৫৩ বছর আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠে ঘোষিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটে। নতুন সূর্যের আলোর মধ্যে দিয়ে এই দিনে আমাদের জাতীয় জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশকে স্বাধীন করতে বাঙালিরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের নাগপাশ থেকে নিজেদের মুক্ত করবে। আপন পরিচয় খোঁজার লক্ষ্যে সেদিন বাঙালি জাতি গর্জে উঠেছিল। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি অর্জন করেছিল স্বাধীনতার সোনালি সূর্য। আজকে স্বাধীনতা দিবসের আনন্দোজ্জ্বল মুহূর্তের মধ্যে প্রথমেই যে কথা মনে পড়ে, তা হলো এ দেশের অসংখ্য দেশপ্রেমিক শহীদের আত্মদান। আজ ব্রিটিশদের শাসন নেই, পাকিস্তানিদের অত্যাচার–বৈষম্য নেই, নেই কোনো জমিদারি। আজ বাঙালি স্বাধীন।
২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা হঠাৎ সৃষ্ট কোনো আবেগময় ঘোষণা নয়। এর পেছনে রয়েছে বাঙালির আত্মত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রামের সুদীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস। মোহম্মদ আলী জিন্নাহ’র দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তখন বাংলার এই অংশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। দীর্ঘদিনের ইংরেজ শোষণ-শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার সুবাতাস পাবে, তা ছিল এই অঞ্চলের মানুষের একান্ত প্রত্যাশা। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও এ অঞ্চলের মানুষের শোষণ থেকে মুক্তি ঘটেনি। নিজ ভূমিতে অত্যাচার ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ফলে স্বৈরাচারি শাসক গোষ্ঠীর যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকা মানুষের মনে ধীরে ধীরে দানা বাঁধে স্বাধীনতার স্বপ্ন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর মন্ত্রমুগ্ধময় ভাষণে পুরো জাতি এক কাতারে এসে দাঁড়ায়।
মূলত এই একটি বাক্যের মাধ্যমে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সুগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে প্রেরণা পেয়ে সেদিন বাঙালি জাতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল, রক্ত দিয়ে হলেও এ দেশকে স্বাধীন করবে। ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর কর্মকাণ্ড দেখে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানিরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। সংগ্রাম করেই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য তিনি তাঁর ভাষণে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে স্বাধীনতার দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।
তিনি পাড়া-মহল্লায় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ‘যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে প্রস্তুত’ থাকার কথা বলেন। ‘ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলা’র কথা বলেন। এভাবে তিনি মূলত একটি স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা প্রদান করেন।
স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম একদিনে সংঘটিত হয়নি। বহুদিন ধরে ধীরে ধীরে এ সংগ্রাম মহীরুহ রূপ পেয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম ধাপ। ইতিহাসবিদদের মতে, ভাষা আন্দোলনেই স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। এরপর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা প্রণয়ন ও তৎপরবর্তী আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রভৃতি ঘটনার মধ্যেই স্বাধীনতার স্বপ্ন নিহিত ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এ দেশের মানুষ ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছিল। নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। এরই মধ্যে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে আসতে থাকে অস্ত্র আর সামরিক বাহিনী। এরপর ‘পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নয়, মাটি চাই’ বলে হানাদার বাহিনীকে নির্দেশ প্রদান করে ঢাকা ত্যাগ করেন পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য গণহত্যার হোতা ইয়াহিয়া খান।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারেই শুরু হয় ইতিহাসের ঘৃণিত হত্যাযজ্ঞ, যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত। এ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায় নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। তারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। ইতিহাসের ঘৃণ্যতম এ গণহত্যাই বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলনকে চরমতম রূপ দেয়। মধ্যরাতের পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেপ্তারের পূর্বেই; অর্থাৎ, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে গোপন তারবার্তায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর স্বাক্ষরিত ঘোষণাবার্তাটি তৎকালীন ইপিআরের ট্রান্সমিটারের সাহায্যে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়। এরপর চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ ও ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৬শে মার্চ দুপুরে এম এ হান্নানও চট্টগ্রামের কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম।
দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসে এ দেশের মানুষ প্রাণ দিয়েছে, অত্যাচারিত হয়েছে, মা-বোনেরা সম্ভ্রম হারিয়েছে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, গ্রামের পর গ্রাম। হানাদার পাকিস্তানিদের দোসর এ দেশের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিবাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানিদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। মুক্তিপাগল এ দেশের মানুষ সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য মুক্তিবাহিনী গঠন করে। এ দেশের ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, ইপিআর, পুলিশ, সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসানের মাধ্যমে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে।
আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ৫৩ বছরে পদার্পণ করেছে। তাই পেছন ফিরে তাকালে আমাদের স্বস্তির অনেক কারণ পাওয়া যায়। অন্তত এ ৫৩ বছরে আমাদের অর্জন খুব একটা কম নয়, এক কথায় অসামান্য। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের সময় পৃথিবীর অন্যতম দারিদ্র্যপীড়িত দেশ ছিল এটি। মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরে এসে আজ তা নেমে এসেছে ২০ শতাংশের নিচে, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে নির্দেশ করে। দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বর্তমান সরকার, তথা দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার অদম্য সাফল্য। গত এক দশকে বাংলাদেশের স্থিতিশীল জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন, এমনকি মহামারির সময়ও এ দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে।
আমরা এখন উন্নয়ন মহাযজ্ঞের সুবিশাল যাত্রা অতিক্রমের মহাসন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত রূপান্তর ও উল্লেখযোগ্য সামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক। লিঙ্গ সমতা, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুন্দ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলো সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপের কারণে।
২৬ মার্চ আমাদের জাতির আত্মপরিচয় অর্জনের দিন। পরাধীনতার শিকল ভাঙার দিন। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। অনেক রক্ত, ত্যাগ–তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। আমরা এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক। এ স্বাধীনতাকে আমাদের যেকোনো মূল্যে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থী কোনো কাজে লিপ্ত না হয়ে স্বনির্ভর, সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করতে হবে সকলকে। সুখী, সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়তে পারলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হবে। তাই স্বাধীনতার মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য মনে করা উচিত। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের এই মৌলিক চেতনা সবাইকে অনুপ্রাণিত করুক—এটাই মহান স্বাধীনতা দিবসে প্রত্যাশা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক: প্রক্টর ও সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক সমিতি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



