প্রচারের ভারত, বাস্তব ভারত

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৬ পিএম

ভারতের জাতীয় নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, নানা আলোচনা তত ডালপালা মেলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, জিডিপি, দুর্নীতি, কর্মসংস্থান, বেকারত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, নির্বাচনে কারচুপি, সহিংসতা ইত্যাদি নিয়ে যেমন বোদ্ধা মহলে আলোচনা চলছে, তেমনি আলোচনা চলছে চায়ের দোকানে খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যেও। এটাকে বলে ‘ভোটের সংস্কৃতি’।

ভোটের সংস্কৃতির এই চিত্র শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়, বরং সারা বিশ্বে কম-বেশি একই রকম। আমেরিকায় বিতর্ক হয় টেলিভিশনের পর্দায়, আমরা বিতর্ক করি চায়ের টেবিলে। পার্থক্য এটুকুই। এর বাইরে সব দেশের মানুষই ভোটের আগে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, আগের পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে থাকে।

ভারতের নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে ও’হেনরি পুরস্কার পাওয়া প্রখ্যাত লেখক অমর মিত্র দ্য হিন্দু পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ভারতের নির্বাচনী পরিবেশ সত্তরের দশকে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। খুব বেশি এদিক-ওদিক হয়নি। তখনো নির্বাচনে কারচুপি হতো, এখনো হয়। ১৯৭১ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে নির্বাচনী পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে, জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছিল। তবে ১৯৭৭ সালের নির্বাচন কিছুটা ভালো ছিল। ১৯৮৭ সালে বাকুঁড়ার এক ভোটকেন্দ্রে আমি প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। ওই দিন বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শুরুই করতে পারিনি আমরা, একজন পঞ্চায়েত প্রধানের বাধার কারণে।’

সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পাওয়া পশ্চিবঙ্গের এই বর্ষীয়ান লেখক যে খুব একটা ভুল বলেননি, অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিও যে অনেকটা তেমনই রয়ে গেছে, তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে চোখ বুলালেই প্রমাণ পাওয়া যায়। মোদি সরকারের শাসনামলে গত নির্বাচনেও উত্তর প্রদেশের ভোটে ইভিএমের মাধ্যমে ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা মায়াবতী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেনসহ অনেক নেতা। এবারের নির্বাচনেও নানা উপায়ে কারচুপি হবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক রাজনৈতিক নেতাই।

কারচুপির পর এই মুহূর্তে ভারতে আরেকটি জনপ্রিয় আলোচনার বিষয় মোদি সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দেশটির বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, উন্নয়নের চেয়ে উন্নয়নের ডঙ্কা নিনাদ বেশি। মোদি সরকার যতটা না উন্নয়ন করেছে, তার চেয়ে ঢাকঢোল পেটায় বেশি। মোদির এ উন্নয়নের গল্প ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বৈ অন্য কিছু নয়।

ভারতীয় আরেক লেখক ও ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জয়তী ঘোষ বলছেন, ‘ভারত এখনো নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ, আমাদের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ডলারেরও কম।’

তার মানে কি ভারতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়নি? আলবৎ হয়েছে। তবে তা হয়েছে সমাজের ওপরতলার কুড়ি শতাংশ মানুষের। আর ৮০ শতাংশ মানুষ আরও নিঃস্ব হয়েছে। এ কারণে মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে আদানি-আম্বানিরা ফুলেফেঁপে উঠেছেন, ঢুকে গেছেন বিশ্বের শতকোটিপতির তালিকায়।

সম্প্রতি প্রকাশিত ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার ইনডেক্স বলছে, বিশ্বের ৫০০ বিলিয়নেয়ারের মধ্যে গত এক বছরে ৫৪ জন ধনকুবেরের সম্পত্তি বেড়েছে। এদের মধ্যে ১০ জনই ভারতের। আর এই দশজনের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি সম্পদ বেড়েছে মুকেশ আম্বানির। সম্পূরক তথ্য হিসেবে বলে রাখা ভালো, এ বছরের ফোর্বসের তালিকায় ভারত থেকে ২০০ জন শতকোটিপতি স্থান করে নিয়েছেন। সুতরাং ওপরতলার ১০ থেকে ২০ শতাংশ ধনীদের সম্পদ যে হু হু করে বাড়ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু নিচতলার কী অবস্থা? ভারতের নিম্নশ্রেণির মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জানা আসলে খুবই দুষ্কর। কারণ ২০১১-১২ সালের পর থেকে নাগরিকদের গড় ব্যয় সম্পর্কে কোনো তথ্যই প্রকাশ করেনি ভারত। ফলে দেশটিতে আয়বৈষম্য ও দারিদ্র্য ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা হলফ করে বলা বেশ কঠিন। অথচ প্রতি পাঁচ বছর পরপর জনগণের আয়-ব্যয়ের সমীক্ষা হওয়ার কথা।

এরপর প্রতি দশ বছর অন্তর অন্তর জনশুমারি হওয়ার কথা। ২০২১ সালে সেটি হওয়ার কথা থাকলেও মোদি সরকার অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত জনশুমারি স্থগিত করেছে। ফলে ভারতের সঠিক জনসংখ্যা কত, তারা কোথায় থাকে, কীভাবে থাকে, তাদের জীবনযাত্রা কেমন, মাথাপিছু আয় কত–এসব ব্যাপারে সঠিক কোনো তথ্যই নেই জনগণের কাছে।

আরেকটি আলোচনার বিষয় হচ্ছে কর্মসংস্থান। ভারতে বেকারত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের কাজ দিতে পারছে না ভারত সরকার। গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ শতাংশে। একই সময়ে তার আগের বছরে সংখ্যাটি ছিল সাড়ে ৪৩ শতাংশ।

বেকারত্ব বেড়েছে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যেও। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি বলছে, গত বছরের শেষ প্রান্তিকে বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

খোদ সরকারি সমীক্ষাই বলছে, গত এক দশক ধরে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে ভারত সরকার। সরকারি শ্রম-সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ২০১১-১২ সালে দেশের জনসংখ্যায় শ্রমশক্তির অনুপাত ছিল ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে সেটি নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশে।

ভারতের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের চিত্র আরও ভয়াবহ। অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িত কাজের সঙ্গে মাত্র ১৩ শতাংশ নারী জড়িত। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের এই চিত্র নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক।

যা হোক, ভারতে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যে বেকারত্বের অভিশাপে পুড়ছে, তাতে সন্দেহ নেই এবং জিডিপির গল্প যে অন্তঃসারশূন্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বিপুলসংখ্যক তরুণ স্বাভাবিকভাবেই চাইবেন তাঁদের ভাগ্য বদল করতে। চাইবেন কোনো একটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নিজের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে। কিন্তু সরকার সেই সুযোগ করে দিতে পারছে না। এর প্রতিফলন নিঃসন্দেহে ভোটের মাঠে পড়বে। তরুণ ভোটারেরা এমন জনপ্রতিনিধিদেরই বেছে নিতে চাইবেন, যারা তাদের কর্মের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।

অমর মিত্র যেমনটি বলেছেন, সত্তরের দশকের তরুণেরাও তাঁকেই ভোট দিতে চাইতেন, যাঁরা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন বলে বিশ্বাস করতেন তরুণেরা। এখনকার তরুণেরাও সেটিই চাইবেন।

এসব ছাড়া মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি তো নিত্যদিনের আলোচনার বিষয়। ভোটের আগে আলোচনাগুলো আরও বেগবান হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই মোদি সরকারের। বরং সকারের আর্থিক নীতি কেন্দ্রীভূত হয়েছে অল্প কিছু করপোরেট পুঁজিপতিকে ঘিরে। তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিতে যত রকমের কালাকানুন বানানো প্রয়োজন, তার সবই বানিয়েছে মোদি সরকার। ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোগগুলো। অথচ এসব উদ্যেগের ওপরেই দেশের বেশির ভাগ শ্রমশক্তি নির্ভরশীল।

চায়ের কাপে ঝড় তোলা এসব আলোচনা নিঃসন্দেহে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে অনেক প্রভাব রাখবে। নাগরিকেরা নিশ্চয় এমন সরকারকেই ক্ষমতায় চাইবেন, যারা অর্থনীতিকে সুস্থির করতে পারবে, কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে এবং ধনী-গরিবের ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ নেবে।

লেখক: সহসম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির...
ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
ভারতে এই প্রথম ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাপানি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাকেদা বায়োফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকাটি বাজারজাতকরণের আনুষ্ঠানিক অনুমতি...
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।
ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথ রবিবার উত্তাল হয়ে ওঠে নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আয়োজিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর...
বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে এবার বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে লিওনেল মেসির দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নামার আগে সতীর্থদের উদ্দেশে মেসির দেওয়া সেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এখন সামাজিক...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর