প্রিয় ঋতু বর্ষা তাই...

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:৩২ পিএম

বর্ষা এক প্রশান্তির ঋতু। প্রচণ্ড দাবদাহের পর পৃথিবী শান্তি পায় বর্ষার শান্তিবারি বর্ষণে। ধুলি-ধূসর ধরণী বর্ষার সুশীতল স্পর্শে সজীব হয়ে ওঠে, প্রকৃতি ফিরে পায় তার হারানো সৌন্দর্য। ঘামে ভেজা শরীর নববর্ষার জলের ধারায় সিক্ত হতে উন্মুখ হয়। একটু বৃষ্টিতে পথঘাটে মানুষের আনন্দ চোখে পড়ার মতো। গ্রামে শহরে শিশুরা জল-কাদায় মাখামাখি হয়ে আনন্দে উদ্বেল হয়। মায়ের শাসনের কড়া চোখ এড়িয়ে পাওয়া এই আনন্দ যেন স্বর্গ সমান। রুক্ষ ধরিত্রী রসসিক্ত হয়ে কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়। খাল-বিল নতুন জলের আগমনে মাছেরা খলবলিয়ে ওঠে। কোনো কোনো মাছ মেঘের গর্জন শুনেই পাড় বেয়ে উঠে আসে। আশপাশের বসতির শিশু ও নারীরা খলই হাতে ছাতা মাথায় হাজির হয়ে যায় জলাধারের ধারে—সে রাতই হোক বা দিন। রাত হলে হাতে থাকে টর্চ বা হারিকেন। শ্যেন দৃষ্টিতে খুঁজতে থাকে মাছের সারি। কারও কারও খলই ভরে ওঠে, তার আনন্দের সীমা থাকে না। তখনই কাছাকাছি ঘর থেকে ভেসে আসে খিচুড়ি আর মরিচ পোড়ার ক্ষুধা উসকে দেওয়া ঘ্রাণ। পেটে তখন ছুঁচোর ডন। খলই হাতে কচিকাঁচারা দৌড় লাগায় বাড়ির দিকে।

বাড়ি পৌঁছালে কাদামাখা সন্তানকে দেখে রেগে ওঠার আগে হাতের খলইটি বাড়িয়ে দেয় বুদ্ধিমান শিশু। মায়ের মুখ খলইয়ে তোলপাড় করা মাছগুলো দেখে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবুও সন্তানকে কপট বকুনি দিয়ে হাত থেকে মাছভর্তি খলইটা নিয়ে স্নানে পাঠান। মায়ের ঠোঁটের কোণে তখন সন্তান স্নেহ আর প্রাপ্তির আনন্দ।

লোকে বলে বর্ষায় বেড়ানো মাটি হয়ে যায়। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, সমুদ্রস্নানে বর্ষা অনবদ্য। সমুদ্র ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে আকাশ থেকে ঝরে পড়া অবিরত জলধারায় অবগাহন এক অনির্বচনীয় অনুভব। বর্ষায় পাহাড়ে বেড়াতে গেলে নবধারায় স্নাত বৃক্ষরাজির সিক্ত সবুজ চোখের আরাম আর মনের প্রশান্তি। ঘরেও যদি থাকি গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে বারিধারা স্পর্শ করে শিহরিত হওয়া। কখনোবা ছাদবাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে অবিশ্রান্ত জলধারায় অবগাহন বর্ষার আরেক প্রাপ্তি।

শহরের পথঘাট অব্যবস্থা আর নির্মাণ ত্রুটির কারণে জল থৈ থৈ হয়, মানুষের চলাচল সমস্যা হয়; তবে সে অপরাধ তো আর বর্ষার নয়। গ্রামে দূরদূরান্তে স্কুল-কলেজ বা কাজে যাওয়া কষ্টকর হয়ে ওঠে, সে কথা অসত্য নয়। তবে চাষাবাদের জন্য বর্ষা বড়ই সহায়ক। অতিবর্ষণ আবার ফসলের ক্ষতিও করে। বর্ষার পানিতে ডুবে ধান বা অন্য ফসল নষ্ট হয়ে গেছে—এমন অবস্থাও দেখা যায়। বেশির ভাগ সময় বর্ষাকালেই অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে বন্যা হয়। তখন মানুষের দুর্গতির অন্ত থাকে না। ঘরবাড়ি ডুবে যায়। জানমালের ক্ষতি হয়। গবাদি পশু বাঁচানো যায় না। ঘর ভেঙে যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েও রক্ষা পান না অনেকে। ডায়রিয়া, সাপের কামড়, টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হন মানুষ।

গরমে অতিষ্ট হয়ে নারী শিশুরা ‘আল্লাহ্ মেঘ দে পানি দে’ গান গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুষ্টিধান সংগ্রহ করে। সেই ধানে সিন্নি রান্না করে জলের দেবতাকে পূজা দিয়ে তুষ্ট করা হয় বৃষ্টি দেওয়ার জন্য। দেবতা তুষ্ট হন কিনা জানি না বৃষ্টি নামে দু একদিনেই। অপরদিকে অনবরত বর্ষা বন্ধের জন্য মায়ের একমাত্র সন্তানকে এক ঘটি জল দিয়ে উঠানে পাঠিয়ে একটা জল চৌকিতে রাখতে বলা হয়। কিছুক্ষণ পরই বৃষ্টি থেমে যায়। এগুলো অবশ্যই কাকতালীয়, তবুও বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। তবে এগুলো আমাদের লোকাচারের অংশ হয়ে আছে। এই আচারগুলো আমাদের দেশজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

বর্ষার গানে কবিতায় বাংলা সাহিত্য ঋদ্ধ। বর্ষা বন্দনায় মুখর বাঙালির কাব্যচর্চা। বর্ষাকালে আকাশে মেঘের আনাগোনা, রঙ বদলানো সবই দেখার বিষয়, অনুভবেরও। তেমনি বৃষ্টির নানান ধারায় ঝরে পড়াও দ্রষ্টব্য। কখনো ঝিরঝির বৃষ্টি, কখনো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, কখনো মুষলধারে বৃষ্টি, কখনোবা সাময়িক বিরতিতে বৃষ্টি এসবেরই বর্ণনা পাওয়া যায় গল্প, উপন্যাস বা ছন্দবদ্ধ কবিতায়। বর্ষার নূপুর-নিক্কন বাঙালির মনে দোলা দেয়। তাই বর্ষা রোম্যান্টিক আবেগী বাঙালির উদ্‌যাপনের। সেজন্যই শহুরে বাঙালি কঙ্ক্রিটের শহর জীবনকে আনন্দমুখর করতে আষাঢ়ের প্রথমদিনে বর্ষার আগমনবার্তা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয় গান-নাচ-আবৃত্তির পরিবেশনা আর কথকতায়। বৃক্ষমেলা হয় এ সময়ে। শান্তিনিকেতনে কবিগুরু বৃক্ষরোপণ উৎসবের প্রচলন করেছেন বর্ষাকালে। এদিন গাছের চারা হাতে ‘মরু বিজয়ের কেতন উড়াও হে শূন্যে…’ গানটি গেয়ে আশ্রম শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদক্ষিণ করে।

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বর্ষাকে আবাহন করে বর্ষা উৎসব উদযাপন করে। শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়, তারপর একই অনুষদের লিচুতলায় বর্তমানে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়। গান, নৃত্য, কথিকা, আবৃত্তি,  নাটিকা ইত্যাদি নিয়ে উদীচীর বিভিন্ন শাখার শিল্পীরা উপস্থিত হন অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে। দেশবরেণ্য আমন্ত্রিত শিল্পী, অতিথিবৃন্দও আসেন উৎসবের আনন্দ ও পরিবেশনায় পালক যুক্ত করতে। উদীচীর বর্ষা উৎসব এগিয়ে যাক সমুখপানে। শুধু সাংস্কৃতিক পরিবেশনাতেই নয়, প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে উদীচী যেন বাংলার শ্যামলিমাকে রক্ষা করতে পারে এই প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

সংগীতের যেমন নিজস্ব সুর ও তালের স্থাপত্য আছে, আবৃত্তিরও তেমনি শব্দ ও নৈশব্দের নিজস্ব পরিমিতি ও কণ্ঠশৈলীর কারুকাজ আছে, যা একে অন্য যেকোনো পারফর্মিং আর্ট থেকে এক অনন্য উচ্চতা ও স্বকীয় মর্যাদা প্রদান...
আমি একজন মধ্যমমানের ছাত্রী ছিলাম, যার কারণে স্যারকে নিয়ে আমার পড়াশোনা সংক্রান্ত স্মৃতি নেই, বলা যায়। আমি এবং আমার মতো অনেকেই এসএমআই (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) স্যারকে পেয়েছি কখনও বাবার মতো, কখনও বড় ভাই...
‘বাড়ির কাছে আরশী নগর, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’–এই পঙ্‌ক্তিটি যখন ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ধ্বনিত হতো, তখন সেটা শুধু সুর নয়, ছিল আত্মার এক নিঃশব্দ আকুলতা। লালনের সহজিয়া দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে যিনি...
সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
খাবার আর ওষুধসহ নানা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে বিপাকে বগুড়ার মুরগির খামার ও হ্যাচারি ব্যবসায়ীরা। জেলার ৫ হাজারেরও বেশি খামার ও হ্যাচারি মধ্যে, গত ৩ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার প্রতিষ্ঠান। এতে বেকার...
১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক,...
খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলার এলজিইডি নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি সড়কের ২১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহালছড়ির মুবাছড়ি ও পানছড়ির নালকাটায়...
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘দেশের চিকিৎসা খাতের ঘাটতি দূর করে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে সরকার। তৃণমূলের মানুষ ভিআইপিদের...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর