কী অদ্ভুত বৈপরীত্য। আবার কী অসাধারণ মিল। ১৯৮১ সালের ১৭ মে, রোববার। ওই দিন বিকেল সাড়ে চারটায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান শেখ হাসিনা। তাঁকে স্বাগত জানাতে ঢাকায় তৎকালীন কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সোমবার। সারা দেশের মানুষ ভেঙে পড়েছিল রাজধানী ঢাকায়। অভিমুখ ছিল শেরেবাংলা নগর, শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবন। উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো। জনসমুদ্রের উত্তাল ঢেউ গণভবনে পৌঁছানোর আগেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করলেন শেখ হাসিনা। ৪৩ বছর ২ মাস ১৯ দিনের ব্যবধানে দেশের একটি বড় দলের প্রধানের কী নির্মম পরিণতি।
১৯৮১ সালের ১৭ মে ঝড়-বাদল আর জনতার আনন্দ অশ্রুতে অবগাহন করে লাখো মানুষকে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’ অথচ গত ৫ আগস্ট তিনি দলের লাখো নেতা-কর্মীকে ফেলে নিরাপদস্থানে চলে গেলেন। প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফেরেন শেখ হাসিনা, আর এবার স্বেচ্ছায় স্বদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর মা আর রাজনীতি করবেন না। বাংলাদেশেও ফিরবেন না। অথচ গত ২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকে শেখ হাসিনা গভীর আস্থার সাথে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা কখনো পালায় না।
মিলের জায়গাটা যদি দেখি, তাহলে দেখব ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনা কলকাতা হয়ে ঢাকায় ফিরেছিলেন। আবার ঢাকা থেকে তিনি নয়াদিল্লিতে ফিরে গেলেন। ১৯৭৫-র পরবর্তী সময়ে নির্বাসিত জীবনের সাড়ে ছয় বছরের অধিকাংশ সময় শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের দিল্লিতেই কেটেছে, ভারত সরকারের আশ্রয়ে। এবার গত ছয় দিন (৫ আগস্ট থেকে) তিনি দিল্লি বা দিল্লির নিকটবর্তী কোনো নিরাপদ সরকারি ভবনে আছেন। এখন প্রশ্ন হলো কতদিন তিনি এভাবে ভারতে থাকবেন? নরেন্দ্র মোদি সরকার কী অনির্দিষ্টকালের জন্য এই সুযোগ দেবে? সেটা দিতেই পারে। কারণ আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার পরিবারের ব্যাপারে ভারতে এক ধরনের রাজনৈতিক মতৈক্য আছে। অন্য সব বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও মোদি বা রাহুলের মধ্যে শেখ হাসিনাকে নিয়ে কোনো ভিন্ন ভাবনা নেই। সে কারণে শেখ হাসিনা দিল্লিতে পৌঁছানোর পরপরই প্রধানমন্ত্রী মোদির দুইজন সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তির অন্যতম জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাঁর সাথে দেখা করেন।
গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন শেখ হাসিনার জন্য জরুরি থাকলেও সেটাই তাঁর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁকে একবারও বন্ধুপ্রতিম দেশটির পক্ষে কোনো ভুল ধরিয়ে দেওয়া হয়নি। অথবা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে প্রচণ্ড কঠোর অবস্থানে থেকে সরকার পরিচালনায় বিরত রাখতে পারেনি। এতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যেমন তেমনি ব্যক্তি শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ক্ষতি হয়েছে। সর্বোপরি বড় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে বাংলাদেশের মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দেশটির সরকারের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং-এর সফরের মধ্য দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এখনো তা অব্যাহত আছে বলে এ দেশের মানুষের বড় অংশ বিশ্বাস করে।
প্রতি বছর নানা প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভারতে যায়–শুধুমাত্র এই মাপকাঠি দিয়ে সম্পর্কের বিচার চলে না। এ দেশের সাধারণ মানুষ কখনোই ভারতকে অপছন্দ করে না। সব রাজনৈতিক দলই মনে করে, এ দেশে ক্ষমতায় থাকতে গেলে বা শান্তিতে থাকতে ভারতের সাথে সুপ্রতিবেশিসুলভ সম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কাজে যখন বড় প্রতিবেশী দেশের সরকার নিঃশর্ত সমর্থন দেয় তখন তারা হতাশ হয়। গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের চিত্র একই। এই হতাশা থেকেই ক্ষোভের জন্ম। আর ক্ষোভ জমতে জমতে বিস্ফোরণ।
ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অটলবিহারি বাজপেয়ি নিজ দল ও দেশের মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আপনি ইতিহাস পাল্টাতে পারেন, কিন্তু ভূগোল বদলাতে পারবেন না। মূলত প্রতিবেশী হিসেবে পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্কের প্রচেষ্টার কথা মাথায় রেখে তিনি এ কথা বলেছিলেন। বাজপেয়ির কথা ধরেই বলতে হয় বাংলাদেশের যেমন তিন পাশ দিয়ে বেষ্টিত ভারতকে জরুরি। তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশকে প্রয়োজন। প্রতিবেশী একজন খারাপ থাকলে অন্যজন ভালো থাকতে পারে না। এর বড় প্রমাণ মিয়ানমার। দেশটির অস্থিতিশীলতার কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এমনকি তারা ভারতেও ছড়িয়ে পড়ছে। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসকে যে কৃত্রিম উপায়ে বদলে দেওয়া হয়েছে তার ফল সবাইকে ভুগতে হচ্ছে ও হবে। হাজার হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বাস করা জনগোষ্ঠীকে র্যাডক্লিভ সাহেবের এক কলমের খোঁচায় বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যাবে–গত ৭৭ বছরে তা ভুল প্রমাণ হয়েছে। এ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের কিছু নেই। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক থাকবেই। কোনো শাসকের রক্তচক্ষু তাকে কিছু সময়ের জন্য বিরত রাখতে পারে কিন্তু সব সময়ের জন্য না।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ প্রথম আলোতে তাঁর কলামে লিখেছেন, “বিপ্লব, গণ-অভ্যুত্থান, সামরিক অভ্যুত্থান বা গৃহযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে স্বৈরাচারী শাসকদের পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু পলাতক এই ব্যক্তিদের কোনো দেশে সরকারিভাবে বিমানবন্দরে কার্যত ‘অভ্যর্থনা’ জানানোর কোনো উদাহরণ নেই। এই তথ্যই এই পদক্ষেপের গুরুত্ব বোঝায় যে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিকে ভারত আশ্রয় দেয়নি।” এখানেই ভারত সরকারের ভূমিকা। পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে, তবে প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক নির্ধারণে বাস্তবতাই জরুরি মাপকাঠি। সে কারণে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস শপথ নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স হ্যান্ডেলে লিখে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা খুবই জরুরি। বলা হয়ে থাকে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সাথে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতের সম্পর্ক ভালো। এটাই কূটনৈতিক বাস্তবতা।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক বদ্রি রাইনা গত ৯ আগস্ট ভারতের অনলাইন গণমাধ্যম দ্যা ওয়্যারে ‘আমরা বন্ধুকে ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু প্রতিবেশীকে নয়’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখছেন, “বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন আকার ও ভারত এখন কী করতে পারে–এটি বিবেচনা করুন: একটি সময় ছিল যখন ভারতীয় কূটনীতি তার সমস্ত ডিম এক ঝুড়িতে না রাখার ব্যাপারে যত্নশীল ছিল। এর নীতিগত দিকটা ক্ষমতা-কাঠামোর চেয়ে সমস্যা ও জনগণের প্রতি বেশি নজর দিত।”
“কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য-প্রেমী কূটনীতি অবশ্যই কল্পিত সমাধানের চেয়ে বলপ্রয়োগমূলক মীমাংসা পছন্দ করে। তবে এই অঞ্চল এবং বৈশ্বিক বিষয়ে আরও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বাংলাদেশে এখন যে নতুন ক্ষমতা কাঠামো গড়ে উঠছে তাদের প্রতি ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রয়োজন।”
“ভালো কূটনীতি হলো, প্রধান রাজনৈতিক/মতাদর্শগত পছন্দগুলোর বাধা কাটিয়ে শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করা।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যেভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতকে কয়েক ধাপ পেছনে ঠেলে দিচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতিবাদী আনুগত্যের ধারণা থেকে বাংলাদেশে হাসিনা-বিরোধী শক্তির বিরোধিতা করা বোকামি হবে।”
গত ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের এটা একটা বয়ান। এর পাল্টাটা কিন্তু খুবই জোরালো। গতকালই ইউটিউবে দুটি সাক্ষাৎকার শুনছিলাম। ইন্ডিয়া টুডের পক্ষে সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাই কথা বলছিলেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের সাথে। সেখানে রাজদীপ বারবার খুঁচিয়ে মাহফুজ আনামের মুখ দিয়ে এ কথা বলানোর চেষ্টা করেন যে, ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থান এমনি হয়নি, বাইরের শক্তি এটা করেছে। শেষ পর্যন্ত মাহফুজ আনাম ভারতীয় সাংবাদিক বন্ধুদের উদ্দেশে বলতে বাধ্য হন, ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। এরমধ্যে তিন কোটি মধ্যবিত্ত। অথচ কিছু ঘটলেই বারবার বলা হয়, পাকিস্তান, ভারত, চীন বা অন্য কেউ এর পেছনে আছে। একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মানুষকে মর্যাদা দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস এন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনীরের সাথে আধা ঘণ্টার বেশি কথা বলেন সাংবাদিক করণ থাপার। ভারতের অন্য অনেক সাংবাদিকের চেয়ে করণ থাপার সম্মানের জায়গায় বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে। সেই করণ থাপারও তাঁর প্রশ্নের মধ্যে বারবার টেনে আনেন বাইরের হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ। জবাবে শাফকাত মুনীর এই জন আন্দোলনকে মনসুন রেভিলিউশন বা বর্ষা বিপ্লব বলে বর্ণনা করেন। মুনীর স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, শেখ হাসিনার পতনে পাকিস্তানের আইএসআই বা চীন বা অন্য কোনও বিদেশি শক্তির ভূমিকা ছিল এমন দাবি করা ভুল। তিনি বলেন, নতুন অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীন, এমনকি এটি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানেও পরিচালিত নয়। তিনি বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেন, সেনাপ্রধান নিজেই ড. ইউনূসের অধীনে।
অধ্যাপক বদ্রি রাইনার কথা দিয়েই শেষ করি। তিনি তাঁর লেখার উপসংহার টেনেছেন এভাবে–“মোদীর আমলে হারিয়ে যাওয়া নেহরুভিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি পাঠ নিলে ভালো হতে পারে, যা সূক্ষ্ম ও উদার মানবতাবাদের পাশাপাশি রাজনীতির জটিলতাগুলোকে বুঝতে ও সংশ্লেষে সাহায্য করে। আর মাথা গরম করার রোমাঞ্চ বাদ দিয়ে সংবেদনশীল শান্তিকামীদের জন্য মাঠ উন্মুক্ত রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।” ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও গণমাধ্যম বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে পারে।
সেলিম খান: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


একচেটিয়া শাসনে সংবাদমাধ্যম যেভাবে ধসে যায়
জরুরি কাজ, দ্রুত করুন
