কল্পনা করুন, যদি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করত, যেখানে একটি শতাব্দী প্রাচীন মসজিদের আদালত নির্দেশিত জরিপকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় কমপক্ষে চারজন সংখ্যালঘু মুসলিম পুলিশের গুলিতে নিহত হন। কিছু হিন্দু গোষ্ঠীর দাবি, মসজিদটি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের স্থানে নির্মিত। এই বিষয়ে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করলে, নয়াদিল্লি সম্ভবত সবচেয়ে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ঢাকাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করত।
না, বাংলাদেশ তার নিকট প্রতিবেশী ভারতে ঘটে যাওয়া এ ধরনের উদ্বেগজনক ঘটনার প্রতি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। হয়তো এই ঘটনাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর বাইরে, অন্তত গত ১০ বছরে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন থেকে হত্যার মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, তবুও সম্ভবত বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।
২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এক হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তারের বিষয়ে ভারত ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া জানায়। ভারত দাবি করে, এটি বাংলাদেশের হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। তবে বাংলাদেশ এই গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ভারতের বিবৃতির বিষয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করে জানায়, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
বাংলাদেশি হিন্দু সন্ন্যাসীকে নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি আসলে একটি ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন, যা ভারতীয় প্রশাসন শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর থেকে গ্রহণ করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন হয়। তাঁর ১৫ বছরের শাসনকালে তিনি বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে ফেলেন, নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গুম করার প্রথা চালু করেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের ব্যাংক থেকে অর্থপাচারের সুযোগ করে দেন। এই শেখ হাসিনাই ভারতীয় প্রশাসনের সর্বদা বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে বিবেচিত। তাঁর স্বৈরাচারী শাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় চান, যা নয়াদিল্লি মঞ্জুর করে। তারপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই থেমে থাকেনি; প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বাংলাদেশের হিন্দুদের প্রতি তথাকথিত সহানুভূতি দেখানোর প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন।
উদাহরণ স্বরূপ, এ বছরের আগস্টের শেষ দিকে মোদি এক টুইটে বলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, যেখানে ইউক্রেন নিয়ে কথা হয়েছে এবং ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বিশেষ করে সেখানে সংখ্যালঘুদের, বিশেষত হিন্দুদের, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।’ তবে একই আলোচনার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বাংলাদেশের কোনো উল্লেখ ছিল না।
হ্যাঁ, সংখ্যালঘুরা যা ধর্ম, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতেই বিবেচিত হোক না কেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মাত্রায় চাপে থাকে। এটি শুধু বাংলাদেশ বা ভারতের সমস্যা নয়।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কি তাদের হিন্দু এজেন্ডা ছড়ানোর অভিযোগের মুখে পড়েনি? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি ১১০টি নির্বাচনী প্রচারে ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করার জন্য সমালোচিত হননি?
সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘুর সুরক্ষা দেওয়া। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও যত্নের ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশ উচিত একসঙ্গে কাজ করা। তাদের অপ্রয়োজনীয় প্রকাশ্য বিবাদে জড়ানো উচিত নয়। এই দুই দেশের মধ্যে রয়েছে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত। আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, দুই দেশের অনেক মানুষেরই সীমান্তের উভয় পাশে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। রয়েছে তাদের আত্মীয়-স্বজন।
প্রায়শই দেখা যায়, প্রতিটি দেশের চরমপন্থী রাজনীতিবিদরা জনসমর্থন পাওয়ার আশায় সংখ্যাগুরুদের খুশি করতে সংখ্যালঘুদের হেয় করে প্রকাশ্যে বিবৃতি ও ভাষণ দিয়ে থাকেন।
মানবাধিকার মূলত একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও উদ্বেগের বিষয়, বিশেষ করে যেসব দেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বা সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
যেসব দেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, তারা মানবাধিকার রক্ষা, সংরক্ষণ এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্বে আবদ্ধ। তাদের দায়িত্ব হলো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোকে অধিকার লঙ্ঘনের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং এমন নির্যাতন প্রতিরোধ ও মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যদি জাতীয় আইনগত ব্যবস্থাগুলো এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তবে ব্যক্তিরা আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ পান।
প্রতিটি দেশ নজরদারির মধ্যে রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলেছে, “ভারত সরকার ২০২৩ সালে ধর্মীয় ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও হেয় করার নীতিমালা ও কার্যক্রম চালিয়ে তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষুণ্ন করেছে।”
ধর্মীয় ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের হেয় করার মতো কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়ক হতে পারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের গণতন্ত্রের মান অনেকটাই নিম্নগামী হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফ্রিডম হাউস ২০২১ সালে ভারতের মান একটি ‘মুক্ত গণতন্ত্র’ থেকে ‘আংশিক মুক্ত গণতন্ত্রে’ অবনমিত করেছে, আর সুইডেনভিত্তিক ভি-ডেম ইনস্টিটিউট ভারতকে ‘নির্বাচনী স্বৈরাচার’ বলে চিহ্নিত করেছে। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ২০২০ সালের গণতন্ত্র সূচকে ভারতকে ৫৩তম স্থানে রেখে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ আখ্যা দিয়েছিল, যেখানে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) এবং ভারত-শাসিত কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলোকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৩ সালের গণতন্ত্র সূচকে ভারত ৪১তম স্থানে রয়েছে এবং এটি এখনো ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত।
গণ-আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি সুবর্ণ সুযোগ এখন সামনে এসেছে। শেখ হাসিনার শাসনকাল ক্রমান্বয়ে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, বিশেষত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে।
ভারত নিজেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সামগ্রিক সুশাসন সংক্রান্ত অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই এই বিষয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা ভারতের জন্য উপকারী হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা একটি কার্যকর সূচনা হতে পারে, যা এই অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে ও শত্রুতা দূর করতে সাহায্য করবে। বিভাজনমূলক ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) ভারতের জন্য সহায়ক হবে না।
২৭টি দেশের সমন্বয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন একটি সংস্থা, যা একটি অভিন্ন মুদ্রা, সমন্বিত পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংহতি অর্জন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মডেল হতে পারে না?
বাংলাদেশের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে, ভারতের উচিত সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। এই নীতিই ঢাকা বারবার চেয়ে এসেছে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে।
আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশের উপ হাইকমিশনে উগ্রপন্থীদের দ্বারা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের তলবের পর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাংবাদিকদের বলেন, “ভারত-বাংলাদেশের বিস্তৃত ও বহুমুখী সম্পর্ক একটি বিষয়েই আটকে থাকতে পারে না।”
এখন সময় এসেছে ঢাকার জন্য অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কৌশল গ্রহণ করার, কারণ প্রণয় ভার্মা বলেছেন, “আমরা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে প্রস্তুত এবং একসঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত।)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার নিয়ে সামাজিক পরিসরে আলোচনা জরুরি
বিএনপির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ
