আমাদের নতুন বছরকে বরণ করার অনুষ্ঠানটি নানা অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ। বৈশাখ দিয়ে বাঙালির বর্ষ গণনার শুরু হয়। বিশ্বের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে পয়লা বৈশাখে বাঙালি প্রাণের উৎসবে মেতে ওঠে। শুধু বাঙালি নয়, বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্বার বেশির ভাগ মানুষ প্রায় একই সময়ে নববর্ষের উৎসব পালন করে। ভারতীয় উপমহাদেশের বিপুলসংখ্যক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর নতুন বছরের শুরু পয়লা বৈশাখের সাথে মিলে যায়। শ্রীলংকা, নেপাল, থাইল্যান্ডসহ আরও বেশ কিছু এশীয় দেশ, অঞ্চল ও জাতির ঐতিহ্যবাহী নতুন বছরের শুরু হয় ১৩ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় প্রাচীনকালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ‑পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত পঞ্জিকাগুলোর সম্ভবত একটি অভিন্ন উৎস রয়েছে।
মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলা সনের রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব তৈরি হয়। সে সময় ফার্সি পঞ্জিকা অনুসরণ করে খাজনা আদায় করা হতো। কৃষকের ফসল তোলার সময়ের সাথে খাজনা আদায়ের সময়ের মিল হতো না। কৃষকের হাতে টাকা না থাকায় খাজনা আদায়ে অসুবিধা হতো। এই সমস্যা দূর করতে সম্রাট আকবর তাঁর সভাসদ আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে একটি ফসলি সন অনুযায়ী খাজনা আদায়ের নির্দেশ দেন। যৌক্তিকভাবেই ধারণা করা হয়, ফতেহ উল্লাহ সিরাজী বৃহত্তর বঙ্গীয় অঞ্চলের প্রচলিত ফসলি পঞ্জিকা বা বঙ্গাব্দ অনুযায়ী খাজনা আদায় শুরু করেন। অনেকে মনে করেন, সিরাজী সাহেব হিজরি শামসী সনকে ভিত্তিমূল ধরে বাংলা সনের প্রবর্তন করেছেন। পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত তথ্য‑উপাত্তের বিশ্লেষণ করলে হিজরি শামসী পঞ্জিকার ওপর ভিত্তি করে বাংলা সন শুরুর প্রস্তাবটি ধোপে টেকে না।
বাংলা সন গণনার রথ ১৪৩১ বছর পার হয়ে এবার ১৪৩২-এ পা দিয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও বছরের প্রথম দিনে সবাই উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছে। রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের পর এটাই দেশবাসীর প্রথম পয়লা বৈশাখ। জুলাই অভ্যুত্থানের বিপুল অভিঘাতে গণমানুষের প্রত্যাশার সীমানা বিস্তৃত হয়েছে। বিষয়টিকে মাথায় রেখে আমরা এ বছরের বর্ষবরণের মহা-উৎসবকে বিশ্লেষণ করতে পারি।
পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে সকালে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। ১৯৮৯ সালে এখান থেকে প্রথমবারের মতো ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের হয়। ১৯৯৬ সালে আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ রাখা হয়। এ বছর আবার নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করা হয়েছে। নাম পরিবর্তনের এই বিষয়টি দুবারই সাধারণ মানুষকে বিরক্ত করেছে। বিশেষ করে ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি অনুষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের তাৎপর্য অনুধাবন করার দরকার ছিল। এবারের নাম পরিবর্তনে দায়িত্বশীল মহলের কেউ কেউ আগবাড়িয়ে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা অধিকাংশ মানুষের পছন্দ হয়নি। এ বছরের আনন্দ শোভাযাত্রা নিঃসন্দেহে নতুন অভিজ্ঞতার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দেশের নানা প্রান্তের নানা পরিচয়ের মানুষ আপন পরিচয় ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে চারুকলার বৈশাখী শোভাযাত্রায় যোগ দেয়। এটা ভালো লক্ষণ। এই ধারা বহমান রাখা দরকার।
বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্বার মানুষ যাদের বর্ষবরণ বৈশাখের প্রথম দিনে, তাদেরকে রাষ্ট্রীয় উৎসবের ধারায় যুক্ত করা প্রয়োজন। এ জন্য আমার প্রস্তাব হচ্ছে চারুকলার শোভাযাত্রার ওপর সার্জারি না করে ঢাকার মুক্তাঙ্গন থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুবিধাজনক সময়ে কেন্দ্রীয় আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হোক। তবে আয়োজনটি বৈশাখী উৎসবকে সমৃদ্ধ করার পরিপূরক হবে, কাউকে বৃত্তের বাইরে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াস যেন না থাকে। ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাই একসাথে সামনে এগিয়ে যাব’ এই চেতনাই হবে নববর্ষ আবাহনের মূলমন্ত্র।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের শাসনক্ষমতার বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকের ছিটিয়ে দেওয়া রুটি‑মাখনের ভাগ অন্য অনেকের সাথে সংস্কৃতি কর্মীদের কেউ কেউ পেয়েছে। সেই সুবিধাভোগীরা এবারের নববর্ষের অনুষ্ঠান বর্জনের করেছে। বৈশাখী অনুষ্ঠানে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে বর্জন আহ্বান ন্যূনতম প্রভাব ফেলতে পরেনি। উৎসবের সাজে বৈশাখের আনন্দ ধারায় কে আসেনি? হাড়ভাঙা খাটুনিখাটা পোশাককন্যা, সন্তানসহ প্রখর রোদে কাজ করা রিকশা শ্রমিক, ঠোঁটে লিপস্টিক-কপালে টিপ-মাথায় ফুল গোঁজা পথবাসিনী কিশোরী, আবেগী মধ্যবিত্ত এবং উন্নাসিক উচ্চবিত্ত–সবাই পয়লা বৈশাখের আয়োজনে সামিল হয়েছে। মানুষের অংশগ্রহণের সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা উৎসব থেকে যারা দূরে থাকবে, কেবলমাত্র তারাই বর্জিত হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে এ রকম একটি সার্বজনীন উৎসবের আনন্দধারায় অবগাহন করে মানুষ জীবনময় ও উজ্জীবিত হয়।
পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক বা মোটিফ থাকে। এই মোটিফগুলো মোটাদাগে দুভাগে বিভক্ত করা যায়। একটি হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষায়তনে পড়াশোনা করা শিল্পীদের তৈরি করা মোটিফ। এগুলোর প্রধান অংশ পাঠ্যক্রম দ্বারা অনুপ্রাণিত। অন্যটি হলো যুগ যুগ ধরে বঙ্গভূমিতে বসবাসকারী মানুষের নিত্যব্যবহার্য জীবনোপকরণ বা সেগুলোর প্রতীক। জনউৎসবে দ্বিতীয় ধরনের মোটিফ বা প্রতীকের যত বেশি সমাবেশ ঘটবে, উৎসব তত বেশি জীবন ও মানুষ ঘনিষ্ঠ হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এবারের নববর্ষের উদ্যাপন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সমৃদ্ধ।
এবারের বৈশাখ বরণে অভিনব একটি বিষয় ঘটেছে। বৈশাখী অনুষ্ঠানকে হিন্দুয়ানী বলে কটাক্ষ করা এবং বর্জন করার জন্য কিছু মানুষ আদাজল খেয়ে লেগে থাকত। পঞ্চাশ বছর আগেও এরা ছিল। জুলাই অভ্যুত্থান‑পরবর্তী এবারের বর্ষবরণ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ছিল। তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে–‘এবারের বৈশাখী আয়োজনে পরাজিত পক্ষের লোকজন অংশগ্রহণ করবে না। ফলে উৎসবে জনসমাগম আগের তুলনায় কম হবে। এবং সেটাকে অভ্যুত্থানের বিজয়ী পক্ষের ব্যর্থতা হিসেবে দেখানো হবে।’ যারা আগে নববর্ষের অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেছে, একে হিন্দুয়ানী ভেবেছে, তাদের বেশির ভাগ এবারের বৈশাখী উৎসবে সোৎসাহে অংশগ্রহণ করেছে। তাদের অনেকে নিজেরা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিনের শুরুতে উৎসবস্থলে আসতে যারা দ্বিধান্বিত ছিল, দিনশেষে তারা কিন্তু আনন্দিত মনে ঘরে ফিরেছে। বৈশাখ উদ্যাপনের মূল উজ্জীবক যে জীবনবাদী শুদ্ধ আনন্দ তারা এটা অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছে। শুদ্ধ আনন্দ, প্রাণময় উচ্ছ্বাস, উচ্ছল হাসির আঘাতে মানুষের মনের কূপমন্ডুকতার দেয়াল ভেঙে যায়। মানব মন চির-আনন্দ পিয়াসী।
এর আগে অনেকগুলো বছর বৈশাখী অনুষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের দড়িতে বেঁধে রাখা হয়েছিল। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার কোতোয়ালি নির্দেশ থাকত। এক ধরনের ভয় নিয়ে মানুষ উৎসব প্রাঙ্গণে উপস্থিত হতো। ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁয়ে ফেললে মস্তিষ্কে বিপদসংকেত বেজে উঠত–‘দ্রুত ঘর ফিরতে হবে’। এবারের বৈশাখী উৎসবে কোনো কোতোয়ালি হুকুমনামা ছিল না। সন্ধ্যার পরও বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়েছে। রাত দশটার সময়েও রাজধানীর বিভিন্ন বৈশাখী মেলায় শিশু-নারী-পুরুষকে সানন্দে কেনাকাটা করতে দেখা গিয়েছে। সকাল থেকে অনেক রাত অবধি মানুষের আনন্দময় পদচারণায় সার দেশ মুখরিত ছিল। পয়লা বৈশাখ একটি অপরিমেয় শক্তিকে ধারণ করে। সর্বস্তরের জন-অংশগ্রহণে এই শক্তির ভান্ডার ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। হাসি আনন্দ গান সুর উচ্ছলতা মানবিক-সংযোগ মানুষের দেহমনে বিপুল ইতিবাচকতা, কল্যাণ ভাবনার জন্ম দেয়। মানবিকতার মূলভিত্তি হচ্ছে কল্যাণকামিতা। তাই বৈশাখী উৎসব, মানবিকতা ও কল্যাণকামিতা একসূত্রে গাঁথা।
লেখক: স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও শিশু অধিকার কর্মী
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



