নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙতে আইএলও ১৯০: গার্মেন্টস খাতে নারী কর্মীর নতুন সম্ভাবনা

কনভেনশন ১৯০ কার্যকর করতে হলে জাতীয় শ্রম আইন, কারখানা পর্যায়ের নীতি, পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং ট্রেড ইউনিয়ন কাঠামোর সঙ্গে এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা নারীদের নীরবতা, ভয় ও সহিংসতা কেবল নতুন আইনি ভাষায় টিকে থাকবে—বাস্তব সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না।

 

 

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:৫৪ পিএম

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৬–৩৮ শতাংশ নারী এবং শিল্প খাতে নিয়োজিত নারীদের প্রায় ৬০ শতাংশই রেডিমেড গার্মেন্ট (আরএমজি) খাতে কাজ করেন। অর্থাৎ, গার্মেন্টস খাতই বাংলাদেশের নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের উৎস। কিন্তু এই শিল্পে নারীরা শ্রমশক্তির সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের কর্মজীবন নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অগ্রগতির দিক থেকে গভীর সংকটে রয়েছে।

একটি গবেষণায় দেখা যায়, নারী শ্রমিকরা মূলত নিম্নপদে সীমাবদ্ধ থাকেন এবং তদারকি বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত (Kundu, 2025)। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, অপমান ও মানসিক নির্যাতন একটি নিয়মিত বাস্তবতা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগহীন থেকে যায় দুর্বল ও ব্যবস্থাপনানির্ভর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার কারণে (Begum et al., 2010; UN Women, 2020)।

আইনীভাবে বাংলাদেশের গার্মেন্টস (আরএমজি) কারখানায় সাধারণত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি  যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি (এইচসি) এবং অংশগ্রহণ কমিটি (পিসি) আছে যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো- কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, অভিযোগ গ্রহণ ও প্রাথমিকভাবে নিষ্পত্তি করা এবং কাজের পরিবেশ, উৎপাদন, কল্যাণ ও অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক ক্ষেত্রেই এইসব কমিটি কার্যকর থাকে না। আবার থাকলেও সেখানে কোনো অভিযোগ লিপিবদ্ধ হয় না। যার কারণে এই সেক্টরে নারীদের জন্য নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

এছাড়াও নারীরা কাজের বিপরীতে কম মজুরি, অনিয়মিত পদোন্নতি এবং লিঙ্গ-অসংবেদনশীল মানবসম্পদ নীতির শিকার হন (Mahmud & Afrin, 2018)। বাস্তব চিত্র হলো- মাতৃত্ব, শিশু যত্ন ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তারা প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন, যা তাদের ক্যারিয়ার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে (CARE Bangladesh 2020)।

গবেষণা আরও দেখায়, কর্মস্থলে যাওয়া–আসার পথে হয়রানি এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে (Kundu, 2025)। এই সমস্যাগুলো ব্যক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি নয়; বরং শ্রম আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, পিতৃতান্ত্রিক কর্মসংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবের ফল, যা আরএমজি খাতে নারীদের টেকসই ক্ষমতায়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ২০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৯০ (সহিংসতা ও হয়রানি নিরসন কনভেনশন) আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসাক্ষর করে। এই অনুসাক্ষর আসে দেশজুড়ে কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি— বিশেষত নারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক হয়রানির দীর্ঘদিনের বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে।

গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিক সংগঠন, নারী অধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ধারাবাহিক দাবির ফলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শ্রম আইনকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ প্রণয়নের পর এই কনভেনশন অনুসাক্ষর করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কনভেনশন ১৫৫ ও ১৮৭–ও (Convention 155 ও 187) অনুমোদন করে, যা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার সামগ্রিক সংস্কারের অংশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৯০ (সহিংসতা ও হয়রানি নিরসন কনভেনশন) একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সমাধানের সুযোগ তৈরি করে। এই কনভেনশন “কর্মক্ষেত্র” নয়, বরং “ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক (world of work)”-কে সুরক্ষার আওতায় আনে—যার মধ্যে কর্মস্থলে যাতায়াত, প্রশিক্ষণ এবং কাজ-সংযুক্ত সামাজিক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত। ফলে গবেষণায় চিহ্নিত যাতায়াতকালীন হয়রানির মতো বিষয়গুলোও প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।

কনভেনশন ১৯০ স্পষ্টভাবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও হয়রানিকে (gender-based violence and harassment) মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং রাষ্ট্রকে বাধ্য করে প্রতিরোধমূলক নীতি, স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং নিয়োগকর্তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে। এটি আরএমজি খাতে যে নেতৃত্বের ঘাটতি ও ক্ষমতার অসমতার কথা গবেষণায় উঠে এসেছে, তা মোকাবিলায় নীতি সংস্কার, শ্রম পরিদর্শন জোরদার এবং কর্মক্ষেত্রের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

আইএলও কনভেনশন ১৯০–এর নীতিগত প্রভিশনগুলো নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট কাঠামো দেয়। আর্টিকেল ১ (Article 1) সহিংসতা ও হয়রানির বিস্তৃত সংজ্ঞা প্রদান করে এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে (gender-based violence) স্বীকৃতি দেয়। আর্টিকেল ২ (Article 2) “ওয়ার্লড অব ওয়ার্ক” ধারণার মাধ্যমে কর্মস্থলে যাতায়াত ও প্রশিক্ষণকেও সুরক্ষার আওতায় আনে। আর্টিকেল ৪ (Article 4) রাষ্ট্রকে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণে বাধ্য করে। আর্টিকেল ৯ (Article 9) নিয়োগকর্তার ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রতিরোধমূলক দায়িত্ব নির্ধারণ করে। পাশাপাশি আার্টিকেল ১০ (Article 10) নিরাপদ, গোপনীয় ও প্রতিশোধমুক্ত অভিযোগ ব্যবস্থার নির্দেশনা দেয়, যা এন্টি হেরেজম্যান্ট কমিটি ও পার্টিসিপেশন কমিটিকে (Anti-Harassment Committee ও Participation Committee) কার্যকর করতে সহায়ক।

তবে অনুসাক্ষর নিজেই যথেষ্ট নয়। কনভেনশন ১৯০ (Convention 190) কার্যকর করতে হলে জাতীয় শ্রম আইন, কারখানা পর্যায়ের নীতি, পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং ট্রেড ইউনিয়ন কাঠামোর সঙ্গে এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা নারীদের নীরবতা, ভয় ও সহিংসতা কেবল নতুন আইনি ভাষায় টিকে থাকবে—বাস্তব সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না।

অমিতাভ কুমার কুন্ডু: লেখক এবং গবেষক
[email protected]


[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

 

ঠিক ২ মাস ৬ দিন আগের কথা। দিনের নিখুঁত হিসাব করলে, ৬৭ দিন আগে। ঘণ্টা ও মিনিটের হিসাবে আর না যাই। বড্ড ক্লান্ত লাগে যে! শুধু ক্লান্তিই বা বলছি কেন? সেই সঙ্গে এই শেষ জ্যৈষ্ঠের আকাশে অনাকাঙ্ক্ষিত...
ঈদের আগে গত ৭ দিন ধরেই টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা বেতন‑বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা পুরো বেতন­‑বোনাস পাননি। শ্রম ভবনের সামনেই তারা এতদিন ইফতার করেছেন, সেহরি করেছেন।...
২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ড এবং ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধ্বস ও ব্যাপক প্রাণহানির পর বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচনার...
না না, এ দেশের তরুণদের মনে থাকা সুখ নিয়ে এই অধমের কোনো অ্যালার্জি নেই। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন জানাচ্ছে যে, এ দেশের মানুষদের মধ্যে তরুণরাই সবচেয়ে বেশি সুখী, তখন একটা ধন্ধ তৈরি হচ্ছে। কারণ জাতীয়...
১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক,...
খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলার এলজিইডি নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি সড়কের ২১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহালছড়ির মুবাছড়ি ও পানছড়ির নালকাটায়...
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘দেশের চিকিৎসা খাতের ঘাটতি দূর করে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে সরকার। তৃণমূলের মানুষ ভিআইপিদের...
জামায়াত আমির বলেন, ২০০৬ সাল থেকে শুরু করে ২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৯টি বছর মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, আয়নাঘরের সঙ্গী হয়েছে। কিন্তু মানুষ ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নত করেনি। আসল ফ্যাসিবাদকে জনগণ...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর