মানিক বাবুর ঢালকে ঠিক পুরান ঢাকা বলা যায় না।
তবু ছেলেবেলায় আমি সেটাকেই ভাবতাম পুরান ঢাকা। আম্মার এক মামা, যাকে আমরা নানা বলে ডাকতাম, থাকতেন সেই ঢালের পাশে একটি বাসায়। মাঝখানে একটা উঠোনের মতো জায়গা, তিনদিকে অনেকগুলো ঘর, অন্যপাশে উঁচু দেয়াল। নানা-নানুর অনেক পোলাপানের মাঝে দুইজন, যাদের আমরা হুমায়ুন মামা এবং দিপু মামা বলে ডাকতাম, আমার থেকে বয়সে বড় হলেও প্রায় বন্ধুর মতোই ছিল।
কয়েক সপ্তাহ পরপর বেড়াতে যেতাম সে বাসায়। এবং ভীষণ আনন্দ নিয়েই যেতাম। সেসময় ঢাকায় আর কারও বাসায় বেড়াতে যেতে মন না চাইলেও, এদের বাসায় যাওয়াতে আমার আগ্রহের সীমা ছিল না। তার অবশ্য কারণও আছে কিছু।
মামাদের বাসায় লেখাপড়ার কোনো বালাই ছিল না। সবসময় হৈ হৈ একটা ব্যাপার চলছে। কে আসছে, কে যাচ্ছে, কেউই ঠিক খেয়াল করতো না। বাসায় ঢোকার অনেকগুলো পথ, যে কেউ যে কোনো দিক দিয়ে বাসায় ঢুকতে পারত। তবে মজার ব্যাপার হল, আমার সেই দুই বন্ধু-মামা এবং ওদের বন্ধুরা কখনোই দরজা বা গেইট দিয়ে বাসায় আসতো না। ওরা আসতো দেয়াল বেয়ে কিংবা টপকে।
দোতলার উপর ওদের ছাদে উঠে মাঝে মাঝে ঘুড়ি ওড়ানোর সময় দেখেছি, দূরে, চারতলা বাড়ির ছাদে কিছু বানর ঠিক একইভাবে দেয়াল টপকে টপকে চলছে। আমাকে কেউ কিছু না বললেও, আমি আমার দুই মামা এবং তাদের বন্ধুদের সাথে সেই সুগ্রীবদের সাদৃশ্য খুজে পেতাম। সন্ধ্যায় পড়তে বসার চাপ নেই, সারাক্ষণ নতুন কি হিন্দি সিনেমা বাজারে এসেছে, এবং সেটা কীভাবে দেখা যায়, গত সপ্তাহে কার বাসার আঙিনায় ঢুকে পেয়ারা চুরি করে এনেছে- এইসব আলাপ। শৈশবেই ওদের এমন স্বাধীনতা দেখে আমার খুবই ঈর্ষা হতো। আব্বা একদমই পছন্দ করতেন না ওদের। তার প্রধান কারণ, নিয়মহীনতা।
আরও একটা দারুণ জিনিস ছিল ওদের বাসায়। একটা পালঙ্ক, যেটাতে নানা-নানু শুতেন, সেটিতে ছিল স্প্রিঙের জাজিম। যখনই ওদের বাসায় যেতাম, আমাদের মতো পিচ্চি-পাচ্চারা ওটায় উঠে ইচ্ছেমতো লাফাতাম। অথচ, কেউই কিছু বলতো না, বকাও দিত না। এমন অভয়ারণ্য কার না ভালো লাগে।
মাঝে মাঝে রোজার সময় যেতাম। ইফতারের সময় নয়ন মামা, ওদের বড় ছেলে, বিশাল এক খঞ্চায় (প্রকাণ্ড কাঁসার প্লেট) মুড়ি, ঘুগনি, ছোলা, পিয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, খেজুর, সরিষার তেল একসাথে মিশিয়ে- হাত দিয়ে ডলে ডলে একটা কিছু বানাতেন। সবাই গোল হয়ে বসে একসাথে ইফতার করতাম।
এখন তা শুনে হয়তো অনেকেই ‘ইউ’ করে উঠবে, তবে এমন অমৃত ইফতার আমি আর কোথায়ও খাই নি। এইসব দেখে আব্বা মাঝে মাঝেই ক্ষেপে যেতেন। বলতেন, এমন করে কচলিয়ে কচলিয়ে কি একটা বানায়, খাওয়া যায়? ছি! তাঁকে সেসব দিনে শরবত আর কিছু ফল খেতে দেখতাম। মামারা আব্বার এমন আচরণে ‘হা হা হা’ করে হাসতো, কোনোদিন রাগ হতে দেখিনি তাদের।
আব্বা খুব একটা চাইতেন না আমরা ঘন ঘন মানিক বাবুর ঢালে বেড়াতে যাই। অথচ, দুয়েক সপ্তাহ পরপর যখন ওখানে যাওয়ার জন্য আম্মা আবদার করতেন, আব্বা খুব একটা মানাও করতেন না। ওরা ছাড়া তখন ঢাকায় আম্মার নিকট আত্মীয় বলে আর কেউ ছিলেন না। আম্মার জন্য হয়তো মায়া হতো তাঁর। আরও বিশেষ কারণ ছিল, পরে তা জেনেছি।
অনেক বছর আগে, আমার নিজের নানা যখন খুবই অসুস্থ ছিলেন, ক্যান্সারে জীবনের শেষ দিন গুলো গুনছিলেন, আব্বা তখন তাঁকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। আব্বার বিশ্বাস ছিল, তাঁর নিজের কিছু বিত্তবান আত্মীয় ছিলেন ঢাকায় তখন, সেখানে গিয়ে উঠবেন। তারপর হাসপাতালে ভর্তি হলে নিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু সেই আত্মীয়রা ক্যান্সার রোগীকে ওদের বাসায় থাকতে দেননি। তখন এই মানিক বাবুর ঢালের নানা, আম্মার মামা, ওদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখানেই আনা হয়েছিল এবং জানাজার পর এখান থেকেই আজিমপুর নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়েছিল।
আবার যখন আব্বা-আম্মা ঈশ্বরগঞ্জ ছেড়ে প্রথম ঢাকায় আসেন, ওদের কোনো জায়গা ছিল না ওঠার। এই বাসাতেই উঠেছিলেন তারা। বেশ কিছুদিন ছিলেন ওখানে। মানিক বাবুর ঢালের নানার প্রতি আব্বার ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা, সে তাঁর ছেলেদের নিয়ে যতই বিরক্তি থাকুক না কেন।
আজো, এতদিন পরও, পুরান ঢাকার কথা উঠলে, আমার শিশুমনের মানিক বাবুর ঢালের সেই হলদেটে দোতলা বাড়িটি ভেসে ওঠে। মনে পড়ে হৈ হৈ করা অজস্র দুপুর, রঙ্গিন বিকেল, দূরের চার তলার ছাদ, আকাশের অগুনতি ঘুড়ি, লেজ উঁচুয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলা উল্লম্ফনশীল বানরের দল।
মানিক বাবুর ঢাল, আমার শৈশবের পুরান ঢাকা।



