কানাডার টরন্টোতে সম্প্রতি সমাপ্ত হলো এগারো দিনব্যাপী টরন্টো আন্তর্জাতিক লেখক উৎসব বা টিফা। এ বছর তৃতীয়বারের মতো কানাডার বাঙালি লেখকেরা অংশ নেন এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে। কানাডায় বসবাসরত লেখক, গবেষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সুব্রত কুমার দাসের তত্ত্বাবধানে এবছর এগারো জন বাঙালি লেখক তিনটি পর্বে অংশ নেন। টিফায় বাঙালিদের অংশগ্রহণ দেখতে দূরের শহর হ্যালিফ্যাক্স থেকে টরন্টো যান তরুণ লেখক অতনু দাশ গুপ্ত। তিনটি পর্ব নিয়ে অতনুর দীর্ঘ লেখাটি আমরা তিন কিস্তিতে প্রকাশ করছি। এটি শেষ পর্ব।
রিডিং বেঙ্গলি পোয়েমস
টরন্টো শহরের কেন্দ্রস্থল হারভারফ্রন্টে চলমান সাহিত্য উৎসবে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রোববার বিকেল সাড়ে ৪টায় বাঙালি লেখকদের অংশগ্রহণে তৃতীয় অধিবেশন বসে। ব্রিগ্যানটিন প্যাটিও প্রাঙ্গণের অস্থায়ী মঞ্চে উপবিষ্ট হন কবি– শেখর গোমেজ, আনজুমান রোজি, শিউলী জাহান ও কাজী হেলাল। যথারীতি অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সুব্রত কুমার দাস।
শেখর গোমেস তাঁর প্রথম বই 'মনকল্প'-এর মাধ্যমে কবিতার জগতে পা রাখেন, যা ২০১৬ সালে সাহিত্যপ্রেমীদের হাতে পৌঁছায়। এটি কবির গভীর চিন্তা, আত্ম-অনুসন্ধান, দর্শন, বিশ্বাস এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে সংগৃহীত সংস্করণ। একজন কবির মন এবং তাঁর অন্তঃস্থিত অনুভূতি বোহেমিয়ান গানের মতো একই সুরে অনুরণিত হয়। তাঁর কবিতার প্রতিটি লাইন স্থানীয়দের কণ্ঠস্বর, সংগ্রামী জীবনের গল্প, তাঁদের কষ্টের সময়ে সমর্থন জোগায়, আশা জাগানিয়া কথা শোনায়। মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করলেও, একজন কবির মন তাঁর জন্মভূমির প্রতি সর্বদা হৃদয়ের গভীর টান অনুভব করে। শেখর তাঁর লিখিত পঙ্তিগুলোকে কখনও নিজের সাথে কথা বলার জন্য, তার অবচেতন মনকে, কখনও কখনও বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করেছেন। তিনি জাগরণ ও বিপ্লবের কবিতাও শুনিয়েছেন। তিনি একজন জনপ্রিয় বাচিকশিল্পীও বটে।
আঞ্জুমান রোজি একজন কবি ও গল্পকার। তাঁর 'সবুজ পাসপোর্ট এবং অন্যান্য গল্প' আমাদের বাস্তব জীবনের অনেক ছোট অংশকে মূর্তমান করে। অভিবাসীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশকে কীভাবে দেখতে হয়, তাদের শুরুর দিকের সংগ্রামী জীবন সবই এ গল্পের বইয়ের মূল উপজীব্য বিষয়।
স্মৃতিকাতরতা এবং একাকীত্ব তাঁর গল্পের বইয়ের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রবাস জীবনের আত্মকেন্দ্রিকতা এবং বিভিন্ন সময়ে সংগ্রামী জীবনের বর্ণনা তার লেখায় অত্যন্ত দৃশ্যমান। কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙে যাওয়া কিছু স্বপ্ন যা পুনরায় জোড়া লাগানো যায় না– কবির জীবনের ভঙ্গুর দৃষ্টিকোণকে বোঝায়। প্রেম, কাম, মায়া ও মানুষের সম্পর্কের বিভিন্ন স্তরকে নানান অলংকারে রেখে পাঠকের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর গল্পগুলো। অপ্রিয় সত্যের অভ্যন্তরীণ দিক উন্মোচিত হয়েছে কিছু গল্পের মাধ্যমে। লেখক সামাজিক কার্যকলাপ এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রগুলোও অন্বেষণ করেছেন। আঞ্জুমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর চারটি কবিতার বই, দুটি ছোটগল্পের বই, একটি গদ্য ও স্মারক বই রয়েছে।
কবি শিউলী জাহানের কবিতার প্রধান বিষয় হলো প্রকৃতিকে মমতার চোখে দেখা এবং মানুষের প্রতি আবেগ। তার কবিতা সংকলন 'আশার বাগানে নীল প্রজাপতি' এবং 'দ্রোহের সাতরঙ'-এ প্রকৃতির প্রতি তাঁর অসীম অনুরাগ দেখায়। কবি আরও বর্ণনা করেন কীভাবে মানবজাতির নিষ্ঠুরতা আমাদের প্রকৃতিকে তিলে তিলে পিষে মারছে। এক্ষেত্রে তিনি লুকিয়ে থাকা এক বাঘিনীকে রূপক হিসেবে দেখিয়েছেন। কবির বিভিন্ন সহজ উপলব্ধি প্রাঞ্জল ভাষায় আলোচিত হয়েছে। তাঁর বইগুলো পাঠকদের কাছে অত্যন্ত প্রশংসিত হয়। তিনি বর্তমানে নিজ জন্মভূমির সাথে সম্পর্কিত টরন্টোতে সামাজিক কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
কাজী হেলাল প্রকৃতির কবি। তাঁর কবিতার দৃশ্যপটে ফুটে ওঠে নানা নৈসর্গিক দৃশ্য, বিশেষ করে তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশের অপূর্ব রূপ। কানাডায় চলে এলেও কবি তার হৃদয়ের গভীরে সবুজ-লাল রঙের পতাকা বহন করেন। তিনি এমন একটি চিত্রপট আঁকেন যেখানে আমরা অনুভব করতে পারি মাটির মিষ্টি গন্ধ, স্থানীয় মানুষের স্বপ্ন। কবির সমস্ত আবেগ এমন এক বিন্দুতে মিলিত হয় যেখানে সমগ্র বিশ্ব এবং তাঁর সহপাঠকদের কাছে বাংলার সৌন্দর্য উন্মোচন করেন। সবুজ ঘাস, পাহাড়ি এলাকা দিয়ে বয়ে চলা জলরাশি, মৌসুমি ফুল, সুনীল আকাশে মেঘেদের ভেসে চলা, নানান ঋতুতে প্রকৃতির পট পরিবর্তন, এসব তাঁর কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'পান কৌড়ির ডুবসাঁতার' প্রকৃতি প্রেমের প্রতি কবিদের সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচন করে পাঠকদের সামনে শব্দের মিশেল অতুলনীয় আবেগের সাথে প্রকাশিত হয়ে কবি হৃদয়ের পরমানন্দ ও যন্ত্রণাকে বোঝায়। জনাব হেলালের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে - 'শ্রাবণীর চোখে স্হলপদ্ম' এবং সুবর্ণ পদাবলী। উভয়ই পাঠকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
বিকেল সাড়ে ৪টায় বাংলা কবিতা পাঠের আসরের শুরুতে সকল কবির প্রতি উপস্থাপক সুব্রত কুমারের জিজ্ঞাস্য ছিল- কখন তাঁরা কবিতা লেখা শুরু করেন? শেখর গোমেজ বলেন, শৈশবেই তার মনে কবিতা লেখার বাসনা জাগে- বয়স যখন সাত বা আট। অনেকটা কবিগুরুর ’জল পড়ে পাতা নড়ে’র মতো ব্যাপার। গোমেজের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০ সালে তাঁর স্কুল ম্যাগাজিনে। পরবর্তীকালে তিনি প্রবন্ধ লেখার কাজেও হাত দেন। এতদিনে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন।
তখন সঞ্চালক জানতে চান, ১৯৮০ সাল থেকে লেখা শুরু করলেও এতদিনে মাত্র একটা বই কেন তাঁর? বাকি কবিতাগুলোর অস্তিত্ব কোথায়? কবি শেখর বেশ সরলতার সাথে উত্তর দেন, বাকিগুলো হারিয়ে গেছে, কারণ সংগ্রহ করেননি।
কবি আনজুম রোজি নিজের ছোটবেলার বেশ কিছু মিষ্টি স্মৃতি রোমন্থন করেন। মূলত তার বাবা কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা। ছোটবেলায় তিনি ভয় পেলে বা মন খারাপ হলে কবিতা লিখে তা নিজের বালিশের নিচে রেখে দিতেন। একদিন তাঁর বাবা এসব খুঁজে পেয়ে মাকে বলেন, তাঁর মেয়ের অনুপম সৃষ্টির কথা। প্রথম লিখিত কবিতা ছিল বর্ষাঋতু নিয়ে। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে তিনি কানাডায় পাড়ি দেন। ২০০৭ সাল নাগাদ তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয়। সাম্প্রতিককালে নারীদের অধিকার নিয়ে তার সরব গ্রন্থ 'নারী তুমি কে?' সমাজে নারীকে ব্যক্তি স্বাধীনতা পেতে যা যা করতে হয় এসবই তার বর্তমান চিন্তাভাবনার বিষয়বস্তু।
কবি শিউলী জাহানের চর্চাও শৈশবকালেই শুরু হয়েছিল। তাঁর বই প্রকাশ করার আগ্রহ ছিল না। তিনি দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিলেন এবং অনবরত চর্চা করেছেন। কানাডায় অভিবাসী হয়ে আসার পর পুনরায় লেখালেখির দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলস্বরূপ ২০১৫-২০১৬ সালে বই প্রকাশিত হয়। মূলত প্রকৃতির হরেক রং, রূপের মুগ্ধতা কবিকে লেখনী লিখতে শক্তি জোগায়, বিচলিত করে। ছোট পাখি, প্রকৃতির এত রূপ, মোহনীয় শক্তি নিয়ে তিনি রচনা করে চলেছেন অনুপম সব সৃষ্টি। তবে মাঝেমধ্যে রাজনীতি নিয়েও লেখেন।
পরবর্তী কবি কাজী হেলাল কিছুটা রসিকতা করে বলেছিলেন, জন্মের সময় থেকেই তাঁর কবিতার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল! আনুমানিক ১২-১৩ বছর বয়সে প্রথম কবিতার আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০২২ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কবি হেলাল বিভিন্ন জাতীয় পত্র-পত্রিকায় ক্রমাগত লিখে চলেছেন।
এরপর প্রশ্নের তরী এসে ভেড়ে শেখর গোমেজের কাছে। তিনি কেন এত দেড়িতে বই প্রকাশ করলেন? জবাবে তিনি প্রথম অধিবেশনের প্যানেলিস্ট বিজ্ঞজন দিলীপ চক্রবর্তীর মতোই জানান যে, অনুষ্ঠানের পরিচালকের আসনে থাকা লেখক সুব্রত কুমার দাসের একক অনুপ্রেরণাতেই তাঁর প্রথম বই প্রকাশ। তাঁর এই সরল স্বীকারোক্তির উপস্থিত দর্শকেরা করতালির মাধ্যমে সুব্রতকে অভিনন্দন জানান।
মূলত এ পর্বে অনুষ্ঠান পরিচালক সকলকে নিজেদের রচিত কবিতা পাঠে আমন্ত্রণ জানান। কবি গোমেজ 'সময় ও একটি প্রার্থনা' পড়ে শোনান সকলকে। কবিতায় একনায়কতন্ত্রের শেকল ভেঙে বেরিয়ে আসা ও
আপামর জনসাধারণের মুক্তির কথা বলা হয়েছে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নবজাগরণের ডাক দিয়েছেন কবি। কবিতাটির ইংরেজি ভাষান্তরে নিজের ছেলের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন শেখর।
আঞ্জুমান রোজি পাঠ করেন 'গোলোকধাঁধার পথে’। বিভিন্ন ভগ্ন স্বপ্নের ঘোরে কবি খুঁজে ফেরেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে। তিনি জানান, কবিতার ইংরেজি তরজমায় সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে আফরাফুল আলম শিকদার।
শিউলী জাহানের স্বপঠিত কবিতা 'একুশের চেতনায়' তিনি অমর একুশের কথা তুলে ধরে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর অবদান ও নিজস্ব চিন্তাভাবনায় আসা নানান প্রশ্ন করে চলেন। কবিতা ভাষান্তর করার জন্য লেখক সুজিত কুসুম পালের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
এসময় সঞ্চালনায় থাকা সুব্রত অমর একুশে এবং একুশে ফেব্রুয়ারির মাতৃভাষা দিবস পালন সম্পর্কে কিছু কথা বলে পরের কবি কাজী হেলালের সাথে কথোপকথনে রত হন। তিনি সকলের উদ্দেশে পাঠ করে শোনান 'ঈশ্বরের নতুন প্রজ্ঞাপন'। মানবজীবনের নানান অনুষঙ্গ তুলে ধরার পাশাপাশি কবি বাবা–মায়ের স্নেহের অনুপম চিত্র অংকন করেছেন। কবি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার কথা বলেছেন। এ কবিতা রচনার সময়কাল অতিমারী করোনার সময়ে। পুরো পৃথিবীর অমোঘ সংকটকালের কথা স্মরণ করে কবির এ রচনা।
সম্পূরক প্রশ্নে আগামীতে কবিতা লেখার পরিকল্পনা জানতে চাইলে শেখর গোমেজ চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা জানান। কবি রোজি আগামী পরিকল্পনায় রেখেছেন বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে। কেন বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ সেসব তিনি তুলে আনবেন অকপটে।
কবি শিউলী জাহান নতুন কবিদের কবিতা ভাষান্তরের কাজ করতে ইচ্ছুক। এর মধ্যে বেশ কিছু খসড়ার কাজ তিনি করেছেন বলেও অবহিত করেন। কাজী হেলাল ছোটগল্পের দিকে মনোনিবেশ করবেন। মূলত নিজ গ্রাম মহাদেবপুর এবং তাঁর জ্ঞাতি ভাইয়ের সাথে কাটানো মধুর সব স্মৃতি নিয়ে রচিত হবে এসব লেখনী।


টিফায় বাঙালির অংশগ্রহণ: প্রথম পর্ব
টিফাতে বাঙালির অংশগ্রহণ: দ্বিতীয় পর্ব
