স্মৃতিকথা–৬ 

অলীক

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:১৭ পিএম

আমি দাঁড়িয়ে আছি পাটলির পুকুরঘাটে।

পাটলি আমার ফুপুর বাড়ি। ঝকঝকে-তকতকে শান বাঁধানো ঘাট। বর্ষার বৃষ্টিতে একেবারে টইটুম্বুর। পেছনে ওদের পরপর দুটো দোতলা ঘর, কাঠ আর টিনের তৈরি। একটা ফুফুদের, অপরটি ফুপার বড় ভাই, রুমালি চাচার। দোতলা অবশ্য আরও একটি আছে; ওপাশে, একটু ভিতরের দিকে গিয়ে। ওটা ফুপার বোনকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে বোন অবশ্য জীবিত নেই, অনেক আগেই মারা গেছেন। প্রকাণ্ড বাড়ির শুধু এই দৃশ্যটুকু দেখেও বলে দেওয়া যায়, তাঁরা বেশ অবস্থা সম্পন্ন। যে বাড়িতে ঝকঝকে ঘাটের পুকুর আর চকচকে টিনের দোতলা রয়েছে তাঁরা নিশ্চয়ই সচ্ছল।

সব ফুপাতো ভাইবোনেরা কিছুক্ষণ আগেই ঝাঁপ দিয়েছে পুকুরে। সে কারণেই ঢেউ হয়েছে। সে ঢেউ এসে লাগছে পাড়ে। ঝাঁপ দেওয়ার আগে কাজল ভাই চেঁচিয়ে আমাকে বললো, ‘ঘাটের উপর টিপ মাইরা বইসা থাকবি। নামবি না কিন্তু।’
রেজাক ভাই, কাজল ভাইয়ের চাচাতো ভাই। জানতে চাইলো, ‘ক্যান, হে নামতো না?’

- নাহ, পাভেল সাঁতার জানে না। শিখবো কইত্থে। ঢাকা শহরে হেই সুযোগ কই।

- অ।

আমি পুকুর ঘাটে বেকুবের মতো স্থির। আমার বয়স তখন আট কি নয়। দেখি ওরা আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছে। আমি একটু একটু করে এসে সিঁড়িতে দাঁড়াই।

জলের ঢেউ কি কথা বলে, বুঝি না। এক সিঁড়ি নেমে আসি…

পানি কি ঠান্ডা? তারপর আরেক সিঁড়ি… 

পানির কি মায়া আছে? আরেক সিঁড়ি…

এমনি করে আমি বুক পানি পর্যন্ত নেমে আসি। ওরা তখন প্রায় ওপারে।  এমন সময় একটা কাণ্ড হল। হঠাৎ করে আমি আর মাটির তল পাই না। তলিয়ে যেতে থাকি। সাঁতার জানা মানুষদের জন্য জলে নিজের শরীরকে হালকা মনে হলেও, সাঁতার না জানা মানুষের কাছে তা যেন পাহাড়সম ভারি। আমি আরও তলিয়ে যেতে থাকি এবং বুঝতে পারি আমার দম আটকে আসছে। জোরে জোরে হাত পা ছুঁড়তে থাকি। চিৎকার করে ওদের ডাকার চেষ্টা করি। আমি কি আর জানতাম পানির নিচে শব্দরা হারিয়ে যায়, হাতপা ছুড়াছুড়ি শ্লথ হয়ে পড়ে?

কোন অলৌকিকতায় জানি না, আচমকা শক্ত কিছু একটা আমার হাত ধরে, অনেকটা ক্রেনের মতো করে, টেনে তুললো। পেটে অনেক পানি ঢুকলেও সে যাত্রা বেঁচে গেলাম। পুকুরের ঘাটের উঁচু বেদিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। কাজল ভাই আমার পেটে চাপ দিচ্ছে, আর আমার মুখ থেকে গলগলিয়ে পানি বেরোচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে রেজাক ভাই, যে কিনা আমার থেকে বড়জোর বছর খানেকের বড়, হা হা করে হাসছে। আজকের এই নাটকের আমি সং, আর সে-ই নায়ক।

দূর থেকে সাঁতার কাটতে কাটতে পেছন ফিরে রেজাক ভাই হঠাৎ দেখেছিল আমি ঘাটে নেই। একটু খেয়াল করে দেখে একটা ছোট্ট হাত হঠাৎ করে পানির উপর ভেসে তলিয়ে গেল। যা বোঝার সে ঠিকই বুঝে গেছে। পাকা সাঁতারুর মতো সে এসে আমাকে ডুব দিয়ে বাঁচাল। সে সাঁতার ফেল্পসের মতো রাজসিক ছিল কি না জানি না, তবে ত্রাতার একটা ভূমিকা নিশ্চয়ই ছিল। সেদিনই আমি মরে যেতে পারতাম।

এরপর থেকে রেজাক ভাই আমার বন্ধু হয়ে গেল। আমি তাঁর অজস্র বিব্রতকর প্রশ্নেও বিরক্ত হতাম না, উত্তর দিতাম। এই যেমন একেবারে ছোটবেলায় জানতে চাইতো, ক্লাসে তোমার রোল নম্বর কত? বৃত্তি পাইসো? কিংবা কলেজে পড়ার সময় হয়তো জিজ্ঞেস করে বসলো, ঢাকায় থাইকা কয়টা প্রেম করলা? আবার যখন চাকরি করছি সে দেখা হলেই জানতে চাইতো, কত বেতন পাও? ইত্যাদি ইত্যাদি।

কয়েক বছর পরের কথা।

হাইস্কুলে পড়ি। আমি আবার সেই পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে। ফুপু বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। এখন আর আমি পুকুরের পানিকে ভয় পাই না, বরং পানিকে ভালোবাসতে শুরু করেছি। কারণ ততদিনে সাঁতারটা ভালোভাবে শিখে  নিয়েছি। কিন্তু আজ আমি পুকুরে নামিনি। ঘাটের উপরের ফ্লোরে অনেক জটলা, চিৎকার-আহাজারি। একটা শিশিকে পুকুর থেকে একটু আগেই টেনে তোলা হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। শিশুটির বয়স এই আট-নয়। আজ আর তার নাম মনে নেই। তাকেও ঠিক একইভাবে পেটে চাপ দেওয়া হচ্ছে, মুখে নিঃশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, মাথায় নিয়ে ঝাঁকাঝাঁকি করা হলো। মুখ দিয়ে কলকলিয়ে পানি বের হলো। সবার আর্তনাদ ছাপিয়ে রুমালি চাচার কণ্ঠ আমার কানে আজো বাজে। চোখের সামনে তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলেটি মারা গেল।  ছেলেটি রেজাক ভাইয়ের ভাই।

কিছু কিছু পুকুরে নাকি প্রতি বছর নিয়ম করে মানুষ ডুবে মরে। এটা নাকি পুকুরের আহার- এমনই একটা লোকজ মিথ চালু আছে। সে কথা বিশ্বাস না করেও আমি আজও ভাবি, সবাইকে বাদ দিয়ে রেজাক ভাইয়ের ছোট ভাইটিকেই কেন সেই একই জলাশয়ে ডুবে মরতে হলো? সে কি প্রতিশোধ? পুকুরের কি তবে জিঘাংসাবোধ রয়েছে? কে জানে।

অনেক কাল পর, এই গত বছর, আমি আবার দাঁড়িয়ে সেই একই পুকুর ঘাটে।

পুকুরটি শুকিয়ে কাঠ। ঘাট ভেঙে চৌচির। ঘাটের বেদির দুপাশের পিলার দুটি দুই দিকে হেলে পড়েছে, মিনার দুটি নেই। একটুতেই যেন অগভীর পুকুরে সে প্রস্তররাশি উল্টে পড়বে। এজমালি পুকুরের হাল এজমালি সম্পর্কের মতোই, ধুলায় ধুসরিত-যত্নহীন।
ফুপা-ফুপু দুজনই মারা গেছেন। কাজল ভাই, যে কিনা মাত্র ৫-৬ বছরের বড় আমার থেকে, বলা নেই কওয়া নেই হুট করে মরে গেল। তাঁর সন্তানেরা এখনো দাঁড়াতেই পারেনি। অথই সাগরে ভাসছে ওরা।

আমি পেছন ফিরে বাড়ির দিকে তাকালাম, সেই দোতলা বাড়িটা। স্মৃতিতে যে বাড়ি নাক উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল একদিন, চকচকে টিনের চাল। চূড়ায় ময়ূরপঙ্খি কারুকাজ। সে বাড়ির একি দশা!  একদিকে হেলে পড়েছে। চালের জায়গায় জায়গায় জংধরা টিন দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে, হয়তো বৃষ্টির পানি থেকে কোনমতে রক্ষা পাওয়ার জন্য। সে ঘরে এখন আর কেউ থাকে না। বাড়ির এ হাল দেখে সহজেই বোঝা যায় এদের সেই দিন আর নেই। 

হঠাৎ করে মনে হলো, এই বাড়িটি যেন পুকুরেরই প্রতিচ্ছবি। কিংবা সেই জলাশয়েই কালের আবর্তে কোনো এক রহস্যময় কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। কে জানে। এ জীবনের অনেক কিছুই আমাদের বোধের বাইরে রয়ে যায়, কোনোদিন জানা হয় না তা।

আসাদুজ্জামান পাভেল: সাউথ ক্যারোলাইনা (আমেরিকা) প্রবাসী লেখক 

সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ ইউকের উদ্যোগে পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্ট সেন্টারে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে চতুর্দশ বাংলাদেশ বইমেলা। গত শনি ও রোববার দুদিনব্যাপী দুপুর ১টা থেকে রাত ১০টা...
প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানি গঠন, পিআরও সেবা, ডকুমেন্ট প্রসেসিং, লাইসেন্সিং সহায়তা এবং ব্যবসায়িক পরামর্শ সেবা প্রদান করে আসছে। কাতারের ব্যবসায়িক খাতে একটি বিশ্বস্ত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান...
লন্ডনের মাটিতে লাল-সবুজের আরও একটি গর্বের পতাকা উড়ল। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লন্ডনের মেইজব্রুক ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার...
আয়োজকদের মতে, পুরো কার্যক্রমটি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও পারিবারিক পরিবেশে সম্পন্ন হয়। আগত অতিথিদের জন্য ঈদ স্পেশাল আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া শিশুদের জন্য ব্যবস্থা করা হয় বিশেষ ঈদ উপহারের।
নতুন অর্থ আইন অনুযায়ী, ব্যক্তি করদাতারা ২০২৫-২৬ আয়করবর্ষের রিটার্ন চলতি করবর্ষের জুলাই - সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাখিল করলে করছাড় সুবিধা পাবেন। অক্টোবর- ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা দিলে অতিরিক্ত কোনো কর ছাড়...
বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়নের লক্ষ্যে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডি-ফ্যাব) কেন্দ্রীয় সংসদ কর্তৃক “পরিবার পরিকল্পনা শাখা”-এর ২৯...
বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী কার্ড’ দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী।  বুধবার বিকালে কুড়িগ্রাম শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত ‘দেশ গড়তে...
ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের দমন করার ঘটনা সংক্রান্ত পুলিশের যাবতীয় নথিপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও চিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন দিল্লি হাইকোর্ট।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর