১.
আমাদের শৈশবের দুপুরগুলো কেমন যেন শ্লথ হয়ে যেত।
বিশেষ করে যখন নানুবাড়ি বেড়াতে যেতাম। ডিসেম্বরের শেষ সময়টাতে আমরা সবাই পরীক্ষা শেষে গ্রামের বাড়ি যেতাম। কখনো কখনো সেখান থেকে ছোট মামা এসে ওদের ওখানে নিয়ে যেত। পায়ে হেঁটে অনেকটা পথ। ছোট পা জোড়া আমার দিন শেষে ব্যথায় কাহিল হয়ে যেত। তবুও, মনের ভেতর, কোথায় যেন একটা আলাদা রোমাঞ্চ টের পেতাম।
নানুবাড়িতে সমবয়সি বন্ধুদের পরীক্ষা তখনো শেষ হয়নি। আমার খেলায় তাই মুলতবি। ওরা তো সব পরীক্ষা দিতে স্কুলে গেছে। সেসব দিনে আমি একা একা মাঠ পেরিয়ে চলে যেতাম অনেক দূরের বিলের মাঝে, শুকিয়ে গিয়ে ওখানে ময়দান, অজস্র ফড়িঙের ওড়াউড়ি। তারই পেছন পেছন দৌড়ে আমার দুপুরগুলো দীর্ঘ হয়ে যেত। নীল ফড়িঙের ডানায় ভেসে বেড়াতো নরম দিনের আভা। তারই রং লেগে থাকত আমার আঙুলের ডগায়।
আবার কোনো কোনো দিন, ঘরের পেছনে ঘুঘু ডেকে গেলে, কী এক নেশায় চলে যেতাম নরম জঙ্গলের পথে। লম্বা লম্বা গাছের পাতার ভেতর দিয়ে রোদ এসে আমার কিশোর গালে নরম ছোঁয়া দিয়ে যেত। রোদও যে নরম হয়, সেই থেকেই আমার জানা। লম্বা লম্বা সে বৃক্ষরাজির সাথে লুকোচুরি করতে করতেই আমার দুপুরগুলো লম্বা হয়ে যেত, ধীর হয়ে যেত। ঘুঘুর ডাকে ছায়াময় জঙ্গলের পথ কেমন করে যেন আরও বেশি নিথর হয়ে যেত।
আবার কোনো শেষ-অপরাহ্ণে, ট্রেনে ফেরার অপেক্ষায় বারহাট্টা স্টেশনে বসে থেকে থেকে শুনতাম পান-বিড়ি হেঁকে যাওয়া হকারের কণ্ঠ। ট্রেন না এলে সে আওয়াজ কেমন যেন অলস শোনাতো, কিছুটা অচঞ্চল। মাঝে মাঝে থেমে গিয়ে সে শব্দ আবার ফিরে ফিরে আসতো। সবখানেই কেমন যেন ধীরতা। অথচ এই একই মানুষ রেলগাড়ি জানালার বাইরে কেমন চঞ্চল, অস্থির। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে, রেইন্ট্রির পাতার ফাঁকে ফাঁকে হেলে পড়া সূর্য দেখতে দেখতে, ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে- আমার দুপুরগুলো কেমন শ্লথ হয়ে যেত।
কখনো কখনো গ্রামের বাড়িতে সন্ধ্যায় পুকুর ঘাটের পানিতে চঞ্চল পোকাদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে চারপাশে অন্ধকার নেমে আসত। একটা কিংবা দুটো, কিংবা অজস্র ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে যেত। পুকুর থেকে ঘরে ফেরার পথে জোনাকির মিছিল দেখে কোথায় যে হারিয়ে যেতাম! আমার ফেরার পথ জোনাক-মিছিলে কেবলই দীর্ঘ হয়ে যেত।
আমাদের এখনকার, সকাল, অপরাহ্ণ, সন্ধ্যাগুলো লম্বা হয় না কেন আর? কেমন যেন দ্রুত ফুরিয়ে যায়! কেন যায়? সে কি আমরা নিজেরাই অপরাহ্ণ হয়ে গেছি বলে? কে জানে...
২.
আমি কিছুটা আমার পূর্বপুরুষের মতো।
কিছুটা পূর্বনারীদের মতো, আবার কিছুটা উত্তর প্রজন্মের মতো। কখনো কখনো মনে হয়, আমি কিছুটা আমার বন্ধুদের (সংখ্যায় তারা খুব কম) মতো। আবার হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠে দেখি, আমি কিছুটা আমার শত্রুদের মতোও।
আমি দেখি, বিস্ময়ে দেখি, কোনো এক প্রত্যুষে, কিংবা রাত্তিরে, অথবা দুপুরে- আমারই কোনো এক পূর্ব-প্রজন্ম ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে, অনেকটা পথ পেরিয়ে চলে এসেছেন মোহনপুর নামের এক গ্রামে। পেছনে ফেলে আসা জনপদ, পথ কিংবা নদী তাঁদের পায়ের চিহ্ন তুলে রেখেছিলো বহুকাল। তারপর একদিন, কিংবা একরাতে, অথবা দুপুরে সেসব পদচিহ্ন মুছে গেছে। হয়ত ধুলিতে, কিংবা বৃষ্টিতে, অথবা বিস্মৃতির গহ্বরে।
ঠিক তেমনি, আমার বাবা, যাকে আমি আব্বা বলে ডাকি, মাতৃহীন হয়ে, কিংবা অভাবে পড়ে, অথবা পালাতে চেয়ে ছেড়ে গেছেন গ্রাম, কিংবা আত্মীয়, অথবা অতি পরিচিত প্রতিবেশ। কেবল তাঁর ছায়াটিই রয়ে গেছে সাথে। যে ছায়া তাঁরই সাথে ডুবেছে-ভেসেছে জলে, কিংবা ভিজেছে ঝুম বৃষ্টিতে অথবা কেঁদেছে ব্যথায়।
ঠিক তেমনি আমার মা, যাকে আমি আম্মা বলে ডাকি, পিতৃহীন হয়ে, কিংবা অভাবে পড়ে, অথবা পালাতে চেয়ে ছেড়ে এসেছেন ঘর, কিংবা পরিবার, অথবা শৈশব। কেবল তাঁর ছায়াটিই রয়ে গেছে সাথে। যে ছায়া তাঁরই সাথে স্বপ্ন দেখেছে, কিংবা কথা বলেছে নিজের সাথে, অথবা কোনো এক বিকেলে উদাস হয়ে পথ চেয়েছে।
আমি কিছুটা আমার আব্বা-আম্মার মতো। যেমন করে তাঁরা চলে এসেছেন ঈশ্বরগঞ্জের মতো নতুন এক শহরে, কিংবা পরিবেশে, অথবা বালিময় স্মৃতির শহরে। কিছুটা সংসারের প্রয়োজনে, কিংবা কিছুটা পালাতে, অথবা আত্ম-পরিচয়ের জন্যে। আবার যেমন তাঁরা ছেড়ে এসেছেন সেই ঠিকানা, উঠে এসেছেন ক্রূর ঢাকা শহরে, কিংবা কিছুটা উন্নত জীবনের আশায়, অথবা কিছুটা রোমাঞ্চিত ভাবনায়। পাল্টেছে ঘর, কিংবা প্রতিবেশী, অথবা দৃষ্টিভঙ্গি।
আমি কিছুটা আমার আব্বা-আম্মার মতোই। সঙ্গী করে নিয়েছি আমারই মতন ছায়াসঙ্গী কাউকে, অনেকটা ভালোবেসে, কিংবা বন্ধু ভেবে, অথবা নিজেকে ভেবে। আমরাও আমাদের পিতা-মাতাদের মতো ফেলে এসেছি নিজ হাতে গড়া ঘর, শহর, কিংবা সংযোগ, অথবা কথোপকথন। ছেড়ে এসেছি দেশ, কিংবা গল্প, অথবা কবিতা।
আমি কিছুটা আমার মেয়েদের মতো। কিছুটা সতত শঙ্কিত, কিংবা কিছুটা অবিশ্বাসী, অথবা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। যেমন আমি কিছুটা আমার বন্ধুদের মতো। কিছুটা নির্মম, কিংবা কিছুটা অতীতাশ্রয়ী, অথবা কিছুটা নিঃশঙ্ক। যেমন আমি কিছুটা আমার শত্রুর মতো। কিছুটা চতুর, কিংবা কিছুটা নির্দয়, অথবা কিছুটা কপট।
আমি কিছুটা আমার ছায়ার মতো, কিছুটা দীর্ঘ, কিংবা কিছুটা আবছায়া, অথবা কিছুটা অপস্রিয়মাণ। আমি কিছুটা ভুলে যাওয়া কবিতার মতো, শেষ ক’টি লাইন যার কিছুতেই মনে করা যায় না।
আসাদুজ্জামান পাভেল: সাউথ ক্যারোলাইনা (আমেরিকা) প্রবাসী লেখক


অলীক
দাদ ভাই!
স্মৃতিকথা ৪: যাদুর বাক্স
স্মৃতিকথা–৩: প্রেমের প্রথম চিঠি
স্মৃতিকথা ২: পোড়া চোখে যা দেখিলাম
স্মৃতিকথা ১: পুরান ঢাকা
