প্রতারণামূলক বা ভুয়া (স্ক্যাম) বিজ্ঞাপন থেকে বছরে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে থাকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা। বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থের অংকটা ৮৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) প্রকাশিত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য।
উল্লেখ্য, মেটার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নথির (ডকুমেন্ট) উপর ভিত্তি করা হয়েছে রয়টার্সের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রামসহ মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিদিন গড়ে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ‘উচ্চ ঝুঁকির’ স্ক্যাম বা ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়। ফলে প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহারকারীরা এসব প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের সংস্পর্শে আসেন এবং এগুলোর দ্বারা তাদের প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের মেটার এক নথি থেকে জানা যায় যে, স্ক্যাম বা ভুয়া বিজ্ঞাপন থেকে প্রতি বছর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে এই সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট। এখানেই শেষ নয়।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিজ্ঞাপন থেকে মোট আয়ের ১০ শতাংশ ‘স্ক্যাম (ভুয়া) বা নিষিদ্ধ পণ্যের বিজ্ঞাপন থেকে আসবে’ বলে ধারণা করছিল মেটা।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য ইতোপূর্বে অপ্রকাশিত কিছু ডকুমেন্ট বা নথি পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। সেখানে দেখা গেছে, অন্তত তিন বছর ধরে বিপুল সংখ্যক ভুয়া ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন শনাক্ত করতে এবং এগুলো বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে মেটা। এর ফলে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের কোটি কোটি ব্যবহারকারীরা প্রতারণামূলক ই-কমার্স সাইট ও বিনিয়োগ প্রকল্পসহ অবৈধ অনলাইন ক্যাসিনো এবং নিষিদ্ধ চিকিৎসা পণ্যের সংস্পর্শে চলে আসে।
এরুপ ভুয়া, জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক (স্ক্যাম) বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে অনলাইন দুনিয়া। এক্ষেত্রে অনেকাংশেই দায়ী ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, সাধারণ ব্যবহারকারীরা এই ধরণের স্ক্যাম অ্যাড বা ভুয়া বিজ্ঞাপনগুলোকে সহজে চিহ্নিত করতে পারেন না। ফলে অনেকেই প্রয়োজনীয় একটি সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে গিয়ে আদতে একটি ম্যালওয়্যার ডাউনলোড করে ফেলেন। অথবা একটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে গিয়ে নকল বা ভুয়া সাইটের অর্ডার করে ফেলেন।
এবারে রয়টার্সের নতুন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর বিজ্ঞাপনী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ এক উৎস হয়ে উঠেছে এই স্ক্যাম বা ভুয়া বিজ্ঞাপনগুলো।
মেটা’র অভ্যন্তরীণ নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্সের প্রতিবেদন আরও জানাচ্ছে, মেটার স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম যদি অন্তত ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত হয় যে বিজ্ঞাপনদাতারা প্রতারণা বা জালিয়াতি করছে, তবেই তাঁদেরকে নিষিদ্ধ করা হয়, অন্যথায় নয়।
এছাড়া শাস্তি হিসেবে সন্দেহজনক স্ক্যামারদের কাছ থেকে কেবলমাত্র একটি উচ্চ চার্জ গ্রহণ করে থাকে মেটা। এখানেও আখেরে লাভ কিন্তু হয় মেটার-ই। কেননা সম্ভাব্য স্ক্যামারদের কাছ থেকে ‘উচ্চ চার্জ’ হিসেবে বড় অংকের অর্থ পেয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে স্ক্যামাররা যে ভুয়া বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে পুরোপুরি বিরত থাকে এমন নয়, তাঁরা শুধু স্ক্যাম অ্যাড দেওয়া থেকে কিছুদিনের বিরতি নেয়। এমনই এক চিত্র তুলে ধরেছে রয়টার্সের প্রতিবেদনটি।
সার্বিকভাবে ভুয়া, জাল ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন থেকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের যতই ক্ষতি হোক না কেন, মেটার অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে বিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞাপনী আয়। ফলে এই ধরণের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে মার্ক জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
তাই পরের বার ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রামে দেখানো কোনো বিজ্ঞাপনে ক্লিক করার আগে দু’বার নয়,দশবার ভাবুন!



