আর দুই রাতের অপেক্ষা, শুরু হয়ে যাচ্ছে ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ভারতের মাটিতে হতে যাওয়া এই দশ দলের টুর্নামেন্টে সূচিটাই এমন রাখা হয়েছে যে, এবার অঘটন ঘটিয়ে কারও সেমিফাইনালে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। প্রতিটি দল অন্য নয় দলের বিপক্ষেই গ্রুপ পর্বে খেলবে, সেখান থেকে সেরা চার দল যাবে সেমিফাইনালে – অঘটনের সুযোগ আর কোথায়!
এই কঠিন সূচির টুর্নামেন্টে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান কিংবা নিউজিল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকা – এই ছয় দলকেই ঘুরেফিরে সেমিফাইনালের দৌড়ে এগিয়ে রাখছেন বেশিরভাগ বিশ্লেষক। কেউ কেউ হয়তো শ্রীলঙ্কার নামটিও বলেন। কিন্তু বাংলাদেশ, আফগানিস্তান কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো দলকে সেমিফাইনালে দেখবেন – এমন পূর্বানুমান এই তিন দেশের পাঁড় সমর্থক ছাড়া এখনো তেমন কেউ করেননি।
কিন্তু সেসব তো মনুষ্য বিশ্লেষণ। এখন যুগ ডেটার, ডেটা অ্যানালাইসিস কী বলে?
ক্রিকেটের ডেটা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ক্রিকভিজের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করেছে বিবিসি। প্রতিটি দল ধরে ধরে তাদের বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা বের করার চেষ্টা চলেছে সেখানে। কী এসেছে সেটির ফল? ইনডিপেনডেন্ট টিভির পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।
আফগানিস্তান
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ১.৩%
বিশ্লেষণ: গত বিশ্বকাপের পর থেকে ওয়ানডেতে শেষ দশ ওভারে আফগানিস্তানের বোলিং ইকোনমি রেইট ৬.৬২ – এ সময়ে আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সেরা! কিন্তু অন্যদিকে একই সময়কালে শেষ দশ ওভারে আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ে রান রেইট ছিল ৬.৭৪ – এ সময়ে আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম!
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: রশিদ খান। ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ বলে এখানে আইপিএলের পরিসংখ্যানই টেনে এনেছে ক্রিকভিজ। ২০১৭ সালে আইপিএলে অভিষেকের পর থেকে আফগান লেগ স্পিনার উইকেট নিয়েছেন ১৩৯টি, এ সময়ে এর চেয়ে বেশি উইকেট পাননি আর কেউ।
অস্ট্রেলিয়া
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ১৫.৬%
বিশ্লেষণ: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ব্যাটিং গভীরতা অনেক। অলরাউন্ডারে ভর্তি স্কোয়াডে ক্যামেরন গ্রিনের মতো একজনও আট নম্বরে নামতে পারেন। তবে স্পিন ডিপার্টমেন্টে তাদের শক্তি কম। অ্যাশটন অ্যাগার চোটে পড়ায় স্কোয়াডে একমাত্র স্পিনার থাকছেন অ্যাডাম জাম্পা।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। গত বিশ্বকাপের পর থেকে ৪১ থেকে ৫০ ওভারে তাঁর গড় ৩৭, স্ট্রাইক রেইট ১৮০! তাঁর অফ স্পিনও কাজে আসবে।

বাংলাদেশ
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ২.৯%
বিশ্লেষণ: গত বিশ্বকাপের পর থেকে নিজেদের মাঠে বাংলাদেশ ১৬ ম্যাচে জয়ের বিপরীতে হেরেছে ৯ ম্যাচে। তবে দেশের বাইরে অতটা দাপুটে তারা ছিল না (৯ জয়, ১২ হার)। ভারত পাশের দেশ হলেও সেখানে খেলাটা বাংলাদেশ দলের জন্য অপরিচিত কন্ডিশনে খেলার মতোই হবে। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ সব মিলিয়ে মাত্র ৯টি ওয়ানডে খেলেছে, ২০০৬ সালের পর একটিও নয়।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: সাকিব আল হাসান। রোহিত শর্মা ও ডেভিড ওয়ার্নারের পাশাপাশি বাংলাদেশ অধিনায়কই ছিলেন ২০১৯ বিশ্বকাপে ৬০০-র বেশি রান করা তিন খেলোয়াড়ের আরেকজন।
ইংল্যান্ড
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ১৭.৩%
বিশ্লেষণ: গত বিশ্বকাপের পর থেকে ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের সাফল্যের হার অবিশ্বাস্য – ৮৪%। টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া দশ দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে ব্যাটিংয়ে জেসন রয় ও জনি বেয়ারস্টোর উদ্বোধনী জুটি আর নেই, এতে পাওয়ার প্লেতে ইংল্যান্ডের স্কোরিং রেইটে প্রভাব পড়েছে। ২০২৩ সালে তারা প্রথম দশ ওভারে রান করেছে ৫.৩০ রেইটে, যা ২০১৪ সালের পর তাদের সর্বনিম্ন।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: বেন স্টোকস। ২০১৫ সালের পর থেকে তিনি খেলেছেন, এমন ম্যাচে ইংল্যান্ড রান তাড়া করেছে ৩৪ বার, এর মধ্যে স্টোকস অপরাজিত ছিলেন ১৩ বার।
ভারত
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ২১.৯%
বিশ্লেষণ: গত বিশ্বকাপের পর ভারত ওয়ানডে খেলেছে ৬৬টি – টুর্নামেন্টের দশ দলের মধ্যে সর্বোচ্চ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শ্রীলঙ্কার ৫৬টি। মাঝের ওভারগুলোতে তাদের ব্যাটিং বেশ শক্তিশালী, রান রেইট ৫.৭৬। এ সময়ে মাঝের ওভারগুলোতে এর চেয়ে বেশি রান রেইট ছিল শুধু ইংল্যান্ডের (৬.০১)।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: বিরাট কোহলি। ৪৭টি ওয়ানডে সেঞ্চুরি নিয়ে বিশ্বকাপে যাওয়া কোহলির কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের রেকর্ড পেরোতে সেঞ্চুরি লাগবে আর তিনটি।
নেদারল্যান্ডস
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ০.০%
বিশ্লেষণ: বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রথম দশ ওভারে নেদারল্যান্ডসের বোলারদের গড় ছিল ৩০-এর নিচে, ইকোনমি ৪.১২। এবং সে সময়ে পল ফন মিকরেন ছিলেন না। তাঁর উপস্থিতি প্রথম দশ ওভারে নেদারল্যান্ডসকে আরও শক্তি জোগাবে। মাঝের ওভারগুলোতে অবশ্য তাদের দাপট কম। গত দুই বছরে ১১ থেকে ৪০ – এই ৩০ ওভারে তাদের গড় ৫৯!
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: বাস ডে লেইডে। ২৩ বছর বয়সী অলরাউন্ডার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে রান তুলেছেন ৪৮ গড়ে, ১০১ স্ট্রাইক রেইটে। টুর্নামেন্টে বল হাতেও ১৫ উইকেট নিয়েছেন ২২ গড়ে।
নিউজিল্যান্ড
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ৮.৫%
বিশ্লেষণ: ২০১০ সালের পর থেকে ভারতের মাটিতে ওয়ানডেতে নিউজিল্যান্ডের জয়ের হার মাত্র ২৯ শতাংশ। খেলেছে ২১ ম্যাচ, জিতেছে তার ৬টি। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ানডেতে ডেথ ওভারের বোলিংয়েও ভুগেছে নিউজিল্যান্ড। গত বিশ্বকাপের পর থেকে শেষ দশ ওভারে তাদের ইকোনমি ৭.৯১ – এ সময়ে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: ট্রেন্ট বোল্ট। গত দুটি বিশ্বকাপে বাঁহাতি পেসার উইকেট নিয়েছেন ৩৯টি, এই দুই টুর্নামেন্টে তাঁর চেয়ে বেশি উইকেট শুধু অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্কের (৪৯)।
পাকিস্তান
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ১১.৬%
বিশ্লেষণ: গত বিশ্বকাপের পর থেকে মাঝের ওভারগুলোতে উইকেটপ্রতি গড়ে ৪৫.৯৮ রান পাকিস্তানের। কারণ আর কী? বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ান। শাহিন শাহ আফ্রিদি ও হারিস রউফ থাকা মানে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলারদের দুজন পাকিস্তানের। নতুন বলে শাহিন আর ডেথ ওভারে রউফের দক্ষতা মিলে দুজনের জুটিটা বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন প্রতিপক্ষের জন্য।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: শাহিন শাহ আফ্রিদি। বোল্ট-স্টার্কের মতোই আরেক গতিময় বাঁহাতি পেসার। ওয়ানডেতে প্রথম দশ ওভারে শাহিনের গড় মাত্র ২৪! গত মাসে পাল্লেকেলেতে ভারতের বিপক্ষে ৩৫ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট।

দক্ষিণ আফ্রিকা
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ১৪.১%
বিশ্লেষণ: হেনরিখ ক্লাসেন সম্ভবত এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ইন ফর্ম ব্যাটসম্যান। দক্ষিণ আফ্রিকার লোয়ার অর্ডারেও দারুণ ব্যাটিং আছে। কেশব মহারাজ খুব ওপরে খেললে সর্বোচ্চ আটে নামতে পারবেন, সাতে নামতে পারেন মার্কো ইয়ানসেনের মতো একজন।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: হেনরিখ ক্লাসেন। আগ্রাসী এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান ২০২৩ সালে ওয়ানডেতে রান করছেন ৫৯ গড়ে, ১৫১ স্ট্রাইক রেইটে। গত মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলেছেন ৮৩ বলে ১৭৪ রানের ইনিংস – ওয়ানডেতে ২৫ ওভার বা তার পর নামা কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ।
শ্রীলঙ্কা
ক্রিকভিজের চোখে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা: ৬.৮%
বিশ্লেষণ: চোটে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা না থাকার পরও শ্রীলঙ্কার স্পিন আক্রমণ ভয়ংকর। মহীশ তিকসানা এশিয়া কাপে ২৯ গড় ও ৫.১৫ ইকোনমি রেইটে নিয়েছেন ৮ উইকেট, দুনিথ ভেল্লালাগে ১০ উইকেট নিয়েছেন ১৮ গড় আর ৪.২৬ ইকোনমিতে। তবে শেষ দশ ওভারে ব্যাট হাতে ওরা ভুগেছে। গত বিশ্বকাপের পর থেকে শেষ দশ ওভারে তাদের রান রেইট ৭.২১ – এই সময়ে ডেথ ওভারে এর চেয়ে কম রান রেইট ছিল শুধু আফগানিস্তানের।
ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়: চারিথ আসালঙ্কা। ২০২১ সালে অভিষিক্ত বাঁহাতি ব্যাটসম্যান, স্পিন বোলিংয়ের বিপক্ষে তাঁর গড় ৬০। ২০২২ সালে পাল্লেকেলেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরিও আছে।



