বিশ্ব ক্রিকেটে যে ভারতেরই দাদাগিরি চলে, এ নিয়ে এখন আর কারও সংশয় আছে বলে মনে হয় না। ভারতের শত কোটি দর্শক আছে, প্রভাবশালী মিডিয়া আছে, প্রতাপশালী দলও আছে – সব মিলিয়ে ভারতে ক্রিকেটের বাজার আছে। আইসিসির আয়ের সিংহভাগই আসে ভারত থেকে। সে কারণেই কিনা, আইসিসিও দৃশ্যত ‘দুধ দেওয়া গরুটার লাথি খাওয়াই যায়’ নীতিতেই যেন চলছে।
সাধারণ জনগণেরও যে ধারণা, সেটিই এবার উঠে এসেছে ‘ক্রিকেটের বাইবেল’ হিসেবে পরিচিত উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক-এর ১৬৩তম সংস্করণে। আগামী বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হতে যাচ্ছে ক্রিকেটের বার্ষিক এই প্রকাশনাটির এবারের সংস্করণ। তার আগে ইংলিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে তুলে এনেছে এবারের উইজডেন অ্যালমানাকের মূল বিষয়বস্তু।
সম্পাদক লরেন্স বুথ তাঁর ভূমিকায় বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন। বিশ্ব ক্রিকেট পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ভারতের আধিপত্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি ক্রমেই ‘অরওয়েলিয়ান’ (জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ বইতে যে স্বৈরশাসনতান্ত্রিক, নিপীড়ক ব্যবস্থার কথা বলা আছে) হয়ে উঠছে।
আইসিসি-র প্রধান নির্বাহী সানজোগ গুপ্তা এবং চেয়ারম্যান জয় শাহ — দুজনই ভারতীয়। জয় শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ মিত্র। উইজডেন বলছে, জয় শাহ-র নেতৃত্বে থাকা ভারতের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আসলে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একটি ‘খেলাধুলাবিষয়ক সহযোগী প্রতিষ্ঠান।’
২০২৫ এশিয়া কাপের প্রসঙ্গ টেনে এনে ক্রিকেটে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি তুলে ধরেছেন বুথ। সেখানে অবশ্য ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের কথাও আছে। গত বছরের এপ্রিলে পেহেলগাওঁ হামলার জেরে মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা দেখা গেছে, তার প্রেক্ষাপটে হওয়া এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে দুই দলের খেলোয়াড়েরা ম্যাচ শেষে হাতও মেলাননি।
বুথ লিখেছেন, ‘২০২৫ সালে ক্রিকেট পরিচালনার ব্যর্থতার এর চেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে, যখন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি বলেন, ‘রাজনীতি ও খেলাধুলা একসঙ্গে চলতে পারে না’? সম্ভবত তিনি সে সময় ভুলেই গিয়েছিলেন যে তিনি নিজেই তাঁর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অবশ্য (খেলা আর রাজনীতির) আলাদা পরিসরগুলোর ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ের রেখা মুছে দেওয়ার বেলায় তিনি একা নন।’
এশিয়া কাপে পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভারতীয়দের হাত না মেলানো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের একটি নগ্ন উদাহরণ ছিল বলে লিখেছেন বুথ। আগে এই টুর্নামেন্টকে রাজনীতির বাইরে নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হতো।
বুথের মতে, অনেক আগেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন ভারতের অধিনায়ক সূরিয়াকুমার ইয়াদাভ পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের একটি ম্যাচ সশস্ত্র বাহিনীকে উৎসর্গ করেন।
সামরিক বাহিনীগুলো তো লড়ছেই, এর সঙ্গে ক্রিকেটও এখন সংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভারত ফাইনালে পাকিস্তানকে হারানোর পর প্রধানমন্ত্রী মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘মাঠেও অপারেশন সিন্দুর, এবারও ফলাফল একই - ভারত জয়ী।’ বাস্তবের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ দুই দেশেই বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
বুথ আরও লিখেছেন, ‘ক্রিকেট এখন বিজেপির রাজনৈতিক দাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হয়ে উঠেছে।’ তিনি উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমান-এর বিষয়টি উল্লেখ করেন। ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সঙ্গে প্রায় ১০ লাখ ডলারের চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সে সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার কারণে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় কলকাতা। বলা হয়, বিসিসিআই সে নির্দেশনা দিয়েছিল কলকাতাকে। তারা কারণ হিসেবে দেখিয়েছে নিরাপত্তাশঙ্কাকে। বুথ লিখেছেন, মোস্তাফিজের ঘটনা প্রমাণ করে, ক্রিকেট এখন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
ওই ঘটনার জেরে বাংলাদেশ সরকার ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে দল পাঠায়নি, তারা ভারত থেকে ম্যাচগুলো বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তাতে যে সূচিগত জটিলতা তৈরি হতো, সেদিক মাথায় রেখে আইসিসি সে অনুরোধে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশকেই বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানও এর আগে নিরাপত্তাশঙ্কায় ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বুথ লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান খেলতে রাজি হওয়ায় সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। তবে এই পরিস্থিতি ব্যাংক ব্যালেন্সে আইসিসি শক্তিশালী হলেও আর্থিক ব্যবস্থায় ক্রিকেট কতটা ভঙ্গুর, সেটা ফুটিয়ে তুলেছে। বুথ বলেন, ‘ক্রিকেট পরিচালনার কার্যক্রম ক্রমেই অরওয়েলিয়ান হয়ে উঠছে। ভারতীয় আধিপত্যকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর নিচের সারির দেশগুলোকে দোষারোপ করা হচ্ছে।’
অস্ট্রেলিয়ারও সমালোচনা করেছে উইজডেন। তারা আগামী বছর মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টেস্ট ক্রিকেটের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গোলাপি বলের ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্তকে ‘খারাপ’ ও ‘দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ প্রস্তুতিকেও সমালোচনা করা হয়েছে। বুথ লিখেছেন, ‘ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে এত বড় সুযোগ এত অবহেলায় নষ্ট করার উদাহরণ খুব কমই আছে।’



