গত বুধবার রাতে উয়েফা সুপার কাপের ফাইনালে টটেনহামকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলে পারি সাঁ জার্মেই (পিএসজি)। ওই ম্যাচে ইতালির উদিনের স্তাদিও ফ্রিউলিতে একটি ব্যানার প্রদর্শিত হয়। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে দুদলের খেলোয়াড়রা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। সামনে রাখা ব্যানারে দুটি লাইন লেখা ছিল। ‘স্টপ কিলিং চিলড্রেন’ এবং ‘স্টপ কিলিং সিভিলিয়ানস’। বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘শিশু হত্যা বন্ধ করো’ ও ‘বেসামরিক হত্যা বন্ধ করো।’
সরাসরি কোনো দেশ বা ভূখণ্ডের নাম উল্লেখ না করলেও এ বার্তা যে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে দেওয়া- সেটা না বললেও চলে।
ম্যাচের আগে এ ধরনের ব্যানার প্রদর্শিত হওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে উয়েফা। ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট অ্যান্টিসেমিটিজম, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থার তোপের মুখে পড়েছে ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, উয়েফা ‘এত বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়াচ্ছে’ যে, এতে তিনি ভীষণ অবাক হয়েছেন।
স্ট্যাফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস জার্নালিজমের সিনিয়র লেকচারার ইয়ান বেইলি বলেছেন, ‘মানবিক দিক থেকে দেখলে, এ বার্তায় কোনো ভুল নেই। তবে রাজনৈতিক দিক থেকে বিষয়টি খুবই জটিল।’
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উয়েফার এ বার্তায় গাজা কিংবা ফিলিস্তিনের নাম উল্লেখ নেই। তবে ব্যানার প্রদর্শনের পর পুরস্কার বিতরণীতে গাজার দুই শরণার্থী শিশু অংশ নেয়। সে সময় উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দুজন। উয়েফা জানিয়েছে, সাদা টি-শার্ট পরা ১২ বছর বয়সী মেয়েটির নাম তালা, আর ৯ বছর বয়সী ছেলেটির নাম মোহাম্মদ। দুজনেই চিকিৎসার জন্য মিলানে গিয়েছেন।
এর মধ্যে তালাকে ‘খুবই নাজুক স্বাস্থ্যের অধিকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে উয়েফা জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় চিকিৎসা সামগ্রীর অভাব থাকায় তাঁকে মিলানে নেওয়া হয়েছে। আর ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছেন মোহাম্মদ। এছাড়া বিমান হামলায় আহত হয়েছেন ৯ বছরের মোহাম্মদ।
শুধু ফিলিস্তিনের এ দুজন নয়, আফগানিস্তান, ইরাক, নাইজেরিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ৯ শরণার্থী শিশু ম্যাচের আগের এ প্রদর্শনীতে অংশ নেয়।
এর আগে গত মঙ্গলবার উয়েফার ফাউন্ডেশন ফর চিলড্রেন ঘোষণা করে, গাজার শিশুদের সহায়তার জন্য মানবিক কার্যক্রম বাড়িয়ে দিয়েছে উয়েফা। এছাড়া আরও তিনটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে সহায়তা দেওয়ার কথাও জানায় ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ফলে অনেকেই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাচ্ছেন, ম্যাচের আগের এ বার্তা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতকে উদ্দেশ্য করেই দিয়েছে উয়েফা।
এদিকে উয়েফার নিয়ম অনুযায়ী, মাঠে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বার্তায় কোনো দেশের নাম উল্লেখ না থাকায় সরাসরি রাজনৈতিক বলার উপায়ও নেই! তবে নাম উল্লেখ না করাতেই বেশি করে ক্ষেপেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির প্রতিনিধি শায়েস্তা আজিজ বলেছেন, ‘অপরাধের নাম বলা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধীর নাম নেই- এটা হলো কাপুরুষতা।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘সেখানে দুর্ভোগের মাত্রা সীমাহীন। শিশুদের অঙ্গহানির হারের ক্ষেত্রে গাজা এখন বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। একটা প্রজন্ম শুধু তাদের জীবন আর অঙ্গই হারাচ্ছে না। বরং খেলাধুলার সুযোগও হারিয়েছে। সেখানে উয়েফার সমর্থন ভীষণ দরকার।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গাজার শিশুদের পক্ষ নিলেও ‘ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট অ্যান্টিসেমিটিজম’ পক্ষ নিয়েছে ইসরায়েলের। এ সংস্থাটির দাবি, উয়েফা গাজার বিষয়ে সরব থাকলেও যুদ্ধে নিহত ইহুদি শিশু বা গাজায় আটক ইহুদি জিম্মিদের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। টটেনহাম সমর্থকদের একটা বড় অংশ ইহুদি বলে এ ব্যানার প্রদর্শনের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘ইহুদিদের ওপর এই একপাক্ষিক ক্ষোভ দ্বিমুখী নীতি সম্পর্কে ভালোভাবেই ধারণা দেয়। এটা বুঝিয়ে দিচ্ছে, ইউরোপে এখনো ইহুদি বিদ্বেষ চরমে।’
অবশ্য উয়েফা কয়েকদিন ধরেই সমালোচনার বাণে বিদ্ধ হচ্ছে। সম্প্রতি ত্রাণ নিতে গিয়ে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ফিলিস্তিনের পেলে খ্যাত সুলেইমান আল ওবায়েদ। তাঁর মৃত্যুতে শোকবার্তাও দিয়েছে উয়েফা। কিন্তু সে শোক বার্তায় ওবায়েদের মৃত্যুর ধরণ বা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো কিছু বলা হয়নি দেখে তীব্র সমালোচনা করেন লিভারপুল তারকা মোহামেদ সালাহ।



