বয়স যে স্রেফ একটা সংখ্যা, তা আরও একবার প্রমাণ করেছেন ৪০-এ পা দিতে যাওয়া লিওনেল মেসি! আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ম্যাজিকাল এক হ্যাটট্রিকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে তিনি এনে দিয়েছেন ৩-০ গোলের উড়ন্ত সূচনা। এবারে গ্রুপ 'জে'-র দ্বিতীয় ম্যাচে আলবিসেলেস্তেদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের ‘প্রেসিং মনস্টার’ অস্ট্রিয়া।
আজ সোমবার রাত ১১টায় ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে কাউন্টার-প্রেসিংয়ের মাস্টারমাইন্ড রালফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া। প্রশ্ন হলো, ডালাসের মঞ্চে এবারও কি দেখা যাবে মেসি-ম্যাজিক, নাকি রাংনিকের হাই-প্রেসিং কৌশলের সামনে খেই হারাবে স্কালোনির শিষ্যরা? চলুন বিশ্লেষণে যাওয়া যাক।
জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু দু’দলেরই
আর্জেন্টিনার পাশাপাশি অস্ট্রিয়াও প্রথম ম্যাচে জয় পেয়েছে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নবাগত জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তাঁদের সূচনাটাও দারুন হয়েছে। ফলে দু’দলের সামনেই সমীকরণটা এমন যে, আজ (সোমবার) জয় পেলেই নিশ্চিত হয়ে যাবে নকআউট পর্বের টিকিট।
দুই দলই কিন্তু এই মুহূর্তে আছে দুর্দান্ত ফর্মে। আর্জেন্টিনা তাঁদের শেষ ৮ ম্যাচের সবকটিতে জয় পেয়েছে, যার মধ্যে ৭টিতেই তাঁরা কোনো গোল হজম করেনি- অর্থাৎ, ক্লিন শিট রেখেছে। অন্যদিকে, অস্ট্রিয়াও বিশ্বকাপের আগে সবকটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচেই জয় পেয়েছে।
তবে দু’দলের প্রথম ম্যাচে জয়ের ধরনে ছিল পার্থক্য। আর্জেন্টিনা যেখানে আলজেরিয়াকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে, সেখানে অস্ট্রিয়ার জয়টি ছিল বেশ কষ্টার্জিত। প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা জর্ডানের বিপক্ষে ১-১ সমতার পর, ম্যাচের ৭৬ মিনিটে এক আত্মঘাতী গোলে এবং ১০২ মিনিটে মার্কো আরনাতোভিচের পেনাল্টিতে ৩-১ ব্যবধানের জয় পায় কোচ রাংনিকের দল। অর্থাৎ, স্কোরলাইন যেমনই দেখাক, অস্ট্রিয়ার ডিফেন্স কিন্তু নিশ্ছিদ্র ছিল না।
আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া হেড-টু-হেড
বিশ্বমঞ্চে এর আগে কখনো মুখোমুখি হয়নি আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়া। অতীতের দুটি প্রীতি ম্যাচের একটিতে ১৯৮০ সালে আর্জেন্টিনা জিতেছিল ৫-১ গোলে, আর ১৯৯০ সালের অপর ম্যাচটি হয়েছিল ১-১ ড্র। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে এটিই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ।
মেসির সামনে ৩ বিশ্বরেকর্ড
আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি রেকর্ড নতুন করে লিখেছেন মেসি। এবার অস্ট্রিয়া ম্যাচে আরও ৩টি রেকর্ডের হাতছানি এলএমটেনের সামনে।
প্রথমত, অস্ট্রিয়ার জালে ১টি গোল জড়াতে পারলেই জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে ১৭ গোল নিয়ে এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন মেসি।
দ্বিতীয়ত, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয় পেলে বিশ্বকাপে ক্লোসার ১৭টি ম্যাচ জয়ের রেকর্ড ভেঙে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জেতা খেলোয়াড় হবেন তিনি।
এছাড়া বক্সের বাইরে থেকে গোল করার ক্ষেত্রে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রিভেলিনোর ৫ গোলের রেকর্ড আলজেরিয়া ম্যাচেই ছুঁয়েছেন মেসি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দূরপাল্লার শটে আর একটি গোল করলেই এই তালিকাতেও তিনি বসবেন সবার ওপরে।
কেমন হবে আর্জেন্টিনার একাদশ?
এবার আসা যাক টিম নিউজে। আর্জেন্টিনা শিবিরে কিছুটা স্বস্তির খবর হচ্ছে, রাইট-ব্যাক গনসালো মনতিয়েল হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট অতটা গুরুতর নয়। তবে কানসাসে দলের সাথে অনুশীলন করলেও স্কালোনি আজকের ম্যাচে তাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেবেন না বলেই জানিয়েছে আর্জেন্টিনার টিভি চ্যানেল টিওয়াইসি স্পোর্টস। তাঁরা বলছে, অস্ট্রিয়া ম্যাচে মন্তিয়েল বেঞ্চে থাকবেন এবং তার জায়গায় শুরুর একাদশে দেখা যাবে নাহুয়েল মলিনাকে।
উল্লেখ্য, আলজেরিয়ার বিপক্ষে মনতিয়েল প্রথম একাদশে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই তাঁর জায়গায় মলিনাকে খেলিয়েছেন কোচ স্কালোনি। ফলে আজকের ম্যাচে মন্তিয়েলের অনুপস্থিতি খুব বড় কোনো ধাক্কা হয়তো নয় আলবিসেলেস্তেদের জন্য।
তবে আর্জেন্টিনার মূল একাদশে আরও দুটি ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেন কোচ স্কালোনি। এক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ার হাইপ্রেসিং ফুটবলের বিষয়টি নিশ্চয়ই বিবেচনায় রাখবেন তিনি। অস্ট্রিয়া সাধারণত হাই ডিফেন্স লাইন নিয়ে হাই কাউন্টার-প্রেসিং ফুটবল খেলে থাকে। এতে করে প্রতিপক্ষের ভুলে গোলের সুযোগ যেমন তৈরি হয়, তেমনি ডিফেন্স লাইনের পেছনে বিশেষ করে ওয়াইড এরিয়াতে অনেকটা স্পেসও তৈরি হয়।
অস্ট্রিয়ার ডিফেন্সে, অর্থাৎ নিজেদের অ্যাটাকিং থার্ডে, এই স্পেসটাকে কাজে লাগিয়েই গোলের সুযোগ তৈরি করতে চাইবেন লিওনেল স্কালোনি। আর তাই আজকের ম্যাচে থিয়াগো আলমাদার জায়গায় লেফট উইংয়ে গতি বাড়াতে নিকোলাস গনজালেসকে শুরু থেকেই খেলাতে পারেন আর্জেন্টাইন কোচ। অন্তত এমন সম্ভাবনার কথাই জানিয়েছে টিওয়াইসি স্পোর্টস।
এছাড়া, সেন্ট্রাল স্ট্রাইকার বা নাম্বার নাইন পজিশনে লাউতারো মার্টিনেজের পরিবর্তে মূল একাদশে দেখা যেতে পারে পুরোপুরি ফিট হুলিয়ান আলভারেজকে। তবে সদ্য ইনজুরি থেকে ফিরে আলজেরিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় পুরোটা (৫৪ মিনিট থেকে) খেললেও আলভারেজ এখনও শতভাগ ম্যাচ ফিট কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ফলে অস্ট্রিয়া ম্যাচেও মূল একাদশে লাউতারো মার্টিনেজের ওপরই হয়তো ভরসা রাখবেন স্কালোনি।
আলজেরিয়া ম্যাচের মতো ৪-৩-৩ ফরমেশনেই হয়তো একাদশ সাজাবেন আর্জেন্টাইন কোচ। সেক্ষেত্রে গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং রক্ষণে মলিনার পাশাপাশি দেখা যাবে রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ফাকুন্দো মেদিনাকে। মাঝমাঠে যথারীতি থাকবেন রদ্রিগো দে পল, ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ। আক্রমণে মেসির পাশে হুলিয়ান আলভারেজ ও নিকো গনজালেসের খেলার সম্ভাবনা রয়েছে।
আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য প্রথম একাদশ (৪-৩-৩)
গোলকিপার: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ
ডিফেন্স: নাহুয়েল মলিনা, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ফাকুন্দো মেদিনা
মিডফিল্ড: রদ্রিগো দে পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ
ফরোয়ার্ড: লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্টিনেজ, নিকোলাস গনজালেস
অস্ট্রিয়ার হাই-প্রেস ও কোচ রাংনিকের কৌশল
প্রশ্ন হচ্ছে, দল হিসেবে অস্ট্রিয়াকে কেন বিপজ্জনক বলা হচ্ছে? এর মূল কারণ তাদের ডাগআউটে আছেন আধুনিক ফুটবলে ‘গেগেনপ্রেসিং’-কে জনপ্রিয় করে তোলা মাস্টারমাইন্ড জার্মান কোচ রালফ রাংনিক।
যেমনটা আগেই উল্লেখ করেছি, রাংনিকের এই দলের মূল শক্তি হলো হাইপ্রেসিং। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের পায়ে বল যাওয়া মাত্রই তাঁরা দলগতভাবে প্রেস করতে শুরু করে এবং ফাইনাল থার্ডে প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করে। আর তাতেই গোলের সুযোগ তৈরি হয়।
আর্জেন্টিনার শক্ত উইং-প্লে রুখতে কোচ রাংনিক জর্ডান ম্যাচে মিডফিল্ডে খেলা কনরাড লাইমারকে হয়তো রাইট-ব্যাক পজিশনে নিয়ে আসতে পারেন। বিশেষ করে চোয়ালের ইনজুরির কারণে নিয়মিত রাইট-ব্যাক স্টিফান পশ না থাকায় তাঁর জায়গায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লাইমারের খেলার সম্ভাবনাই বেশি।
জর্ডানের বিপক্ষে বেঞ্চ থেকে এসে গোল করা অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার মার্কো আরনাতোভিচকে এবার শুরু থেকেই নামাতে পারেন রাংনিক, যার ফিজিক্যাল ফুটবল আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে পরীক্ষায় ফেলতে পারে।
অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক ডেভিড আলাবা ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘মেসি প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছে, এটা অবিশ্বাস্য! আশা করি আমাদের বিপক্ষে ও এটা করতে পারবে না। তবে আর্জেন্টিনা শুধু মেসি-নির্ভর দল নয়, বাকিদের রুখতেও আমাদেরকে দলগতভাবে সেরাটা দিতে হবে।’
অস্ট্রিয়াকে সমীহ করছে আর্জেন্টিনা
অস্ট্রিয়া সম্পর্কে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, ‘অস্ট্রিয়া কঠিন প্রতিপক্ষ, তাদের খুব ভালো খেলোয়াড় রয়েছে। তারা খুব ভালো প্রেস করে এবং বাছাইপর্বে দুর্দান্ত খেলেছে। নিঃসন্দেহে এটি বেশ একটি কঠিন ম্যাচ হবে।’ পাশাপাশি তিনি এও জানিয়েছেন যে, বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই সহজ নয়।
একই সুরে কথা বলেছেন আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ পাবলো আইমারও। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অস্ট্রিয়া অত্যন্ত ফিজিক্যাল ফুটবল খেলা কঠিন একটি দল। বোঝাই যাচ্ছে, অস্ট্রিয়াকে একেবারেই হালকাভাবে নিচ্ছে না আর্জেন্টিনা।
অস্ট্রিয়ার বাধা কীভাবে পেরোবে আর্জেন্টিনা?
এবারে প্রশ্ন হচ্ছে, রাংনিকের কৌশলের বিপক্ষে স্কালোনির মাস্টারপ্ল্যান কী হবে? অস্ট্রিয়া যেহেতু হাই-লাইন ডিফেন্স নিয়ে খেলবে, তাই তাদের ডিফেন্সের পেছনের খালি জায়গা বা স্পেস ব্যবহার করতে হবে আর্জেন্টিনাকে। এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টারের থ্রু-বল এবং নিকো গনজালেসের গতি এখানে মূল অস্ত্র হতে পারে।
আর মেসি যদি অস্ট্রিয়ান মিডফিল্ডারদের হাই-ইনটেনসিটির প্রেসের ফাঁক গলে বল পেয়ে যান, তবে ফাইনাল থার্ডে বিশেষ করে হাফ স্পেসে নিজের ক্যারিশমা দেখাতে নিশ্চয়ই ভুল করবেন না এলএমটেন।
ম্যাচের আগে ‘অপটা’-র সুপারকম্পিউটার কিন্তু অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকেই ফেভারিট মানছে। তাদের মতে, আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা ৬০ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে, অস্ট্রিয়ার জেতার সম্ভাবনা মাত্র ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ম্যাচটি ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ২২ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের তকমা ধরে রাখার মিশনে অস্ট্রিয়ার এই কঠিন চ্যালেঞ্জ কি পেরোতে পারবেন মেসি-রোমেরো-রদ্রিগোরা? নাকি মাস্টারমাইন্ড রালফ রাংনিকের হাই-প্রেসিং ফুটবলে আটকে যাবে বিশ্বজয়ীদের জয়রথ? উত্তরটা মিলবে সোমবার রাতেই।



