মানুষের জীবনে আসলে নানা পর্ব থাকে। কোনো পর্বে মাথা কাজ করে। আবার কোনো পর্বে শুধু স্রোত যেদিকে যায়, সেদিকেই ভেসে চলে যাওয়া হয়। অর্থাৎ, তখন মাথার ভেতরে আর কিছু থাকে না। অন্যে যা করে, আশপাশে যা দেখা যায়–সেসব নিয়ে প্রচণ্ড দ্বিধা তৈরি হয়। আবার সেই দ্বিধাতেও থাকে নানা যদি, কিন্তু। ফলে এক ধরনের জোম্বি দশা তৈরি হয়। আর তখনই জীবনে চলে আসে যেমন খুশি, তেমন সাজো দশা। ফলে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া উক্তির মতোই ‘জার জার ওবস্তান’ থেকে আওয়াজ আসে–‘চালাই দ্যান’!
কেমন সেটা?
এই যেমন ধরুন, এই অভাগার বাসা থেকে আসার পথটি। ওয়ান ওয়ে রোড। এমনিতেই এ দেশে রাস্তা পার হওয়া কঠিন। এপার থেকে ওপারে যাওয়া প্রমত্তা নদী সাঁতরে পার হওয়ার চেয়ে কঠিন কিছু নয়। হ্যাঁ, এ দেশের কিছু মানুষের অবশ্যই নিমেষে পাড় বদলে ফেলার সীমাহীন দক্ষতা আছে। তবে সবার তো আর মেধার পরিমাণ এক না! ফলে কারও কারও পার হতে বেশ কষ্টই হয়। সেই কষ্ট আরও হয় যখন ওয়ান ওয়ে ঘোষিত রোডে ‘চালাই দ্যান’ শুরু হয়ে যায়। আপনি হয়তো একদিকে তাকিয়ে থেকে গাড়ি দেখে-বুঝে রাস্তা পার হচ্ছেন, হঠাৎ আপনার কানের কাছে এসে হর্ন বাজাবে কোনো সিএনজি অটোরিকশা বা মোটরবাইক। এবং আপনার কানের ও মনের বারোটা বাজিয়ে এমনভাবে আপনার দিকে তাকাবে যেন, আপনার জন্যই এই পৃথিবীর আহ্নিক গতি বা বার্ষিক গতি থমকে গেছে!
এমনটা হয়, কারণ অনেক মানুষই এখন ‘চালাই দ্যান’ মুডে চলে গেছে। যে যার মতো, যেদিকে খুশি চালাচ্ছে। অবশ্য এ দেশের মানুষের মূল পৃথিবী ফেসবুকেই যখন ‘চালাই দ্যান’ চালু হয়ে গেছে, সেখানে আর বাস্তবের দুনিয়ার কী দোষ!
সমস্যা হলো, বাস্তবের দুনিয়ায় শুধু বোতাম টিপে লাইক, লাভ বা হা হা দেওয়া যায় না। শুধু আঙুলে কাজ চলে না। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিশেষ করে মুখ ও জিহ্বাকে কাজে লাগাতে হয়, কার্যকরও করতেই হয়। যেহেতু এ দেশে মানুষে মানুষে টেলিপ্যাথিক কেন, যেকোনো যোগাযোগ একেবারেই কম, ফলে ইশারা-ইঙ্গিতে আর সবকিছু বোঝা যায় না ঠিকমতো। দেখা গেল, ইঙ্গিত দিলেন এক, বুঝল আরেক! শেষে যোগাযোগ বৈকল্যজনিত হ্যাপা তো আপনাকেই নিতে হবে। তাই মুখ খুলতেই হয় অল্প করে হলেও। অবশ্য সেখানেও ‘চালাই দ্যান’ শুরু করে দেওয়াই যায়। ক্ষতি আর কী!
তবে চালানোর ক্ষেত্রেও কিন্তু মানুষ একটু ভাবে। অর্থাৎ, নিজের সুবিধা ছাড়াই যে পুরোপুরি চালায় দেয়, তা কিন্তু নয়। যারা বুঝদার, তারা চালায় বুঝেশুনে। এই যেমন ধরেন, কেউ চালানোর সময় পেছনের দিকে আর তাকায় না। বলে দেয় যে, ‘আমাদের পেছনে যেহেতু চোখ নেই, তাই আমরা পেছনে তাকাই না। তাকাই শুধু সামনের দিকে।’ হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, যাদের পেছনে সমস্যা, তারাই পেছনের দিকে আর তাকায় না। আবার যাদের সামনেই সমস্যা, তারা আবার শুধু পেছন নিয়েই পড়ে থাকে। পারলে মাথা ঘুরিয়ে ফিক্সড করে নেয় পিঠের দিকে, দেখতে বিচ্ছিরি লাগলেও থোড়াই কেয়ার! ধান্দাতে তো আর এত সুন্দর-অসুন্দরের হিসাব করলে চলে না।
সুতরাং, এদের দেখাদেখি যদি আপনিও নিজেকে উল্টে-পাল্টে বদলে ফেলে ‘চালাই দ্যান’ স্রোতে শামিল করতে চান, তবে করতেই পারেন। যখন যেটা ট্রেন্ড, সেটায় গা না ভাসালে আসলে ‘রিচ’ খুব একটা মেলে না। তবে মাথায় রাখবেন একটি কথা–‘একটু আস্তে’! নইলে কিন্তু অবস্থা হয়ে যাবে পাশের দেশের রাজেশের মতো। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রার অধিবাসী রাজেশ নিয়মিত গোসল না করায় বিয়ের ৪০ দিন পরই ডিভোর্স চেয়েছেন তাঁর স্ত্রী। ডিভোর্স চাওয়া ওই নারী জানান, রাজেশ মাসে এক থেকে দুবার গোসল করেন। এর কারণে তাঁর শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। এ নিয়ে বিয়ের কয়েক সপ্তাহ পরই এই দম্পতির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। পরে পুলিশের সঙ্গে আলোচনার পর, রাজেশ নিয়মিত গোসলের বিষয়টিতে রাজি হন।
অর্থাৎ, চালিয়ে দিতে চাইলেও, না বুঝে চালালে রাজেশের মতো পরে বাধ্য হয়ে সব মেনে নিতে হবে কিন্তু। তখন আবার কান্নাকাটি করলে লাভ হবে না। দেখা যাবে চোখ মোছার জন্য নষ্ট লুছনিও কেউ দেবে না!
আশা করি, যারা বোঝার তাঁরা বুঝেছেন। আর না বুঝলে বাজার থেকে যার যার ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী তেজপাতা কিনে নিন। কাজে দেবে।
শেষটায় সাবেক সোভিয়েত আমলের একটা কৌতুক বলে যাই। কথায় আছে, সব ভালো যার, শেষ ভালো তার। আশ্রয় নিচ্ছি মাসুদ মাহমুদের ‘সোভিয়েতস্কি কৌতুকভ (১৯১৭–১৯৯১)’ শীর্ষক বইয়ের। সেখানে একটা কৌতুক আছে এমন:
‘–মোরগ যখন মুরগিকে তাড়া করে, মুরগি তখন কী ভাবে?
–খুব বেশি জোরে দৌড়াচ্ছি না তো?’
এবার ‘জার জার ওবস্তান’ থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্ন করে ফেলুন–খুব বেশি জোরে চালাচ্ছেন না তো?



