‘মুরুব্বী…মুরুব্বী…উঁহু…উঁহু…!’
এই ডায়লগ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। অবস্থা এমন হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে সেখানে এই ডায়লগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে মুরুব্বীরা আছেন বেশ বিপদে। কিছু করতে গেলেই শুরু হয়ে যায় ‘উঁহু…উঁহু…!’ কিন্তু কেবলই মুরুব্বীদের সাথেই এমনটা করা কি বৈষম্য হয়ে যাচ্ছে না? কারণ এখন তো শুধু মুরুব্বীরাই ‘উঁহু’ করার মতো কাজ করছে, তা তো নয়। বরং মুরুব্বীদের এমন বলা জোয়ানদের অবস্থাও তথৈবচ। তবে কি মুরুব্বী ছাড়া অন্যদেরও সময়ে সময়ে উঁহু করা উচিত নয়?
এক কথায় উত্তর দিতে হলে বলতেই হয়, অবশ্যই উচিত। কারণ কে কখন কী করে বসে, তা তো আর বলা যায় না। সেক্ষেত্রে শুধু মুরুব্বী নয়, বরং নির্বিশেষে সবাইকে উঁহু করার অধিকার দেওয়া উচিত।
এই যেমন ধরুন আজকের কথাই। ব্যস্তসমস্ত রাস্তা পার হওয়া হচ্ছিল। রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তা মানে দুনিয়ার যা আছে, সব আপনার ঘাড়ে এসে পড়ার চেষ্টা করে যাবে। আর আপনি নানা তরিকায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকবেন। একবার ডানে, একবার বামে, একবার মাঝে গিয়ে নানাভাবে উল্টো দিক থেকে আসা গোলা থেকে আপনার বাঁচার চেষ্টা করে যেতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে মোটামুটি ভালোই নৈপুণ্য দেখানো হচ্ছিল। এক্ষেত্রে অচেনা, অজানা কিছু সাথীও ছিল। সবারই বাঁচার ও পার হওয়ার তাড়া ছিল। এমন সময় এক বয়স্ক ভ্যানচালক জেব্রা ক্রসিং দেখেও থামাথামির লক্ষণ না দেখিয়ে চালাতেই থাকলেন। ওমনি পাশের সাথী ডেকে উঠলেন, ‘মুরুব্বী…মুরুব্বী…!’
এভাবেই মুরুব্বীরা এখন সব ‘উঁহু’র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছেন। মুরুব্বী আসলে কারা? এ দেশের হিসাব অনুযায়ী, বয়স্ক হলেই মুরুব্বী বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। তবে সব বয়সীরাই কি আর মুরুব্বী হয়! অভিধান বলছে, মুরুব্বী একটি বিশেষ্য পদ। এর শাব্দিক অর্থ হলো, অভিভাবক বা পৃষ্ঠপোষক। অর্থাৎ, শুধু বয়স বেশি হলেই আসলে মুরুব্বী হওয়া যায় না, অভিভাবকসুলভও হতে হয়।
তবে এই বঙ্গ দেশে যা হয় আর কি। একটা অর্থ ধরে নিয়েই সবাই বলে ওঠে, ‘চালাই দ্যান’। এই নির্বিচারে চালাতে গিয়েই হয় ঝামেলা। ফলে শুধু মুরুব্বীদেরই শুনতে হচ্ছে ‘উঁহু’। কিন্তু আসলে এখন যে অবস্থা, তাতে কম বয়সীরাও না বুঝেই অনেক সময় বেশি বয়সীদের মতো আচরণ করছে। তাতে পাণ্ডিত্য না থাকলেও, পণ্ডিতি থাকছে ঠিকই। অনেকটাই ইঁচড়ে পাকা আচরণ যাকে বলে আর কি! আর এতেই ঠোঁটে চলে আসতে চাইছে–‘উঁহু…উঁহু…!’
এই পাণ্ডিত্যহীন পণ্ডিতি আসলে কেমন? অনেকটা গল্পের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মতো। গোপাল ভাঁড়ের প্রচলিত একটি গল্প তবে বলেই ফেলা যাক। গল্পের গোপালের তখন ঢের বয়স হয়েছে। চোখে ভালো দেখে না, আবার উল্টোপাল্টাও দেখে। তো একদিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, ‘কী গোপাল, গতকাল দেখিনি তোমায়। আসা হয়নি কেন?’
চতুর গোপাল বলল, ‘চোখে খানিক সমস্যা হয়েছে। সবকিছু দুটো দেখি। কাল এসেছিলাম। এসে দেখি দুটো দরবার। কোনটায় ঢুকব, সেটিই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’
গোপালের এমন কথা শুনে রাজা ভাবলেন, তিনিও কম যাবেন কেন! তাই বলে উঠলেন, ‘তোমার তো ভালোই হলো তাহলে। বড়লোক হয়ে যাবে। আগে হয়তো দেখতে তোমার আছে একটা বলদ। এখন দেখবে দুটো করে।’
রাজা ভেবেছিলেন, এ দিয়ে জব্দ করা যাবে গোপালকে। কিন্তু গোপাল তো এমনি এমনি ঘাগু হয়নি। সাথে সাথে বলে দিল, ‘যা বলেছেন মহারাজ। আগে দেখতাম আপনার দুটো পা। এখন দেখছি চারটা পা। একেবারে আমার বলদের মতোই অবস্থা!’
ঠিক এমনই অবস্থা এখন এ দেশে। নিজে জব্দ হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকলেও পণ্ডিতি যে করাই চাই। তেমন উদাহরণ পেতে চাইলে রাস্তায় নামারও দরকার নেই। একবার ফেসবুকে ঢুঁ মারলেই পেয়ে যাবেন হাজারে হাজারে।
কিন্তু তারপরও ‘উঁহু…উঁহু…’ বলা যাচ্ছে না সবাইকে। কারণ মুরুব্বী যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া। তাই মুরুব্বীর সংজ্ঞা পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। তা না হলে কিন্তু একদিন মুরুব্বীরাও জ্বলে উঠবেন আপন শক্তিতে!
এর চেয়ে বরং মুরুব্বীসহ দেশের সবাইকেই ‘উঁহু’ করার অধিকারটি দিয়েই দেওয়া হোক। বলা তো যায় না, কখন কাকে ‘উঁহু’ করা বা বলা লাগে! আর উপায় পেলে ইচ্ছা হবেই।


দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হাহা ভাইরাস, ফেসবুকের উদ্বেগ!
