মনের ভাব প্রকাশের জন্যই মানুষ কথা বলে, লেখে। কিন্তু তারপরও অনেক কথাই থাকে, যেগুলোতে কিনা আরও বৃহৎ অর্থ লুকায়িত থাকে। এই কারণেই প্রচলন হয়েছে ভাবসম্প্রসারণের। এর মাধ্যমে অনেক লুকিয়ে থাকা ভাব সম্পর্কে জানা যায়। এমন এমন ভাব, যা আপনারা হয়তো কখনো ভাবেনইনি!
স্কুলজীবনে ভাবসম্প্রসারণ না লেখা এবং না পড়া মানুষ এই দেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে হ্যাঁ, আমরা আজ আপনাদের সামনে হাজির করতে চলেছি এক নতুন ধরনের ভাবসম্প্রসারণ। তার পোশাকি নাম হলো ‘রম্য ভাবসম্প্রসারণ’। ভাবসম্প্রসারণ পড়তে পড়তে বিরক্ত যে কেউ ‘ধুর, ছাতার মাথা’ বলে মনে মনে যে ভাবের সম্প্রসারণ করে, সেটিই হলো রম্য ভাবসম্প্রসারণ। এবার তাহলে পড়েই নিন তেমনই একটি ভাবসম্প্রসারণ।
‘মধু হই হই আঁরে বিষ খাওয়াইলা!’
মূলভাব
মধুকে সব সময় ভালো জিনিস হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। মানুষ মনে করে মধুতে খারাপ কিছু নেই। কিন্তু সেই মধুতেও থাকতে পারে বিষ, যেমনটা আপাত ভালোর মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে খারাপ কিছু। তাই মধু পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত নয়। মধু বলে বলে আপনাকে বিষও খাইয়ে দিতে পারে! আর খেলেই পেট খারাপ থেকে মাথা খারাপ—হতে পারে অনেক কিছুই।
সম্প্রসারিত ভাব
বাংলায় প্রচলিত নানা কথা আছে। একটি হলো—পরশপাথরের ছোঁয়ায় লোহা হতে পারে সোনা। আবার আরেকটি কথাও আছে যে, এক বালতি দুধকে নষ্ট করার জন্য এ ফোঁটা চনাই যথেষ্ট। দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী বাক্য, তবে দুটিই সত্য। মধু যেমন আমাদের জন্য উপকারী, তেমনি মধুতে বিষ মিশিয়ে দিলে তা হয়ে যায় শারীরিক অসুস্থতা, এমনকি মৃত্যুরও কারণ। কয়েক হাজার বছর ধরে মধুর ওষধি গুণের কথা সর্বজনবিদিত। মধু একটি জটিল প্রাকৃতিক খাদ্য। মৌমাছির মাধ্যমে মানুষ মধু পায়। আগে শুধু প্রাকৃতিকভাবেই মধু আহরণ করা হতো। এখন মৌমাছির চাষ করেও মধু আহরণ করা হয়। তবে আমাদের দেশে সুন্দরবনের মধু বললে এর বিক্রয়যোগ্যতা বাড়ে। মধুতে থাকে গ্লুক্টোজ, মল্টোজ, সুক্রোজ ও ফ্রুক্টোজ। আরও থাকে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যামিনো এসিড, আয়রন ইত্যাদি। এই আয়রন সেই লোহা নয়। সুতরাং পরশপাথরের ছোঁয়ায় এটি সোনা হবে না। তবে মানবদেহের জন্য উপকারী। কিন্তু এই মধুর সঙ্গে উল্টাপাল্টা কিছু মিশে গেলেই খবর আছে। যেমন: ম্যাড হানি নামে এক ধরনের মধু আছে, যাতে গ্রায়ানোটক্সিন মিশে যায়। একে যেমন বিভিন্ন রোগের প্রতিকারে কাজে লাগানো যায়, তেমনি কম–বেশি হলে বিষক্রিয়াও হতে পারে। এতে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এভাবেই ভালোর মধ্যে মিশে যেতে পারে খারাপ কিছু। তখন আর তা ভালো থাকে না, ওই এক বালতি দুধের মতো নষ্ট হয়ে যায়। সমাজে ভালো–মন্দ দুই ধরনের মানুষই থাকে। তারা ভালো ভালো কথা বলে আপনার মন রাঙিয়ে আপনাকে মধুর বদলে বিষ খাইয়ে দিতে পারে। খাওয়ার সময় মধু ভেবে খেয়ে ফেললেই কিন্তু জীবন শেষ। এরপর বুকে হাত চেপে গাইতে হবে, ‘মধু হই হই আঁরে বিষ খাওয়াইলা!’ এই গানের কথা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে দুনিয়ার আফসোস, আক্ষেপ। মধু ভেবে বিষ বেশি করে খেয়ে ফেললে মাথাও চাপড়াতে হতে পারে। তবে যাই চাপড়ানো হোক না কেন, মধু ভেবে একবার বিষ খেয়ে ফেললে পস্তাতেই হবে। কোনো কান্নাকাটিতে আর পার পাওয়া যাবে না তখন। তবে যারা সংগ্রামী এবং জীবনকে যুদ্ধক্ষেত্র বলে বিবেচনা করে থাকেন এবং যারা কিছুটা পন্ডিত বা বেশি বোঝা অকালকুষ্মাণ্ড হিসেবে বন্ধু ও পরিজন মহলে সুবিদিত থাকেন, তারা অনেক সময় মধু ভেবে বিষ খেয়ে ফেলার পর বাঁচার জন্য অহেতুক একটি প্রচলিত বাংলা কথায় প্রতিকার খোঁজেন। তারা মনে করেন যে, বিষে হবে বিষক্ষয়! তাই আরও বেশি বেশি করে ওই মধু কাম বিষ গলাধঃকরণ করতে থাকেন। আর এভাবেই তারা সর্বনাশের চূড়ান্ত রাস্তায় পা রাখেন। দুঃখে দুঃখে জীবন তখন তেজপাতা হয়ে যায়। কারণ জ্ঞানীরা বলেছেন, বুঝলে বুঝপাতা, না বুঝলে তেজপাতা। সেই তেজপাতা অনেক সময়ই কোনো কাজে লাগানো যায় না। যদিও মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি হাঁটে। তাই মধুরূপে বিষ খেয়ে দুঃখ পেলেও উঠে দাঁড়াতে জানতে হয়। নইলে জীবনে আর কখনোই দাঁড়ানো হয়ে ওঠে না। বিশ্বের বিখ্যাত মনীষীদের জীবন পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাব, আগুনে পুড়ে পুড়ে তারা খাঁটি হয়েছেন। তাই দুঃখের দহন মানুষকে খাঁটি মানুষে পরিণত করে। আঘাতে আঘাতে, বেদনায় বেদনায় মানুষের হৃদয় কালো হয়ে যায়। কিন্তু আমরা জানি যে, কালোই জগতের আলো। তাই মধু মনে করে বিষ খেয়ে খেয়ে আমরা মানবজীবনের যথার্থ স্বরূপও উপলব্ধি করতে পারি।
মন্তব্য
অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনের নিত্যকার অনুষঙ্গ। মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। মধু ভেবে বিষ খেয়ে ফেলা তাই মানুষের জীবনে জরা-ব্যাধি বা সুখ-দুঃখের মতোই নিয়মিত ব্যাপার। এসব বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। আর ঘটে ধূসর বস্তু পরিমাণে কম থাকলে এড়িয়ে যাওয়া তো প্রায় অসম্ভবই। তবু আমাদের সাবধান থাকা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে—মধু দেবে বার বার, বিষ কিন্তু দেবে একবার! আর ওই একবারেই আপনার জীবনের থিম সং হয়ে যেতে পারে—‘প্রেমের নাম বেদনা, সে কথা বুঝিনি আগে…!’



