ব্যয়বহুল চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ানোর খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য ছিল না সিলসিলা আচার্যের মধ্যবিত্ত পরিবারের। তারপরেও তাঁরা মনেপ্রাণে চেয়েছেন, তাঁদের মেয়ে যেন ডাক্তারিতে পড়বার সুযোগ পায়। নিজের যোগ্যতা আর মেধায় সিলসিলা ঠিকই অর্জন করে নেন মেডিকেলের সরকারি বৃত্তি।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই বৃত্তি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় কিশোরী সিলসিলা। বাবাকে ফোন করে জানান, চিকিৎসক নয়, তাঁর স্বপ্ন আসলে পরিবেশ বিজ্ঞানী হওয়া।
একটি টাকাও খরচ করতে হবে না, এমন কোর্স ছেড়ে ‘পেইড কোর্সে’ পড়ার ইচ্ছা পোষণ করায় অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন। সিলসিলার আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষকেরা পর্যন্ত মনে করেছিলেন, এটি তাঁর জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত হতে চলেছে।
২০০৬ সাল। সিলসিলা তখন মাত্র দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। নেপালে ভয়াবহ এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা সেই বছর বিশ্বের শীর্ষ কয়েকজন পরিবেশবিদ মারা যান। এটি সিলসিলা আচার্যের মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। একসঙ্গে এতজন পরিবেশ কর্মীর মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, কিছুটা হলেও সেটি পূরণে নিজে অবদান রাখতে চান।
এরপর সিলসিলা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বিভিন্ন পরিসরে সক্রিয় হতে শুরু করেন। তিনি ৯.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ছয় লেনের হাইওয়েতে ঘাসের বদলে গাছ লাগানোর প্রচার চালাতে থাকেন। প্রথম দিকে বেশ ভালোই সাড়া পেয়েছিলেন সিলসিলা।
কিন্তু দ্রুত তিনি নিজের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই যুক্ত হয়ে যান হিমালয়ান ক্লাইমেট ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে।
সিলসিলা আচার্যের বড় অবদান প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার কমানো। কাঠমান্ডুতে দিনের মধ্যে ৪৭ লাখ প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। সিলসিলা এসব প্লাস্টিকের ব্যাগের পরিবর্তে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের জন্য প্রচার শুরু করেন। এই ব্যাগগুলো আবার তৈরি করে থাকেন সুবিধাবঞ্চিত পাচার হওয়া নারীরা। সিলসিলা তাই একইসঙ্গে দুইটি সামাজিক ইস্যুতে অবদান রাখেন।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে ‘না ধন্যবাদ, আমি আমার নিজের ব্যাগ নিজে বহন করি,’ নামে তিনি আরেকটি ক্যাম্পেইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা প্লাস্টিক শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল। নেপালকে এখন সবুজ অর্থনীতির পথে অগ্রসর দেখতে চান এই পরিবেশ কর্মী। সবুজ অর্থনীতি বা প্রবৃদ্ধি হলো পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করা।
বর্তমানে সিলসিলা আচার্য নেপালের বৃহত্তম প্লাস্টিক রিসাইক্লিং নেটওয়ার্কগুলোর একটি পরিচালনা করেন। তার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘আভনি ভেঞ্চারস’ প্রান্তিক সম্প্রদায় থেকে কর্মী নিয়োগ করে এবং সবুজ খাতে আরও বেশি সংখ্যক নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান করে থাকে।
হিমালয় পরিচ্ছন্নতা অভিযানের বার্ষিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত তিনি, যেখানে পর্বতারোহীদের ফেলে যাওয়া আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। ২০১৯ সাল থেকে এ কার্যক্রমের মাধ্যমে ১১৯ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এখান থেকে আবার কিছু বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে আদিবাসী নারীরা ঝুড়ি, ম্যাট এবং গয়না তৈরি করেন। এতে তাদের জীবিকা নির্বাহ হয়।
প্রতি বছর বিশ্বের সবচেয়ে অনুপ্রেরণা জাগানো এবং প্রভাবশালী নারীদের তালিকা প্রকাশ করে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। গত বছর সে তালিকায় ছিলেন নেপালের অধিবাসী টেকসই পরিবেশ উদ্যোক্তা সিলসিলা আচার্যের নামও।
তথ্যসূত্র: দ্য স্টোরি টেলার নেপাল, বিবিসি



