সেই জুলাই পেরিয়ে আরেক জুলাই। মাঝখানে একটা বছরের সমাপ্তি। জুলাই আন্দোলনে যে নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের কি আমরা মনে রেখেছি? তারা কি আসলেই হারিয়ে গেছেন, নাকি আমরাই তাদের ভুলে গেছি।
গতবছর রক্তাক্ত জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে। এই আন্দোলনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীরা ছিলেন সামনের সারিতে। রাজপথ, মিটিং, মিছিল, সংগঠন সবখানেই নারীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
১৪ই জুলাই ২০২৪, শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর রাতে হলের তালা ভেঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের রাজপথে নেমে আসা ছিল ইতিহাসের এক নতুন সূচনা। পাশাপাশি ইডেন কলেজ ও বদরুন্নেসা কলেজের মেয়েরাও হলের তালা ভেঙে রাজপথে নেমে আসেন।
জুলাই আন্দোলন চলাকালে আহত অনেকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। যেখানে একটি রক্তাক্ত মুখের নারীর ছবিও ছিল। ওই শিক্ষার্থীর নাম সানজিদা আহমেদ তন্বী। তন্বী ১৫ই জুলাই ভিসি চত্বরের সামনে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হামলায় আহত হন। তন্বীসহ আরও অনেকের ছবিতে বর্বতার যে চিত্র তুলে ফুটে ওঠে, তাতে সারা দেশের মানুষের মনে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম হয়। এ ঘটনার পরে সবাই বুঝতে পারে ফ্যাসিস্ট সরকার কতটা অমানবিক ও নিষ্ঠুর। অন্যদিকে আন্দোলন চলাকালে রাস্তা থেকে এক সহযোদ্ধাকে পুলিশ নিয়ে যেতে চাইলে এক সাহসী নারী বাঁধা দেন। এ ধরনের ঘটনাগুলো নারীদের সাহসিকতার পরিচয় দেয়।
জুলাই আন্দোলনে অনেক নারী হুমকি, পুলিশি নির্যাতন, পারিবারিক চাপ মোকাবিলা করে আন্দোলনে লড়াই করে গেছেন। যে অকুতোভয় নারীরা জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের কি আমরা মনে রেখেছি? প্রশ্ন থেকেই যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, রাজনৈতিক ও পারিবারিক চাপ সবকিছু মিলে অনেক নারী আড়ালে চলে গেছেন। তাদের কেউ কেউ এখন আর আত্মত্যাগের কথা বলতে চান না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মালিহা নামলাহ জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৫ই জুলাইয়ের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ভবনের ঘটনা ভুলে যাওয়ার মতো না। সেদিন চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে আমাদের উপর আক্রমণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে রাতে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষার্থী একত্রিত হয়ে আমাদের রক্ষা করে। অনেকেই লাইভে থাকার কারণে সারাদেশের মানুষ এ ঘটনার কথা জানতে পারে। সেদিনের ঘটনা ছিল, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার মতো ঘটনা। আন্দোলনের এই সময়টা আমি কোনোদিনও ভুলবো না।’
মালিহা আরও বলেন, ‘আরেকদিন হচ্ছে ৫ই আগস্ট, যখন আমরা লং মার্চ নিয়ে ঢাকা অভিমুখে রওনা হই। সেদিন সাভারে আমাদের উপস্থিতি অনেক বেশি ছিল। আমাদের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দিলেও আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। কারণ আমরা ঢাকায় যাবোই। সে সময় রাস্তায় সিটি সেন্টারসহ কিছু বিল্ডিংয়ের উপর থেকে পুলিশ ও ছাত্রলীগ আমাদের মিছিলে অ্যাটাক করা শুরু করে। সেদিন বেশ কয়েকজনকে চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি, আহতদের সহযোগিতা করেছি, অনেককে স্পট ডেডও হতে দেখেছি। সে সময়টা আসলে কখনই ভুলে যাওয়ার মতো না।’
মালিহা পুলিশের হামলার বিষয়ে জানান, পরিবার থেকে সবাই জানে আমি আন্দোলন করছি। তাই আব্বু বাসায় চলে যেতে বলেন। ২৭ জুলাই আমার গ্রামের বাসায় দু’বার আর ঢাকার বাসায় একবার ডিবি পুলিশ যায়। ডিবির উৎপাতের কারণে ২৮ জুলাই পরিবারের সকলকে বাসা থেকে বের হয়ে অন্যত্র থাকতে হয়। পরিবারকে আমার জন্য অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়।
জুলাই নারী যোদ্ধা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্টে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী ও মুখপাত্র (বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ) নাদিয়া রহমান অন্নেষা। তিনি জুলাই আন্দোলনে নিয়ে জানান, জুলাই আন্দোলনের দিনগুলো প্রথমে কোটা সংস্কার ছিল। তখন এ আন্দোলন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। কোটার মাধ্যমে যে বৈষম্য তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল, সে বৈষম্য দূর করার জন্য আমি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি।
নাদিয়া রহমান বলেন, ‘১৫ ই জুলাই আমাদের ওপর অ্যাটাক করা হয়। সেদিন ছাত্রলীগ বহিরাগতদের ভাড়া করে নিয়ে আসে আমাদের অ্যাটাক করার জন্য। হলে প্রথম অ্যাটাক হলে আমি আহত হই। এরপর নারী শিক্ষার্থীরা হামলার প্রতিবাদে ভিসির বাসভবনে গেলে ভিসি কোনো ব্যবস্থা নেননি। রাত আড়াইটার দিকে অনেক শিক্ষার্থী হল থেকে বেরিয়ে আসে এবং চৌরঙ্গী ও ট্রান্সপোর্ট এর মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান নেয়। সেখানে পুলিশ আমাদের মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে পুলিশ আমাদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সে রাতের স্মৃতিটাই সব থেকে বেশি মনে রাখার মতো। এখন আসলে যত সহজে সেদিনের কথা বলছি, তখন পরিস্থিতি ততটা সহজ ছিল না, পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ ছিল।’
মালিহা, নাদিয়ার মতো আরও অনেক নারী জুলাই আন্দোলনে সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছেন। তাদের প্রত্যেকের জুলাই নিয়ে ভয়ংকর স্মৃতি ছিল। তারা প্রমাণ করে দেন নারী-পুরুষ ভেদাভেদ তৈরি করে না, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে নতুন ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংগঠনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের নারীদের দেখা গেছে সাইবার বুলিং এর শিকার হতে। জুলাই আন্দোলনের নারীরা অনেক কারণে পিছিয়ে পড়েছেন। নারীকে গুরুত্ব না দেওয়া, নারী তো রাজনীতি বুঝে না, তাদের কথা বলা আর না বলা একই। সমাজে নারীদের নিয়ে এ ধরনের চিন্তা ভাবনা রয়েছে। এ কারণে আমরা বারবার পিছিয়ে যায়।
উমামা ফাতেমার মতে, নারীদের সংগ্রামটা দীর্ঘদিন ধরেই করে যেতে হবে। সারাবিশ্বে নারীরা অনেক এগিয়ে যাচ্ছেন। সে তুলনায় বাংলাদেশের নারীদের একপাশে করে রাখা হয়েছে। নারীদের এ নিয়ম ভাঙতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক সীমা আক্তার বলেন, ‘ জুলাই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে কিন্তু নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ছিল না। ঠিক যখন আন্দোলনের সফলতার প্রসঙ্গ আসে, তখন বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের অবদানকে নাই করে দেওয়ার বিষয় সামনে চলে আসে। দেশের নারীদের পিছিয়ে রাখার একটা রাজনীতি চলছে। আমাদের দেশের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, তারা নারীদের নেতৃত্ব রাজনৈতিকভাবে মেনে নিতে চায় না। তাদের মতে, নারীদের পক্ষে দেশ চালানো সম্ভব না।
সীমা আক্তারের মতে, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান স্বীকার করলেই তো তাদেরকে স্টেক দিতে হবে বিভিন্ন জায়গায়। নারীর অধিকার চাইলেই এখন ট্যাগিং এর শিকার হতে হচ্ছে। যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করলাম বৈষম্য দূর করার জন্য, সেখানে আমরা নারীরাই বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছি।
সবশেষে বলতে হয়, জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নারীরা সাহসিকতার পরিচয় দিলেও রাজনীতির রোষানলে ও সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হারিয়ে গেছে আলোচনার পরিধি থেকে। আমরা কি জুলাই নারীদের তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে প্রস্তুত, নাকি এভাবেই আড়ালে রয়ে যাবেন তারা?



