যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া, এর সঙ্গে ভূরাজনীতি-ভবিষ্যতের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ কত কিছু জড়িয়ে কত বিশ্লেষণই না হচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া-না পাওয়ার মতো বিষয়ও কি জড়িয়ে আছে? ট্রাম্পের চিঠি তো তা-ই বলছে!
রয়টার্স জানাচ্ছে, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে যে চিঠি পাঠিয়েছেন ট্রাম্প, সেখানে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্যোগের সঙ্গে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার বিষয়টি জুড়ে দিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চলমান বিরোধ যখন ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করছে, সে প্রেক্ষিতে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প সোজাসাপটাই বলে দিয়েছেন, শান্তিতে নোবেল যেহেতু তিনি পাননি, তাই আগের মতো আর ‘শুধু শান্তির কথা’ তিনি ভাবছেন না!
রয়টার্স বলছে, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরেকে যে লিখিত বার্তা পাঠিয়েছেন ট্রাম্প, সেটা তাদের নজরে এসেছে। সেখানে লেখা, ‘যেহেতু আটটির বেশি যুদ্ধ বন্ধ করার পরও আপনার দেশ আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিল না, সেহেতু আমিও নিজেকে আর শুধুই শান্তির কথাই ভাবতে বাধ্য বলে মনে করি না। শান্তি সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু এখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনটা ভালো আর যথাযথ, সেটি নিয়েই ভাবব।’
নরওয়ের নোবেল কমিটি ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পকে না দিয়ে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে মাচাদো তাঁর নোবেল পদক ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। তবে নোবেল কমিটি জানিয়ে দিয়েছে, এই পুরস্কার হস্তান্তর, ভাগ বা প্রত্যাহার করা যায় না।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো বার্তায় ট্রাম্প আবারও অভিযোগ করেন, রাশিয়া বা চীনের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে সক্ষম নয় ডেনমার্ক। তিনি লেখেন, ‘এমনিতেই-বা তাদের এই ‘মালিকানার অধিকার’টা কোথা থেকে আসে?’ আরও যোগ করেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিশ্ব নিরাপদ নয়।’
গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ডেনমার্কের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে ট্রাম্প চাপ আরও জোরদার করেছেন। এরই মধ্যে তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপিয়ান এই দেশগুলোর সবকটিই ন্যাটো জোটভুক্ত।
এই বিরোধ এমন এক ন্যাটো জোটের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলেছে, যা কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তার ভিত হিসেবে কাজ করে আসছে। অবশ্য ট্রাম্পের জমানায় ন্যাটো আগে থেকেই চাপে ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধে এবং প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত খরচ না করায় ন্যাটোর অন্য দেশগুলো, তথা ন্যাটো জোট নিয়েই ট্রাম্পের অনীহা পরিলক্ষিত হয়েছে।
এখন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই বিরোধ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। গত বছর ট্রাম্পের কড়া শুল্কের জবাবে দুই পক্ষ অনেক চেষ্টার পর যে বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছেছিল, এই সংকটে তা আবারও ঝুঁকিতে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র।
শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে, যা ধাপে ধাপে বাড়তে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কেনার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে।
৫৭ হাজার মানুষের দেশ গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স–ফ্রেডেরিক নিলসেন ফেসবুকে এক পোস্টে বলেছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার অধিকার থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না। সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে আমরা অটল থাকব।’
দাভোসে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা?
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী স্টোরে নিজের কর্মসূচি পরিবর্তন করে জানান, তিনি বুধবার ও বৃহস্পতিবার দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেবেন। বৈশ্বিক রাজনীতি ও ব্যবসার শীর্ষ নেতাদের এই বার্ষিক সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের আলপাইন অঞ্চলের এই রিসোর্টে আয়োজিত এই সম্মেলনে এ বছর স্টোরের যাওয়ার কথা ছিল না। ছয় বছর পর বুধবার ট্রাম্প এখানে থাকার এবং কী-নোট স্পিচ দেওয়ার কথা আছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসও বলেন, তিনিও বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন। তবে কেউই বাণিজ্যযুদ্ধ চায় না জানিয়েও মের্ৎস বলেছেন, ‘কিন্তু আমাদের যদি এমন শুল্কের মুখোমুখি হতে হয়, যেগুলো আমরা অযৌক্তিক মনে করি, তাহলে তার জবাব দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে।’
ইউরোপের দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের বাড়তি শুল্কের নির্দেশের পর বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা জরুরি বৈঠকে নিজেদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করবেন। যে পাল্টা ব্যবস্থাগুলো নিয়ে তাঁরা আলোচনা করবেন তার মধ্যে একটি হলো, ৯৩০০ কোটি ইউরো (১০৮০০ কোটি ডলার) মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর বিভিন্ন হারে বাড়তি শুল্ক আরোপ। অবশ্য এই প্যাকেজটি এমনিতেই ছয় মাসের স্থগিতাদেশের পর আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, ট্রাম্প তাঁর নতুন করে আরোপ করা শুল্ক উঠিয়ে না নিলে ইউরোপের দেশগুলোও হয়তো মার্কিন পণ্যের ওপর এই শুল্ক প্রত্যাহার করবে না।
আরেকটি বিকল্প হলো ‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ বা এসিআই। শক্তিশালী দেশের দিক থেকে চাপ এলে এবং সেটি কূটনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা না গেলে শেষ ব্যবস্থা হিসেবে এসিআই কার্যকর করার একটা আইন ইইউ-তে আছে, তবে এটি কখনো ব্যবহার করা হয়নি। এর আওতায় সরকারি দরপত্র, বিনিয়োগ বা ব্যাংকিং কার্যক্রমে চাপ প্রয়োগকারী দেশের (এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র) প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, তারা এখনো ‘সব পর্যায়ে’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসিআই ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিচ্ছে না তারা।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও সংযত আলোচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছেন বলে তিনি মনে করেন না।
রাশিয়া গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ভালো না খারাপ — এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে দেশটি বলেছে, বিশেষজ্ঞদের এই মূল্যায়নের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন যে, ট্রাম্প যদি সত্যিই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেন, তাহলে তিনি ‘বিশ্ব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’



