গাজা যুদ্ধ, হরমুজ সংকট, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা—সবকিছুর মাঝেও হঠাৎ করেই একটি ইস্যুতে একজোট হয়ে গেল প্রায় ২০টি মুসলিম দেশ। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু গাজা নয়, ইরানও নয়। কেন্দ্রে রয়েছে আল-আকসা মসজিদ।
জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শুধু ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপই বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে।
তুরস্ক বলছে—এটি ছিল "ঐতিহাসিক বৈঠক"। আর সেই বৈঠকের পরই প্রশ্ন উঠছে—আল-আকসা ইস্যুতে কি এবার সত্যিই একজোট হচ্ছে মুসলিম বিশ্ব?
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, আম্মানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রায় ২০টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁর ভাষায়, বৈঠকের পুরো আলোচনাই ছিল আল-আকসা মসজিদে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি পদক্ষেপ এবং পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতি নিয়ে।
ফিদান বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলো শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেনি, বরং যৌথভাবে কী ধরনের কূটনৈতিক ও বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংকটের দিকে বিশ্বের মনোযোগ সরে গেলে ইসরায়েল গাজা, পশ্চিম তীর এবং আল-আকসায় আরও সহজে পদক্ষেপ নিতে পারে।
এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল একটি স্থায়ী যৌথ ব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত। আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সম্মত হয়েছেন, পূর্ব জেরুজালেম এবং আল-আকসাসহ ইসলামিক ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরায়েলের যেকোনো পদক্ষেপ নথিভুক্ত করার জন্য একটি স্থায়ী ডকুমেন্টেশন মেকানিজম তৈরি করা হবে।
এর অংশ হিসেবে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ছবি, ভিডিও এবং তথ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্বজনমতের সামনে তুলে ধরা হবে। অর্থাৎ, এখন থেকে শুধু বিবৃতি নয়—প্রতিটি ঘটনাকে আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে মুসলিম দেশগুলো।
যৌথ ঘোষণায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আরও বলেছে—পূর্ব জেরুজালেমের আরব, ইসলামিক ও খ্রিষ্টান পরিচয় পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে, পূর্ব জেরুজালেমই ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী, এবং ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই স্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ।
আল-আকসা মসজিদ নিয়েও ছিল কঠোর অবস্থান। ঘোষণায় বলা হয়েছে, আল-আকসা কম্পাউন্ড শুধুমাত্র মুসলমানদের ইবাদতের স্থান। একই সঙ্গে আল-আকসায় বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশ, মুসল্লিদের ওপর বিধিনিষেধ, খননকাজ এবং ধর্মীয় স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়েছে।
একসময় আল-আকসা ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকত নিন্দা আর বিবৃতিতে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রায় ২০টি দেশ একই টেবিলে বসে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেনি, বরং যৌথ পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক কৌশল নিয়েও আলোচনা করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই ঐক্য কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সত্যিই ইসরায়েলের ওপর নতুন আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়।



