এক সমুদ্র পেরিয়ে অন্য সমুদ্রে পৌঁছে গেল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ? একদিকে ইরানের কারণে কার্যত বন্ধ হরমুজ প্রণালি। অন্যদিকে ইয়েমেনের কাছে বাব আল-মান্দাবেও জাহাজে হামলা—প্রাণ গেল ছয়জনের। ঠিক একই সময়ে, ওমান উপসাগরে ইরানের বন্দর অবরোধ ভাঙার অভিযোগে একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ হরমুজ থেকে লোহিত সাগর—মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো যেন একের পর এক জ্বলন্ত আগুনে পরিণত হচ্ছে!
সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো, একটি সমুদ্রপথ বন্ধ হলে অন্য পথ দিয়ে বাণিজ্য চালানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু যখন সেই বিকল্প পথও অস্থির হয়ে ওঠে, তখন আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী। হামলায় নিহত হয়েছেন ছয়জন। তাঁদের মধ্যে চারজন ছিলেন জাহাজের ক্রু, আর দুজন ছিলেন ইয়েমেনের সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের সদস্য। এই হামলাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক সংঘাতের নতুন পর্যায়ে ইয়েমেনের কাছে এটিই প্রথম নিশ্চিত প্রাণহানির ঘটনা। ঘটনাটি ঘটছে এমন সময়ে, যখন হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তুঙ্গে।
হরমুজ কার্যত বন্ধ থাকায় এখন নজর পড়েছে ইয়েমেনের দক্ষিণ প্রান্তের বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে। এই পথটি লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে এবং সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই পথেই যদি আবার হামলা শুরু হয়—তাহলে একটি বন্ধ সমুদ্রপথের বিকল্প আরেকটি পথও নিরাপদ থাকবে না।
এর মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে আমেরিকা। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে একটি পানামার পতাকাবাহী জাহাজকে থামানোর চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ—জাহাজটি ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এরপর একটি মার্কিন হেলিকপ্টার জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং জাহাজটি অচল হয়ে যায়।
তবে এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা এরই মধ্যে ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজকে অবরোধ অতিক্রমের চেষ্টা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তিনটি জাহাজকে অচল করা হয়েছে এবং দুটিতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। আর এই পুরো অভিযানে আরব সাগর ও আশপাশের পানিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টির বেশি যুদ্ধজাহাজ, যার মধ্যে রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং একটি অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ।
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সংঘাত নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রপথে। হরমুজ বন্ধ—বাব আল-মান্দাবে রক্তক্ষয়ী হামলা—ওমান উপসাগরে মার্কিন অভিযান—একটি সংঘাত যেন একের পর এক নতুন সমুদ্রপথকে টেনে নিচ্ছে নিজের ভেতরে। আর সমুদ্রপথ যত অশান্ত হবে, জ্বালানি, পণ্য ও বাণিজ্যের নিরাপদ চলাচল তত কঠিন হবে। আজ তাই মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রের দিকে তাকালে শুধু ঢেউ দেখা যাচ্ছে না—দেখা যাচ্ছে যুদ্ধের ছায়া। হরমুজ থেকে লোহিত সাগর—মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্র যেন সত্যিই এক ‘জলজ্যান্ত আগুন’।



