ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ। বর্তমানে আমাদের দেশে এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তা সত্ত্বেও মাঝেমাঝে আমরা শুনি বা খবরের কাগজে পড়ি একজন ধর্ষকের সঙ্গেই ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী নারীর বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আমাদের এই সমাজে ধর্ষককে যখন ভুক্তভোগী নারীকে বিয়ে করতে বলা হয়, তা যে শাস্তি নয় প্রকারান্তরে পুরস্কৃত করা এটা গ্রাম্য সালিশকারকেরা বুঝতে পারেন না। এ বিষয়টি ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী নারীর অভিভাবকরাও বুঝতে পারেন না, অথবা অসহায় হয়ে মেনে নেন। কিন্তু গভীর পরিতাপের বিষয় হল, যারা দেশের বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত তাঁরাও কি সেটা বুঝতে সক্ষম নন? কারণ ইতোমধ্যে আদালত চত্বরেই ধর্ষণের অপরাধে অভিযুক্ত বিচারাধীন কয়েকজন আসামীর সঙ্গে তাদেরই দ্বারা নির্যাতিত নারীদের বিয়ে হয়েছে। অপরাধী বরমাল্য পরে আদালত থেকে সসম্মানে মুক্তি পেয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি গেছেন।
মানুষ যখন ধর্ষণ অপরাধের আইন কানুন ও এর বিচার সম্পর্কে ধারণা পায়, তখন মামলার ভয়ে ধর্ষক ও তার পরিবার সমাজপতিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। প্রভাবিত এই সমাজপতিরা নির্যাতনের শিকার নারীর স্বজনদের বলেন, মামলা করে কী হবে? বিষয়টি জানাজানি হলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবি? তোর 'নষ্ট মেয়ে'র আর বিয়ে হবে? মোকদ্দমা করতে করতে অর্থের পাশাপাশি মানও যাবে। আর মাঝখান থেকে মেয়ের বিয়ে হবে না। তখন আম ছালা দুটোই যাবে। তারচেয়ে ভালো ওসব বাদ দিয়ে আপস করে ফেলা। ছেলেটির মা–বাপ যে দয়া করে তাদের ছেলের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দেবে, বউ করে নেবে সে তো তোদের ভাগ্য!
এখন কথা হচ্ছে কেন ধর্ষণের অপরাধে বিবাহ নামের এই শাস্তি? ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধের ধর্ষককে তো কারোর পছন্দ হওয়ার কথা না। তাহলে তার হাতেই কেন ভুক্তভোগী নারীকে তুলে দেওয়া? এ তো বিবাহের নামে আসলে শাস্তির বদলে একজন ধর্ষকের হাতে আজীবন ধর্ষণ করার একটা লাইসেন্স ধরিয়ে দেওয়া।
একজন ধর্ষককে এভাবে পুরস্কৃত করার মূলে রয়েছে সমাজের মনস্তত্ত্ব। যে মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য কোনো সমাজবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই। আমরা চুরি, ডাকাতি বা খুনের দায়ে অভিযুক্তদের ঘৃণা করি। কিন্তু নারীর ওপর সংঘটিত অপরাধের বেলায় আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অপরাধীকে নয়, যার সঙ্গে অপরাধ করা হয় তাকেই ঘৃণা কর। তাই যখন কোনো নারী যৌন সহিংসতা বা ধর্ষণের শিকার হন, তখন সমাজ ধর্ষককে নয় ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকেই ঘৃণা করে। কারণ মানুষ মনে করে, একজন নারী ধর্ষিত হওয়া মানে নষ্ট হয়ে যাওয়া। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মেয়েটি কেন ঘৃণার পাত্রী হবে? ধর্ষক অপরাধী বলেই তো আইন তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছে। আর তার সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড। অথচ সমাজ এই জঘন্য অপরাধীকে ঘৃণা করে না।
আদালতের বিচারক যাঁরা দুনিয়ার সকল আইনকানুন জানেন, তাঁদের মনে কি প্রশ্ন জাগে না? ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য অপরাধী বিয়েতে রাজী হয়। ওই অপরাধী বিয়ে করে অব্যাহতি পাওয়ার পর স্ত্রী হিসেবে ওই নারীকে তালাক দেবে না তার নিশ্চয়তা কী? তাছাড়া ভুক্তভোগীকে বিয়ে করলেই যদি ধর্ষণের অপরাধ মোচন হয়ে যায়, তাহলে তো ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।
ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধের কারণে বিবাহ কোনো শাস্তি বা সমাধান হতে পারে না। আওয়াজ তুলতে হবে ধর্ষকের সঙ্গে কখনোই বিবাহ নয় বরং তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিলেও অন্ততপক্ষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিশ্চিত করা উচিত। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করে তোলা। এ জন্য রাষ্ট্রীয় ও সংগঠিত সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। আর মানুষকে মানতে হবে যে, নারী কোনো আলু পটল বা ফল নয় যে পচে যাবে বা অপাঙ্ক্তেয় হয়ে যাবে বলে তাকে একজন অপরাধীর গলায় বরমাল্য দিতে হবে।



