৮ মার্চ: নারীমুক্তির সংগ্রামী দিন

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ১২:৫৮ পিএম
গত শতকের শুরুতে আমেরিকার নিউইয়র্কের তৈরি পোশাক শিল্পের একটা খণ্ডচিত্র বলি আগে। নিউইয়র্ক ছিল তখন গোটা আমেরিকার তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। ওদের শ্রমিকদের বেশির ভাগই ছিল কম বয়সী মেয়েরা। শুরু হতো শিক্ষানবিশ হিসেবে; মালিকেরা শিশুশ্রমিকদের নিয়োগ করত শিক্ষানবিশ হিসেবে। এরা পেত সবেচেয়ে কম বেতন। কয়েক বছর কাজ করার পর ওদের নিয়োগ হতো অপারেটর হিসেবে। অপারেটর হলে বেতন কিছুটা বেড়ে যায় বটে, কিন্তু ওই বাড়তি বেতনটাও ছিল এমন যে, কোনো রকমে খেয়ে–পরে বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে যেত। অপারেটর হিসেবেই প্রতিটা নারী শ্রমিককে কাজ করতে হতো দীর্ঘদিন। দক্ষ শ্রমিকদের বেশির ভাগই ছিল পুরুষ। ওরা কাজ করতো কাটার বা স্যাম্পল মেকার বা ওই রকম নানা পদে। ওদের বেতন মোটামুটি খারাপ ছিল না। ফ্যাক্টরিগুলোতে কাজের পরিবেশ ছিল ভয়াবহ। আগুনে পুড়ে শ্রমিকের মৃত্যু ছিল সাধারণ ঘটনা। যখন বেশি অর্ডার থাকত, সেই সময়ে শ্রমিকদের কাজের ঘণ্টার কোনো হিসাব–কিতাব ছিল না। 
 
কাজের পরিবেশ কি আপনাদের পরিচিত মনে হচ্ছে? হতে পারে। এই রকম পরিবেশে কে কাজ করবে? ইমিগ্র্যান্ট মেয়েরা যারা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে এসেছে, ওদের বেশির ভাগই আবার দরিদ্র ইহুদি বংশোদ্ভূত—এরা কাজ করতো। শিশুশ্রম তো ছিলই; দশ–এগারো বছর বয়সের বাচ্চারাও কাজ করত। বেশির ভাগ শ্রমিকই ছিল কম বয়সী। শিশু–কিশোর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ তেইশ–চব্বিশ বা পঁচিশ বছর বয়সী নারীরা ছিল শ্রমিক। সেই সময় আমেরিকার আইনে শ্রমিকদের জন্যে কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। ইউনিয়নগুলো ছিল; কিন্তু সেগুলোর নেতৃত্বেও ছিল বয়স্ক পুরুষরা। এসব কমবয়সী নারী শ্রমিকদের ব্যাপারে ওদের খুব বেশি মাথাব্যাথা ছিল না। গার্মেন্টসে কর্মরত নারী শ্রমিকদের ইউনিয়নও ছিল বটে। এরা সমাজতন্ত্রী ছিল; ওদের প্রভাব ও শক্তিও ছিল সীমিত। ফলে এই সব হতদরিদ্র হতভাগী শ্রমিকদের জন্য শক্ত আন্দোলন গড়ে তোলা বা ওদের দাবিদাওয়া নিয়ে খুব কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কেউ ছিল না। 
এই রকম একটা পরিস্থিতিতে ১৯০৯ সনের ২২ নভেম্বর নিউইয়র্কেরই একটা হলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের দাবি–দাওয়া ও শ্রমিকদের সমস্যা সমাধান ইত্যাদি নিয়ে একটা সভা হচ্ছে। বেশ বড় সভা। গুরুত্বপূর্ণ সব নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা দিচ্ছেন। একজন সিনেটরও বোধ হয় ছিলেন। সিনেটে একজন সিনেটর একটা পঁচিশ দফা প্রস্তাব করেছেন বিদ্যমান কাজের পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে; সেই পঁচিশ দফা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছিল। দুই ঘণ্টা বক্তৃতা শোনার পর এই রকম আলোচনার মাঝখানে দর্শক সারিতে তেইশ বছর বয়সী এক মেয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন। স্পষ্টতই ধৈর্যহারা সেই মেয়েটি মঞ্চের বক্তাকে থামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘আমি একজন শ্রমিক মেয়ে। আমার ফ্যাক্টরিতে আমি ধর্মঘটে আছি। আপনাদের এই সব সাধারণ আলোচনা অনেক শুনেছি। এখানে আমরা এসেছি একটা সিদ্ধান্তের জন্য, ধর্মঘট করব–কি করব না। আমি প্রস্তাব করছি যে, ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হোক—এক্ষুনি।  এই মেয়েটার নাম ক্লারা লেমলিখ; ইউক্রেন থেকে আসা একজন ইমিগ্র্যান্ট নারী শ্রমিক।’
 
ক্লারা লেমলিখের ওই কথায় যেন পুরো হলে আগুন জ্বলে ওঠে। উপস্থিত সকল নারী শ্রমিক চিৎকার করে ক্লারার প্রস্তাবে সমর্থন জানায়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় তখনই যে, আগামীকাল সকাল থেকেই সকল তৈরী পোশাক কারখানায় দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট। পরদিন ২৩ মভেম্বর সকালে পনেরো হাজার নারী শ্রমিক জড়ো হয় নিউইয়র্কের রাস্তায়। দিনের মাঝমাঝি গিয়ে ওদের সংখ্যা দাঁড়ায় বিশ হাজারের মতো। কেউ কেউ বলেন সংখ্যাটি আরও বেশি ছিল। কিছু পুরুষ শ্রমিকও ছিল। কিন্তু শতকরা সত্তর ভাগের চেয়ে বেশি ছিল নারী শ্রমিক; বিশেষ করে শিক্ষানবিশ আর অপারেটররা। শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সবদিকে। ফলে সব ফ্যাক্টরিতেই পূর্ণ ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়।
নিউইয়র্কের সেই কনকনে শীতে, গায়ে যথেষ্ট গরম কাপড় নাই, তবুও সেই সব অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা শিক্ষানবিশ আর অপারেটর কিশোরী, আর সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়েরা অসমসাহসী এক সংগ্রামের সূচনা করে। ওরাই মূলত প্রতিদিন পিকেটিং করেছে, রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করেছে, লিফলেট বিলি করেছে, মানুষের কাছ থেকে হাত পেতে চাঁদা তুলেছে। প্রতিদন ওদেরকে পুলিশ তাড়া করেছে, মালিকপক্ষের গুণ্ডারা মারধর করেছে। প্রথম এক মাসেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে সাড়ে সাত শর মতো শ্রমিককে। ক্লারা লেমলিখকেই গ্রেপ্তার করেছে সতেরোবার। ওকে পিটিয়ে ওর পাঁজরের ছয়টা হাড় ভেঙে দিয়েছে। একেকবার গ্রেপ্তার হয়, ওদেরকে জামিনে ছাড়িয়ে আনার পর ওরা আবার যোগ দেয় ধর্মঘটে। অনেক মেয়েকেই আবার সংক্ষিপ্ত বিচার করে সাজা দিয়ে দেয় কোর্ট। সাজাপ্রাপ্ত এ রকম মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী মেয়েটার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। এত অত্যাচারেও এই মেয়েরা মাঠ ছেড়ে দেয়নি; ধর্মঘট চলেছে প্রায় তিন মাস। 
 
প্রায় তিন মাস পর গিয়ে আংশিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে ধর্মঘট শেষ হয়। ১৯০৯ সালের ২৩ নভেম্বর শুরু হয়ে ১৯১০ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। সাফল্য খুব বেশি ছিল না। তবুও সেই সময়ে নিউইয়র্কের সাড়ে তিন শ ফ্যাক্টরির মধ্যে ৩৩৯টা ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের সাথে চুক্তি করে। ওরা রাজি হয় যে, ইউনিয়ন করার জন্য শ্রমিকদের আর শায়েস্তা করা হবে না। বেতন–ভাতা কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়; আর কর্মঘণ্টা ঠিক করা হয় সপ্তাহে বায়ান্ন ঘণ্টা। ক্লারা লেমলিখ যে ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন, ট্রায়াঙ্গল শার্টওয়েস্ট ফ্যাক্টরি, সেটা শ্রমিকদের সাথে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। বছরখানেক পর সেই ফ্যাক্টরিটাতে আগুন লেগে প্রায় দেড় শর মতো শ্রমিকের প্রাণ যায়, যাদের বেশির ভাগই ছিল কমবয়সী নারী শ্রমিক।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আলোচনা করতে গিয়ে এই ধর্মঘটটির কথা কেন বলছি এত বিস্তারিত করে? কারণ নারী দিবস উদ্‌যাপনের পেছনের ইতিহাস আলোচনায় নারী শ্রমিক ও সমাজতন্ত্রীদের ভূমিকার কথা আজকাল অনেকেই আড়াল করতে চায়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নারীবর্ষের সাথে ৮ মার্চ তারিখটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণার আগ পর্যন্ত সে সময়ের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো ছাড়া অন্যরা কেউ রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী দিবস পালন করত না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে সরকারি ছুটি ছিল এবং দিনটি পালন করা হতো অনেকটা মে দিবসের সমান মর্যাদায়। আর দিবসটি পৃথিবীর সর্বত্রই উদ্‌যাপিত হতো নারী মুক্তির দিবস হিসেবে।
 
নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকদের সেই ধর্মঘটের পর এটা উদ্‌যাপনের জন্যে ১৯১০ সালের ৮ মার্চে নারী শ্রমিকদের শোভাযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে আমেরিকার সমাজতন্ত্রীরা। আর সেই বছরই আগস্টে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রী নারী সম্মেলনে জার্মানির কমিউনিস্ট নেতা ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রতি বছর ৮ মার্চ তারিখ বিশ্বজুড়ে বিশ্ব নারী দিবস উদ্‌যাপন করা হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ১৯১১ সাল থেকে ইউরোপে ও বিশ্বের সর্বত্র দিবসটি সেভাবেই উদ্‌যাপিত হয়। জাতিসংঘ দিবসটিকে ঘোষণা করে অনেক পরে, ১৯৭৫ সালে। 
 
বলতেই হয় যে, এখন দিবসটিকে একরকমভাবে ছিনতাই করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এবং স্থানীয়ভাবে জাতিসংঘ বা অন্য যারাই ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস উদ্‌যাপন করে, তারা নারী দিবসের এই সংগ্রামী দিকটা, তথা সমাজতন্ত্রী দিকটা, যেন যতটুকু সম্ভব আড়াল করতে চান। ভাবখানা এমন যেন, নারীমুক্তির জন্যে আর লড়াই সংগ্রামের প্রয়োজন নেই; নারী শ্রমিকদের জন্য আর কোনো আন্দোলন সংগ্রাম এসব কিছুর প্রয়োজন নেই। যেন কিছু কিছু এনজিও ধরনের কল্যাণমুখী বা সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করলেই নারীর মুক্তি ঘটে যাবে। ওরা এখন আমাদেরকে শিখিয়েছে যে, বেগুনী রঙের বস্ত্র পরে ওই রকম কল্যাণধর্মী একটা থিম ঠিক করে কিছু গান–বাজনা করব, ব্যাস হয়ে গেল নারী দিবস। সবিনয়ে বলি, এসব কাজ হচ্ছে নারী দিবসকে সংগ্রামী নারীর কাছ থেকে হরণ করে নেওয়ার চেষ্টামাত্র। প্রকৃত হিসাবে ৮ মার্চ গোলাপি রঙের দিন নয় বা বেগুনী রঙের দিন নয়। ৮ মার্চ হচ্ছে টকটকে লাল রঙের দিন; নারীর সংগ্রামের দিন, লড়াইয়ের দিন, লড়াই চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞার দিন। এই লড়াই–সংগ্রাম কীসের লক্ষ্যে? না, কিছু বাড়তি সুযোগ–সুবিধার জন্যে নয়, লড়াইটা হচ্ছে বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্যে—বৈষম্যের চূড়ান্ত বিলোপ।

 

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বাঙালি নারীর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শ আর বিপ্লবের কথা যখন লেখা হয় সবার আগে আসে প্রীতিলতার নাম। শিল্পী, শিক্ষিকা, দার্শনিক, এবং নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক প্রীতিলকার জীবন গল্প আমাদের শেখায়,...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
যে কমিশনের উদ্দেশ্যই ছিল ‘সমাজের সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা’, সেখানে শুরু থেকেই নারীর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে কেবল উপেক্ষা নয়, বরং কাঠামোগত অবহেলার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। প্রস্তাবটি...
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট পোশাক পরার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এই নির্দেশনায় নারীদের জন্য শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ওড়না এবং অন্যান্য...
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তিন বছর বয়সী এক শিশু আহত হয়েছে। টানা বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, ‘বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ গণভোটকে অবৈধ বলেছেন। আমরা তাকে বলতে চাই, গণভোট যদি অবৈধ হয়, তাহলে বিএনপি সরকার,...
এসডিজি ব্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ তিনটি ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হওয়ার পাশাপাশি আরও দুটি ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড (ইউবিএল)। এর মাধ্যমে...
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। আজ সোমবার এক বিবৃতিতে এই নৌ অবরোধের কথা জানিয়েছেন ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর