আমাদের দেশে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বিষয়টি এখনো আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তা কার্যকর নয়। নারী–পুরুষের সমতার মানে হচ্ছে জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকবে, সমান সুযোগ-সুবিধা থাকবে এবং সমান অধিকার ভোগ করবে। অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ মানুষকে যোগ্য করে তোলে। নির্ভরশীল নয়, বরং দায়িত্ববান করে।
আমাদের সমাজের সর্বত্র নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। একদিকে নারী দায়িত্বশীল নয় বলে সর্বত্র আলোচনা ও সেটাকে সত্য প্রমাণ করার একপেশে যুক্তি তুলে ধরা হয়, অন্যদিকে নারী দায়িত্বশীল হোক সেটাও যেন সমাজ মেনে নিতে পারে না। নারীর প্রতি বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে নানা ধরনের নেতিবাচক বয়ান ছড়িয়ে সমাজের সর্বত্র বিষময় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা এখন পর্যন্ত সমাজের স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। বৈষম্যই যেন নারীর ভবিতব্য। নারীর প্রতি ক্রমাগত ছুড়ে দেওয়া নেতিবাচক শব্দ, আচরণ নারীকে নিজের প্রতি আস্থা রাখতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের সমাজ বাস্তবতায় আজও পারিবারিক বন্ধন টিকিয়ে রাখছে নারী। ঘরকন্যা থেকে শুরু করে সন্তান প্রতিপালনে হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি এখনো নারী পায় না। যে নারীর হাত ধরে পৃথিবীতে কৃষিকাজের উদ্ভব হলো, বীজতলা থেকে শুরু করে বীজ সংরক্ষণ করে চলেছে যে নারী, সেই বীজে এখনো পর্যন্ত তাকে অধিকার দেওয়া হয় না। বীজ বা শস্য কোথায় বিক্রয় হবে, সেখান থেকে নগদ কত অর্থ এল বা সে অর্থ কোন কাজে লাগবে—আজও তা জানার অধিকার নারীর নেই। বাংলাদেশে ছিয়ানব্বই শতাংশ জমির মালিক পুরুষ। যে চার শতাংশ নারীর জমির মালিকানা আছে, তা সমাজের ধনীক শ্রেণির অর্ন্তভূক্ত। দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের জমির ওপর কোনো অধিকার নেই। অথচ এ দেশে বিপুলসংখ্যক নারী কৃষি শ্রমের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু জমির মালিক না হওয়ায় কৃষক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি নেই। প্রান্তিক পর্যায়ের নারীরা তাদের স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে রাষ্ট্রীয় অনুদানে জমির মালিকানা পেতে পারেন। তবে একাকী নারী বা বিধবা নারীদের জমির মালিকানা পেতে পুত্র সন্তান থাকার শর্ত আছে, যা নারীদের প্রতি সুস্পষ্ট বৈষম্য।
বাংলাদেশে গত চার দশকজুড়ে ক্ষুদ্রঋণের সমিতিগুলোতে যে বিপুল প্রবাহ গ্রামীণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের অর্থনীতিকে সচল করে রেখেছে, তার প্রায় শতভাগই নারীর হাত ধরে পরিচালিত হচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণের দায় নারীর। কিন্তু ঋণ কী কাজে লাগবে; অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত এখনো পুরুষের হাতে। পুরুষ ঋণ নিয়ে পরিশোধ করে না বা নয়ছয় করে বলে সমিতিগুলো নারীদের ঋণ দেয়। অথচ সেই নারীদের সম্পর্কে প্রপাগাণ্ডা হলো তারা ঋণ ব্যবহার করতে পারে না বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
আজকাল অনেক নারীকেই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, ঋণগ্রস্ত হয়ে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই বা স্থাবর সম্পত্তি করতে দেখা যায়। অথচ নিজের আয়ে উপার্জিত এই সম্পদেও নারীর ইচ্ছানুযায়ী পূর্ণ ব্যবস্থাপনার অধিকার নেই। দেশে মুসলিম নারীরা ধর্মীয় বিধিমোতাবেক সম্পত্তিতে কিছু অধিকার পেলেও হিন্দু-বৌদ্ধ নারীরা এখনো সম্পত্তির অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
এ দেশের রাজনীতিও নারীকে ব্রাত্য করে রেখেছে। সংরক্ষিত আসনের নামে নারীকে প্রকৃত ক্ষমতাকাঠামো থেকে দূরে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্র-সমাজ অথবা ব্যক্তিজীবন—সকল কিছুই পরিচালিত হয় রাজনীতির হাত ধরে। রাজনীতিতে নারী এখনো কেবলমাত্র সৌন্দর্যবর্ধনের বস্তুমাত্র। ফলে সমঅধিকার, সমসুযোগ প্রশ্নে জাতীয় সংসদে আসন পাওয়া নারীদের নারী অধিকারের বিষয়ে কোনো ভূমিকাই গ্রহণ করতে দেখা যায় না। রাজনৈতিক দলেরও স্বাভাবিক প্রবণতা নারীকে সংরক্ষিত পদে আটকে রাখা। প্রকৃত ক্ষমতায়নের প্রশ্নে রাষ্ট্র এবং রাজনীতি এখন পর্যন্ত নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি বা করতে চায়নি।
বাংলাদেশে দীর্ঘকাল যাবৎ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নারী উন্নয়নের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানের মতো এ সকল প্রকল্প থেকে নারীর ক্ষমতায়ন অনেকটা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং এখনো থাকছে। প্রকল্পের সময়কালের সাথে সাথে নারীদের ক্ষমতায়নের সময়কাল শেষ হওয়ার নজিরও এ দেশে কম নেই। ফলে কাজের কাজ হয়েছে খুব সামান্যই।
দেশের সংবিধানের ২৮(২) ধারায় পরিষ্কার বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ কিন্তু বাস্তবতা এখনো সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিডও সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের অনাগ্রহ যেন কাটছেই না। ফলে ২ ও ১৬.১(গ) ধারার সংরক্ষণ এখনো বলবৎ রয়েছে। ধারা-২ এ বলা হয়েছে—বৈষম্য বিলোপ করে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপনের নীতিমালা গ্রহণ; অর্থাৎ, নারীর সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে শরিক দেশগুলো আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে এবং আইনের সংস্কার করবে। ১৬.১(গ) ধারায় বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য—‘নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ, এগিয়ে নিতে হোক বিনিয়োগ।’ আইনের সংস্কার ছাড়া তা কি আদৌ সম্ভব!
শিল্প বিপ্লবের ফলে অভাবী নারীরা কলকারখানায় যোগ দিয়ে উপার্জনের পথ পায়, কিন্তু ন্যায্য মজুরি থেকে তারা আজও বঞ্চিত। নারীরা বিশ্বের দেশে দেশে জাতীয় আন্দোলনে নিঃস্বার্থভাবে লড়াইয়ে নেমেছে। বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার কাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু তার ব্যক্তি সত্তা বিকাশের প্রশ্নটি যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই রয়ে গেছে। নারী এখনো মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। সে জন্যই নারীর জীবনের নিজস্ব চাহিদা পূরণের জন্য আন্দোলনের পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে। এ ক্ষেত্রে ৮ মার্চ আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে নারীকেই সোচ্চার হতে হবে। এই আন্দোলনের নাম নারী প্রগতির আন্দোলন। এ চেতনাকেই ক্লারা জেটকিন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
এ কথা নারীকে বুঝতে হবে, নারী মুক্তি কারও দয়ায় আসে না, নারীকে তা অর্জন করতে হয়। আত্ম-সচেতনতা ও আত্ম-মর্যাদা বোধই নারীমুক্তি সংগ্রামের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। আবার এটাও ঠিক নারীমুক্তির লড়াইটি একদিনের নয়, প্রতিদিনের এবং একটি দিবসের গণ্ডিতে তা আবদ্ধ নয়। সকল টানাপোড়েনকে সঙ্গে নিয়েই নারীরা ক্রমে বেশিমাত্রায় সামাজিক শ্রমে যুক্ত হচ্ছেন। বাইরের কাজে নারী যেভাবে পুরুষের সহযোগী হচ্ছেন, ঘরের কাজে তেমন করে পুরুষের সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এ ছাড়া রয়েছে কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগের অভাব ও যৌন হয়রানির বিপদ। এ অবস্থায় কর্মজীবী নারীদের সক্ষমতা যেমন বাড়ছে, সাথে সাথে তাদের শারীরিক ও মানসিক বোঝাও বেড়ে গেছে। তারপরেও নারী প্রগতির আন্দোলন চলছে। কি উন্নত, কি অনুন্নত, কি উন্নয়নশীল—সকল দেশের সকল সমাজের নারীরা আজ একই কাতারে দাঁড়িয়ে লড়াই করে চলেছে।
অতীতের নারী সমাজের সংগ্রামী ঐতিহ্যের ধারায় আজও আমরা সিক্ত হচ্ছি। তবে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আজ নারী একা লড়াই করছে না, পুরুষরাও তাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। ৮ মার্চ পালন তাই আজ কেবল নারীদের নয়, নারী-পুরুষের সম্মিলিত উদ্যোগের বিষয়। নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে যে সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি, ৮ মার্চ যুগ যুগ ধরে ধ্রুবতারার মতো আমাদের পথ দেখিয়ে চলেছে এবং যতদিন সমাজে নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন ৮ মার্চের কাছেই ফিরে যেতে হবে।
লেখক: কলাম লেখক


লড়াইটা নারীর একার নয়
৮ মার্চ: নারীমুক্তির সংগ্রামী দিন
আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ
যাঁর হাত ধরে এল নারী দিবস
