ঢাকা শহরে জমির দাম হু হু করে বাড়ছে। কিছু কিছু জায়গায় তো মাটির দাম কেজিতে সোনা ছুঁইছুঁই হয়ে উঠতে বসেছে। কে জানে কোথাও হয়তো ছাড়িয়েও গেছে। মধ্যবিত্তরা তবু ঢাকার জমি কিনছেন। অদূরে, উপকণ্ঠে, ‘ওই ব্রিজ’ থেকে ‘৩০ মিনিট’ দূরত্বে - নানা ট্যাগে বিক্রি হচ্ছে জমি। সে জমি ততটুকুই ঢাকার, যতটুকু নিরেট বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই কোনো না কোনো প্রভাবশালীর সঙ্গে খুঁজে পাওয়া তাঁর আত্মীয়তার দাবির!
ঢাকার জমি বেশ লোভনীয়, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। তাই তিন বন্ধু মিলে যখন ‘ঢাকার জমি’ পাওয়ার ডিল করেন, আর তা একজনের কারণে হাতছাড়া হতে বসে, তখন রাগ হতেই পারে।
তামিম ইকবালেরও রাগ হয়েছে। রেগেমেগে অনুজ মেহেদী হাসান মিরাজকে ফোন করেছেন। সে ফোনে মুশফিকুর রহিমকে প্রথমে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন, পরে যাচ্ছেতাইভাবে কথা শুনিয়েছেন।
এদিকে সেই ফোনালাপ ফাঁস হয়ে চলে গেছে এক টিভি চ্যানেলের কাছে। তারাও স্বভাবসুলভ উপায়ে রঙচঙে মোড়কে তা পরিবেশন করেছে। ভিডিও ভাইরাল হতেই জাতি তিন পক্ষ। এক পক্ষ ক্ষিপ্ত মুশফিকের ওপর, কী করে পারলেন তিনি তামিমের মনে আঘাত দিতে! আরেক পক্ষের ক্ষোভ মিরাজে - কারণ ফোনালাপের শব্দে স্পষ্ট, এটা ফাঁস হয়েছে তাঁর প্রান্ত থেকে। আরেক পক্ষ হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে - গত মাস ছয়েকে নিজের অবস্থান হারানোর যে ভয়ংকর চোরাস্রোতে আটকা পড়েছেন তামিম, এটিকে সে স্রোতেরই আরেকটি অধ্যায় ভেবে।
শেষ পক্ষের মধ্যে যারা একটু খোঁজখবর রাখেন, তারা বুঝতে পেরেছিলেন এটা একটা বিজ্ঞাপনের অংশ। একটি মোবাইলভিত্তিক ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মনোযোগ আকর্ষণের আরেকটি চটুল ও কার্যকর চেষ্টা। সে চেষ্টায় তামিমকে ‘জাতীয় দলে নেই বলে অন্যদের ভাব বেড়ে গেছে’, ‘অধিনায়ক থাকলে এসব করতে পারতি না’, ‘পৃথিবী গোল’, ‘সময় আমারও তো আসবে’ ও 'তুই দেখ, আমি কী করি'-র মতো ডায়ালগ দিতে দেখা গেছে। এ দ্বন্দ্ব বিপিএল সংক্রান্ত - সেটা মানুষকে বিশ্বাস করাতে এমন কিছু বলতে দেখা গেছে, যেসবকে কোনোভাবেই সেই বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মেলানো সম্ভব নয়।
সে সঙ্গে প্রশ্নও উঠেছে, কাজটা কি ঠিক হলো?
টি এম স্ক্যানলন তাঁর হোয়াট উই ঔ টু ইচ আদার বইয়ে একটি ভাবনার খোরাক জাগিয়েছিলেন। আমরা যখন কোনোকিছুকে ভুল বলি, তখন আমরা যে রায় দিচ্ছি সেটা ঠিক না ভুল, তার বিচার কে করবে?
ধরা যাক, কারও দোষ দেখে আপনি প্রকাশ্যে তার ভুল ধরিয়ে দিলেন, এটা আপনার চোখে সঠিক কাজ। কিন্তু সে কাজটা করে আপনি যখন তার মনে আঘাত দিচ্ছেন, তখন সেটা কিন্তু ওই ব্যক্তির কাছে ভুল কাজ। আবার আপনার চোখে যা দোষ, সেটা যে আসলেই দোষ, সেটা নির্ধারিত হচ্ছে কীভাবে? শুধু নৈতিকতাই কি ঠিক বা বেঠিকের উত্তর দিতে পারে?
সন্দেহ নেই, এটি খুব জটিল প্রশ্ন এবং এর উত্তর দেওয়া কঠিন। শুধু শুধু তো আর মোরাল ফিলসফির ওপর মানুষ বিরক্ত হয় না! একে অপরের প্রতি আমাদের কী দায়িত্ব - তা নিয়ে হার্ভার্ড অধ্যাপক স্ক্যানলন তাঁর সাড়ে তিন শ পৃষ্ঠার কঠিন এক বইয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। যার মর্মার্থ বলা এই লেখার উদ্দেশ্য না। তবে এটুকু বলা যায়, লেখক বলছেন, একজন মানুষ যেমন, অন্যের কাছ থেকে অন্তত সেটুকু ভালো ব্যবহার পাওয়া তাঁর প্রাপ্য।
একজন তামিম দেশের ক্রিকেটের জন্য যা করেছেন, তার দায় মেটানো সহজ না। পোর্ট অব স্পেনে ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে মারা ছক্কার স্পর্ধা, লর্ডসের সেঞ্চুরি, চার্লস কভেন্ট্রির বিশ্বরেকর্ডে চোখে চোখ রেখে দল জেতানো সেঞ্চুরি, সমালোচনার মুখে টানা চার ফিফটি কিংবা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভাঙা হাত নিয়েই নেমে পড়া - চেষ্টা না করতেই চলে আসে কত উদাহরণ। ফলে তাঁর কোন কাজটা ঠিক বা কোনটা বেঠিক - তা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকারও হয়তো আমাদের নেই। আর প্রফেসর স্ক্যানলন যেমনটা বলেছেন, কোন ভিত্তিতে একজনের কাজকে আমরা ঠিক বা বেঠিক বলছি, সেটা আগে পরিষ্কার হতে হবে। নিজের নৈতিক দর্শন পাঠে অতটা দৃঢ় আস্থা নেই বলে এই অধম সে প্রশ্নে যেতে পারছে না।
বিপিএলে একটা দল টিকে থাকল না ভাঙল - এ নিয়ে জাতির উচাটন হওয়ার কোনো মানেও হয় না। তেমনি মানে হয় না একজন ক্রিকেটার অর্থ আয়ের জন্য, ‘ঢাকার জমি’ পাওয়ার জন্য কী করবেন না করবেন - তার দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করারও। আর তামিম-মিরাজের এই নাটকে জড়িত থাকা তৃতীয় ব্যক্তি মুশফিকুর রহিম তো কদিন আগেই বলেছেন, তাঁরা (ক্রিকেটাররা) বেশ অর্থকষ্টে থাকেন, বিপিএল না খেললে তাদের জন্য সংসার চালানো কঠিন।
না, মুশফিক ওই সব ক্রিকেটারদের কথা বলেননি যাঁদের কেউ চেনে না, এই টুর্নামেন্টই যাঁদের বলার মতো আয়ের একমাত্র উপায়। বলেছেন, জাতীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের কথা, যাঁরা নাকি দুই-তিন বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেও বিপিএলের সমান টাকা পান না।
জাতীয় দলে চুক্তিবদ্ধ এমন খেলোয়াড়দের মাসিক বেতন সর্বোচ্চ ১ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা। যাঁরা আবার ম্যাচ ফি বাবদ ফরম্যাটভেদে ২ থেকে ৬ লাখ টাকা করে পেতেন গত বছর পর্যন্ত। বাংলাদেশ গত তিন বছরে অন্তত ৪৫টি ম্যাচ খেলেছে। তবু এই ক্রিকেটারদের জাতীয় দলের অর্থে সংসার চালানো কঠিন - এই তথ্যটা ভুল না সঠিক, সে তর্কে চাইলে যাওয়া যায়। কিন্তু না যাওয়াই ভালো, কারণ তামিমের মতোই মুশফিকও দেশের ক্রিকেটকে অনেক কিছু দিয়েছেন। তিনি যা বলেছেন তা মেনে নেওয়া ভালো।
আর অর্থের প্রয়োজনে কত ক্রিকেটার কত কিছুই না করেন! দেশের আইনে নিষিদ্ধ হলেও সাকিব আল হাসানকে বেটিংসংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটের পণ্যদূত হতে দেখা গেছে। তা থেকে সরে এলেও এখনো এমন এক ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনে তাঁকে দেখা যায়, যা সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ নিলেই অন্য কিছু বেরিয়ে আসবে। নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এমন অনেক ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন বাংলাদেশের খেলার সময় দেখা যায় টিভিতে।
তাই তামিম-মুশফিক-মিরাজের অর্থ আয়ের চেষ্টায় দোষ ধরার উপায় নেই। সে চেষ্টায় একটি প্রোগ্রাম - যাদের বিতর্ক সৃষ্টির খ্যাতি আছে, তাদের ব্যবহারের বুদ্ধিকেও বাহবা দিতে হয়।
তামিম বাংলাদেশ দলকে তো বলতে গেলে বিদায় বলে দিয়েছেন। তবে মিরাজ ও মুশফিক তো ভালোভাবেই আছেন। বাংলাদেশ দলে যেখানে অন্তঃকোন্দল সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে উঠেছে, বোর্ড সভাপতিকে দুদিন পর পর যেখানে এসব নিয়ে কথা বলতে হয়, সে সময় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ব্যবহার করে ‘দলে নেই তাই অন্যদের ভাব বেড়েছে’, ‘অধিনায়ক থাকলে কি পারতি’র মতো ইঙ্গিতবহ বার্তা দেওয়া ঠিক হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন হয়তো তোলা যায়। কিন্তু আগেই বলেছি, এ লেখা কোনো প্রশ্ন তোলার নয়।
এ লেখা শুধুই এটুকু স্বীকার করে নেওয়ার যে, অর্থের প্রয়োজন সবার। সেটা নগদ অর্থ হতে পারে, হতে পারে ‘ঢাকার জমি’র। রুচির প্রশ্নে না হতে পারি, টাকার প্রশ্নে আমরা আপসহীন। সেক্ষেত্রে হোয়াট উই ঔ টু ইচ আদার-এর মতো কঠিন জিজ্ঞাসার উত্তর হলো - ‘নাথিং!’
লেখক: সহকারী ক্রীড়া সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


‘ফাজলামি’—তামিমদের ফোনালাপ-নাটকে বিরক্ত বোর্ড সভাপতি নাজমুল
লিটন দাস বাদ: এক সাথে অনেক বার্তা নির্বাচকদের
