অন্ধত্বের কারণ কী? করণীয় কী হতে পারে?

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:২০ এএম

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অন্ধত্বকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। খুব সহজ ও জনবোধ্যভাবে বলা যায়, পরিষ্কার দিনের আলোয় যদি কোনো ব্যক্তি তার ভালো চোখে ৩ মিটার দূরের কোনো কিছু দেখতে বা গণনা করতে না পারে, তাহলে তাকে অন্ধ হিসেবে ধরা হয়।
 
অন্ধত্ব ও ক্ষীণদৃষ্টির সংখ্যা কমলেও অন্ধত্ব ও নানা ধরনের দৃষ্টিজনিত ত্রুটি এখনো দেশের বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিরাজমান। বাংলাদেশে এখনো ১০০ জনের মধ্যে একজন অন্ধত্বের শিকার। সাড়ে সাত লাখ মানুষ চোখে দেখে না। ১০০ জনের মধ্যে ১৯ জন কোনো না কোনো কারণে দৃষ্টি ত্রুটিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত।

অন্ধত্বের কারণ
বয়সভেদে অন্ধত্বের নানা কারণ থাকতে পারে। শিশু ও প্রাকস্কুল বয়সীদের (জন্ম থেকে ৪ বছর) অন্ধত্বের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেমন—(১) জন্মগত ছানি (২) জন্মগত গ্লুকোমা (৩) ভিটামিন এ স্বল্পতা (৪) রেটিনায় টিউমার(রেটিনোব্লাসটোমা) এবং (৫) রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি।

কম ওজন নিয়ে ও নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্মালে রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি হতে পারে। গত কয়েক বছরে এটা ২০-৫০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি বছর রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটিজনিত অন্ধত্বের শিকার হয় প্রায় ৩২ হাজার ৩০০ শিশু। নবজাতক পরিচর্যায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, মানবসম্পদ ও অক্সিজেন পরিচালনা ব্যবস্থা উন্নত করে পরিস্থিতির উন্নতিসাধন সম্ভব।

কিছু জন্মগত ও বৃদ্ধিজনিত ব্যত্যয়, আঘাতজনিত ও নিউরোলজিক্যাল কিছু কারণে স্কুল-বয়সী ছেলেমেয়েদের (৪-১৯) অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। প্যাথলজিক্যাল মাইওপিয়া, নিউরোলজিক্যাল কিছু কারণ, অকুপেশনাল ইনজুরি, ডায়াবেটিস, ইনফেকশাস কর্নিয়াল ডিজিজ যুব বয়সে (২০-৫০) অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে।

ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা বাংলাদেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মধ্যবয়সে (৫১-৭০) ছানি, গ্লুকোমা, ডায়াবেটিস ও রেটিনাল ডিজিজই অন্ধত্ব বয়ে আনছে। আর বৃদ্ধ বয়সে ছানি, গ্লুকোমা, ডায়াবেটিসের সাথে বয়সজনিত রেটিনাক্ষয় বাংলাদেশে অন্ধত্বের প্রধান কারণ।
 
অন্ধত্ব দূর ও চোখের চিকিৎসা
১. প্রাইমারি আই কেয়ার সেন্টার: বাংলাদেশে ২০০টি উপজেলায় কমিউনিটি আই কেয়ার সেন্টার স্থাপিত হয়েছে। এখানে কমন আই ডিজিজের চিকিৎসাসহ ভিটামিন ‘এ’–এর ঘাটতি পূরণ, চশমার ত্রুটি দূর করা ও ছানি রোগী বাছাই করা হয়।

২. সেকেন্ডারি আই কেয়ার সেন্টার: সরকারি সদর হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্ষেত্রের কিছু চিকিৎসা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত। এখানে ছানি, গ্লুকোমা ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসা হয়ে থাকে।

৩. টারসিয়ারি আই কেয়ার সেন্টার: সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অন্তর্ভুক্ত। মেডিকেল কলেজ বাদে বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের আরও বেশ কিছু চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। এখানে উন্নত মানের চিকিৎসা হয়ে থাকে।

চোখের চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি স্তরের সমন্বয় দরকার। বেসরকারি সংস্থাগুলো অপারেশন, রোগ প্রতিরোধ, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে অন্ধত্ব দূর ও প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের মধ্যে যথার্থ সমন্বয় নেই। এটা খুবই দরকার।

অন্ধত্ব প্রতিরোধে যত্নবান হতে হবে
ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি পূরণ কর্মসূচি, স্কুল হেলথ আই সার্ভিস এবং পেশাগত পর্যায়ে চক্ষু চিকিৎসার বিশেষ কর্মসূচিগুলোর প্রতি আরও যত্নবান হওয়া উচিত। শিশু বয়সে (৫-১৪) দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা; বিশেষ করে ট্যারা, এমব্লায়োপিয়া, জন্মগত ত্রুটি শনাক্ত ও তা দূর করার জন্য স্কুল হেলথ ক্লিনিক কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত পর্যায়ে চক্ষু চিকিৎসা সেবা উন্নত করে বহু মানুষের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব।

অন্ধত্ব প্রতিরোধে আইব্যাংক ও আই ডোনেশনকে আরও সম্প্রসারিত ও উন্নত করতে হবে। আমাদের দেশে নানা কারণে মানুষ চক্ষুদানে উৎসাহবোধ করে না। এ ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। বিভাগীয় পর্যায়ে আই ব্যাংক ও ডোনেশন কর্মসূচি অগ্রসর করে নেওয়া দরকার।

অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আমাদের এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে। বিগত বিশ বছরে অন্ধত্ব প্রতিরোধে বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। অন্ধত্বের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে এসেছে। তারপরও অন্ধত্ব প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় এখনো অনেক কিছু করার আছে।

প্রথমত, জেলা পর্যায়ে যথার্থ পরিকল্পনা দরকার। দ্বিতীয়ত, সরকারি সামর্থ্যের সঙ্গে এনজিও ও কমিউনিটি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার ধারাবাহিক উদ্যোগ থাকা দরকার। তৃতীয়ত, কর্মসূচির গতি ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত মনিটরিং থাকা দরকার। চতুর্থত, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বস্তুগত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। পঞ্চমত, সামাজিক সংহতি ও জনসচেতনতা সৃষ্টি ছাড়া এই কাজ অগ্রসর করে নেওয়া সম্ভব নয়। ষষ্ঠত, স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে অন্যান্য খাতের সমন্বয় সাধন দরকার। সপ্তমত, অন্ধত্ব প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকাজে উন্নত যন্ত্রপাতি আহরণ ও দক্ষতার সাথে তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই আমরা অন্ধত্ব প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে অর্জিত সাফল্য ধরে রেখে তাকে আরও উন্নত ও বিকশিত করতে পারি।

লেখক: চক্ষু বিশেষজ্ঞ, সিএসএস চক্ষু হাসপাতাল, খুলনা

আরও পড়ুন:

হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়ালো ১ হাজার ১৮১ জনে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য...
দেশে ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বড় একটি অংশই বাজারে নেই। ফলে প্রেসক্রিপশন হাতে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ছুটেও মিলছে না অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এসব ওষুধ। উৎপাদকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা অনেক...
দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি ক্যানসার হাসপাতালে দিন দিন বাড়ছে রোগী, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভোগান্তিও। রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপির জন্য রোগীদের অপেক্ষা করতে হয় দেড় বছর পর্যন্ত। অপারেশনের সিরিয়াল পেতে...
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি হয়েছে ২৫৬ জনের। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ জানানো হয়।
সব ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করার কথাও বলেন তিনি। ...
প্রবাসী কর্মীদের লাগেজ পরিবহনের জন্য হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৫০টি ট্রলি হস্তান্তর করা হয়েছে। সোমবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এসব ট্রলি...
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‌‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করানো হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য দায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জবাবদিহির...
এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত চলতি মাসেই আসতে পারে। বাড়তি তিন বছর সময় পেলে প্রস্তুতি জোরদারের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী...
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর