সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ যুগে ভুয়া খবর, গুজব ইত্যাদি ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও কখনো কখনো ভুয়া খবর প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের সংবাদমাধ্যমে রাজনীতি সম্পর্কিত ভুয়া খবর প্রকাশের পরিমাণ কমেছে। তবে বেড়েছে খেলা ও ধর্ম সম্পর্কিত ভুয়া খবরের পরিমাণ।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডিসমিসল্যাব এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি–মার্চ) হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, গত বছরের শেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর–ডিসেম্বর) তুলনায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে রাজনীতি সম্পর্কিত ভুয়া খবরের পরিমাণ কমেছে। তবে এই একই সময়ে বেড়েছে খেলা ও ধর্ম সম্পর্কিত ভুয়া খবরের প্রকাশ।
বাংলাদেশের আটটি ফ্যাকচেকিং প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই রাজনীতি সম্পর্কিত ভুয়া খবরের পরিমাণ কমতে থাকে। দেশের আটটি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ১ হাজার ২৮টি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনুরূপ বিষয়ে হওয়া ভুয়া তথ্যকে বাদ দিয়ে ৬৫৬টি ভুয়া খবরের বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া হয়। এই সংখ্যা ছিল আগের বছরের শেষ প্রান্তিকের চেয়ে কম।
এতে দেখা যায়, ভুয়া খবর বা তথ্যের প্রতি চারটির একটি হচ্ছে রাজনীতি সম্পর্কিত। সে হিসাবে রাজনৈতিক ভুয়া খবরের হার দাঁড়ায় ২৫ শতাংশ, যা আগের বছরের শেষ প্রান্তিকে ছিল ৪৫ শতাংশ। এই হারের অবনমনের কারণে সামনে চলে এসেছে খেলা ও ধর্ম সম্পর্কিত ভুয়া খবর বা তথ্য। এ দুই ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্যের হার ছিল যথাক্রমে ১৭ ও ৯ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে বেশি।
ডিসমিসল্যাব বলছে, দেশে চলা ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ বিপিএল এবং ভারতের আইপিএল সম্পর্কিত অনেক ভুয়া তথ্য এই সময়ে ছড়িয়েছে। আর ভারতের অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের প্রেক্ষাপটেও প্রচুর ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভিডিও সবচেয়ে এগিয়ে। এরপরই আছে ছবি। রাজনীতি সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য কমার কারণে কমেছে ভুয়া গ্রাফিকস কার্ডের সংখ্যা, যা মূলত রাজনৈতিক মিথ্যা, বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে আশার কথা হচ্ছে আগের প্রান্তিকের তুলনায় সর্বশেষ প্রান্তিকে সংবাদমাধ্যমে ভুয়া তথ্য প্রকাশ কমেছে। ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন অনুসারে এই হ্রাসের হার ৫ শতাংশ। সর্বশেষ প্রান্তিকে রাজনীতি ছাড়াও আরও কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্য প্রকাশের হার কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্যোগ সম্পর্কিত তথ্য। ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে এ সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য যে হারে ছড়িয়েছে, তা চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কমেছে। বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে দুর্যোগ সম্পর্কিত ভুয়া ছবি ছড়িয়ে পড়ার হার এ বছরের প্রথম প্রান্তকে আগের প্রান্তিকের চেয়ে কম ছিল।
ভুয়া তথ্যের দুনিয়ায় নির্বাচনের প্রভাব
ভুয়া তথ্যের দুনিয়ায় বড় প্রভাব রয়েছে নির্বাচনের। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে রাজনীতি সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য বেশি ছড়ানোর পেছনে কারণ হিসেবে নির্বাচনের কথাই উল্লেখ করেছে ডিসমিসল্যাব। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের তিন মাসে তাই ব্যাপকভাবে এ সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য ছড়ায়। নির্বাচনের পর এই হার কমে আসে।
এটা আরও পরিষ্কার হয় আরেকটি তথ্যের দিকে তাকালে। ডিসমিসল্যাব বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজনৈতিক ভুয়া তথ্যগুলোর মধ্যে দুই–তৃতীয়াংশই ছিল জানুয়ারিতে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, জানুয়ারিই ছিল ভোটের মাস। ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের তথ্য প্রকাশের হার কমে আসে। আর মার্চে তা কমে বিগত ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আসে।
খেলা সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য
খেলা সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি টুর্নামেন্টের ওপর নির্ভর করছে বলেই মনে হচ্ছে। ডিসমিসল্যাবের তথ্যমতে, জানুয়ারিতে যেখানে খেলা সম্পর্কিত ১৭টি ভুয়া তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, সেখানে মার্চে এসে তা ৬২–তে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ, এই সময়ে এই অঞ্চলের বড় দুটি টুর্নামেন্ট চলেছে।
খেলা সম্পর্কিত ভুয়া তথ্যের মধ্যে একটি বড় অংশই বাংলাদেশ ও ভারতের দুটি টি–টোয়েন্টি লিগ সম্পর্কিত। এর মধ্যে দলবদল বা দল গঠনের পর্যায়েই একগাদা ভুয়া তথ্য হাজির হয়েছে। এর মধ্যে উদাহরণ হিসেবে বিরাট কোহলির মতো খেলোয়াড়ের বিপিএলে খেলার খবরের কথা উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া গ্যাম্বলিং অ্যাপের সাথে জড়িত বলে বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটারদের ভুয়া ছবি ছাড়ানোর কথা বলা যায়।
ধর্ম সম্পর্কিত ভুয়া খবর
ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ও রাম মন্দির নিয়ে চলা বিতর্কের কারণে ধর্ম সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি রাম মন্দিরের উদ্বোধন করা হয়। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে মুখ্যত সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে নানা ধরনের তথ্য, ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছাড়ায়। রাম মন্দিরের ছবি হিসেবে অন্য মন্দির বা স্থাপনার ছবি প্রকাশ করে। একই ঘটনা ঘটে বাবরি মসজিদের ছবি নিয়েও।
এমনকি এমন তথ্যও প্রকাশ করা হয়, যেখানে দাবি করা হয়—ব্রিটিশ ধনকুবের আসিফ আজিজ কিংবা পর্তুগালের তারকা ফুটবলার ক্রিষ্টিয়ানো রোনালদো ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর বাবরি মসজিদ বানাতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। এ ছাড়া রোজা ও ইফতার সম্পর্কিত ভুয়া তথ্যও ছড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ক্যাম্পাসে দলবদ্ধভাবে ইফতার করা নিষিদ্ধ করেছে।



