নারীরা কেন প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়?

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৪, ১২:২৭ পিএম

নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ অনেক। বিশেষ করে আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশে এই বঞ্চনার মূল কারণ হলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহ। আমাদের সমাজে এমন আবহ বিরাজ করে যে, আমরা ধরে নিতে চাই নারীদের আবার সম্পত্তির কী প্রয়োজন? মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীকে এখনো অবলা, পরাধীন, পরাশ্রিত, পরনির্ভরশীল, অধিকার বিষয়ে অসচেতন এবং দাবীহীন হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে সম্পত্তির মালিক হবে, সম্পত্তির বিষয়ে স্বাধীন মতামত দেবে, সেটা মেনে নেওয়ার মতো সংস্কৃতি ও মন-মানসিকতা এখনো আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, সম্পত্তি বিষয়ে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনগুলোর বিশাল রকমের তারতম্য। নিজে উপার্জন ছাড়াও সম্পত্তির মালিক হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে উত্তরাধিকার। আর এ উত্তরাধিকার বিষয়ে আমাদের দেশে সার্বজনীন কোনো আইন নেই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সম্পত্তির বিষয়টি বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনে আলাদা আলাদাভাবে বর্ণিত আছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা বলা আছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রয়োগ নেই। যেমন- প্রচলিত মূল চারটি ধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন স্ত্রী, কন্যা, মাতা, ভগ্নি তথা সম্পর্কের ভিন্নতার হিসেবে আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে নারীদের উত্তরাধিকার সুস্পষ্টভাবেই নির্ধারণ করে।

কিন্তু বাস্তবে এ অধিকার ধর্মীয় রীতি অনুসারে নারীদের বুঝিয়ে দেওয়ার মানসিকতা এ দেশের খুব কম পুরুষের মধ্যেই দেখা  যায়। যদিও তারা নিজেদের ধার্মিক বলে বলে প্রচার করতে পছন্দ করেন। কিন্তু সম্পত্তিতে নারীর অধিকার বিষয়ে তাদের অবস্থান সুস্পষ্টভাবেই স্বার্থপরতার শামিল এবং ব্যক্তিগত শরিয়া আইনের পরিপন্থী। অন্যান্য প্রচলিত ব্যক্তিগত আইনগুলোতে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার খুব সীমিত বা ক্ষেত্রবিশেষে নেই বললেই চলে। যেমন, হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে সম্পত্তিতে নারীদের উত্তরাধিকার স্বীকার করা হয় না। এভাবে যুগ যুগ ধরে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন বাংলাদেশের নারীরা।

১৯৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতিতে ভূমির অধিকারে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও, পরে তা স্পষ্টাক্ষরে সংযুক্ত হয়নি। এর মধ্যে সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের বিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়। তবে এর ছিটেফোঁটাও আবার দেখা যায় না শরিয়া অনুসারে নারীকে তার প্রাপ্য সম্পদ বুঝিয়ে না দেওয়ার ব্যাপারে। এই দ্বিচারিতা শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীব প্রায় সর্বক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়।

পিতা-মাতা জীবিত থাকাকালে সন্তানদের মধ্যে বণ্টননামা দলিল করে প্রাপ্য সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করে দেওয়ার রীতিও আমাদের দেশে নেই। আর এতে করে পিতা-মাতার মৃত্যুর পর বণ্টন মামলা নিয়ে অযথা কালক্ষেপণ করতে হয় পরবর্তী প্রজন্মের।

শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অসহযোগিতা, সম্পত্তিতে নিজের প্রাপ্য অধিকার বিষয়ে অজ্ঞানতা, অধিকার আদায়ে আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতা, সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার ও প্রথা এবং সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই নারীর প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রধান কারণ। গ্রামাঞ্চলে এখনো এমন কুসংস্কার প্রচলিত আছে যে, বাবার সম্পত্তি ভাইদের থেকে বুঝে নিলে নাকি বোনদের সংসারে অকল্যাণ হয়।

অনেক সময় ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়েও বোনেরা তাদের পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আর আমাদের দেশের বেশির ভাগ ভাই বোনদের এ আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট। ধর্ম, বর্ণ, প্রথা, রীতিনীতি যাই হোক, আমাদের বাবা, ভাই, পুত্র, স্বামী সম্পর্কীয় পুরুষেরা যদি তাদের সঙ্গে যুক্ত নারীদের সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে আন্তরিক হতেন, তাহলে নারীদের এই বঞ্চনার শিকার হতে হতো না। কিন্তু বাস্তবে, এমন মনোভাবের পুরুষ আমাদের দেশে যেন বিরল। যাঁরা আছেন তাঁদের কণ্ঠস্বর বঞ্চনাকারীদের গলাবাজির কাছে ম্লান।

কাজেই সম্পত্তিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীকেই সর্বাগ্রে সোচ্চার হতে হবে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী বর্তমানে যৎকিঞ্চিত যা-ই প্রাপ্য, সম্পর্ক রক্ষার অজুহাতে তাতে ছাড় দেওয়ার মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। যে যে আইনের যেখানে যেখানে পরিবর্তন প্রয়োজন, সে বিষয়ে সরকারের সুনজর দাবি করতে হবে। শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে, রাজনীতিতে, রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে পুরুষের সাথে সমানতালে অংশগ্রহণ করে সম্পত্তিসহ সকল অধিকার বিষয়ে নারীকেই সোচ্চার হতে হবে।

সম্পত্তি পুরুষের একক কোনো অর্জনের বিষয় না। চিরদিন নারীর শ্রম ও ঘামও জড়িত ছিল প্রতিটি সভ্যতায়, জনপদে ও সমাজব্যবস্থায়। তাই নারীকে সম্পত্তি থেকে দূরে রাখার চিন্তা যেমন ন্যায্য নয়, তেমনি স্বেচ্ছায় দূরে থাকাটাও নারীর কোনো মাহাত্ম্যের প্রকাশ নয়। এ সত্যিটা নারী-পুরুষ উভয়কেই অনুধাবন করতে হবে। তবেই এ পৃথিবীতে সূচিত হবে সাম্যের প্রাথমিক সোপান।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর