দুই যানেরই ব্যাটারি আছে। একটায় ব্যাটারিই যানের মূল চালিকাশক্তি। অন্যটায় ব্যাটারির পাশাপাশি পেট্রোল, অকটেন বা ডিজেলও লাগে। হ্যাঁ, এটি পেট্রোল-ডিজেল ছাড়াও চলতে পারে বটে। তবে সেটিকে রাস্তায় নামানোর চল এখনও এ দেশে হয়নি সেভাবে। তেমন প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধাও দেশে নেই। এখন এই দুই যানের মধ্যে লেগেছে টক্কর। রাস্তায় হরহামেশা দেখা সেই বাহাসই এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে আলোচিত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, ব্যাটারি রিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়ি–কোনটি বেশি অপকারী?
এই বাহাস বেশ পুরোনো। অন্তত ঢাকা শহরে ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যেতে পারে, সেই শুরুর দিন থেকেই রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যকার রেষারেষি দৃশ্যমান। গাড়ির মালিকেরা বলে থাকেন, রিকশাই যানজটের মূল। অন্যদিকে রিকশার পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য, ব্যক্তিগত গাড়ি বড়লোকদের সম্পত্তি বলেই এর দিকে কেউ আঙুল তোলে না। যেহেতু রিকশা তুলনামূলক স্বল্প আয়ের মানুষদের ব্যবহার্য যান, তাই যত দোষ ‘গরিব’ ঘোষ-এর!
চলমান এমন বাহাসের মধ্যেই নতুন মাত্রা নিয়ে আসে ব্যাটারি। সাধারণত রিকশা বললেই পায়ে টানা তিন চাকার একটি অতি পরিচিত যানের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে নানা বিকল্প তো বের হয়ই। তেমনি পায়ে টানার বদলে আদরণীয় হয় ব্যাটারি থেকে পাওয়া শক্তিতে চাকা ঘোরানোর উপায়। শারীরিক শ্রম কম হওয়া অবশ্যই একটি প্রধান কার্যকারণ। ব্যাটারির শক্তিতে চলা সেইসব চাকা স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত ঘোরে। কতটা দ্রুত, তা এ শহরের মায় এ দেশের বেশির ভাগ মানুষই জানেন ও বোঝেন। এ নিয়ে রাস্তায় নানা হুজ্জতও হয়। তার চেয়েও বড় কথা, এটিকে রাস্তায় চলার লাইসেন্স সরকার দেয় না। ফলে এটি অবৈধ এবং এ নিয়ে আইন-আদালতও এ যাবৎকালে কম হয়নি। সর্বশেষ গত ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় তিন দিনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি মাহমুদুর রাজীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে রুলও জারি করেছেন আদালত।
সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবৈধ। এর আগে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন দফায় অটোরিকশা বন্ধে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া অটোরিকশার আমদানি বন্ধেরও নির্দেশ দেন আদালত। এই আদেশ বহাল রেখে আপিল বিভাগও পরে দেশের সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এবার এই নিয়ে হুলুস্থুল শুরু হয়ে গেছে। সমস্যা জিইয়ে রাখতে রাখতে যা হয় আর-কি। অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানী ঢাকায় নেমেছে ব্যাপকহারে, অলিগলিতে চলেছে অনেক। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও সরকার তাতে সঠিকভাবে নজরদারি না করায় এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায়, এর চলাচল বেড়েছেই। এতে করে ব্যাটারির রিকশা চালিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। এখন আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর রাস্তায় প্রতিবাদস্বরূপ নেমেছে এই পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষেরা। ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক আটকে বিক্ষোভ করছেন চালকেরা। গত দুদিন ধরেই এমন চলছে। এতে রাজধানীর সড়কগুলো প্রায় স্থবির হয়ে যাওয়ায় যানজট চরম আকার নিচ্ছে। আর যেকোনো ধরনের অবরোধ বা প্রতিবাদেই ঢাকাবাসীর যা হয়, সেই সীমাহীন দুর্ভোগের ‘চরম আকার’–এর নতুন নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হচ্ছে।

কথা হলো, ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের এই নির্দেশনা কিন্তু উচ্চ আদালত প্রথমবারের মতো দেননি। আগেও দিয়েছেন। কিন্তু তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা বাস্তবায়নের সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে একটি সমস্যা জিইয়ে রেখে বিশাল করে ফেলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই পেশায় থাকা মানুষেরা পেটের দায়েই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করে অন্তত এর বিরুদ্ধে শেষ চেষ্টাটা করবেন। মনে রাখতে হবে, পেটের দায়ের চেয়ে বড় তাড়না এই পৃথিবীতে নেই। খিদে মেটাতে মানুষ অনেক কিছুই করে। আবার চালকদের পাশাপাশি এই খাতে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিরাও আছেন। একটি সরকারযন্ত্রের পুরোপুরি অজান্তে নিশ্চয়ই এই ব্যাটারি আমদানি হয়নি, সেই ব্যাটারি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিকশায় লেগেও যায়নি। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে সরকার পক্ষের একটি অবহেলা ছিলই এবং এই সমস্যা তৈরির পেছনে তা বড় ভূমিকা রেখেছে।
আবার ব্যাটারিচালিত রিকশাকে চলতে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রেও খুব বেশি সরকারি তোড়জোড় কখনও দেখা যায়নি। ফলে কখনও পায়ে চালানো রিকশায় অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাটারি লাগিয়ে ফেলা হয়েছে, আবার কখনও চীনদেশ থেকে ইচ্ছামাফিক মডেল আমদানি করে তা রাস্তায় চলতে দেওয়া হয়েছে। কোনোটার চাকা প্রচলিত রিকশার মতোই, আবার কোনোটার সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো। অর্থাৎ, একেকটার গতি ও চলার ধরনও একেকরকম। কোনোটা পায়ে টানা রিকশার তুলনায় একটু দ্রুত চলে, তো কোনোটা পেট্রোল‑ডিজেলে চলা গাড়ির গতির সঙ্গে রেসে নামে। আর এভাবেই নানামাত্রিক দুর্ঘটনায় জড়িয়ে যায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নাম। অর্থক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনক্ষয়ও হয়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, সড়কে দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনা। সরকার নিবন্ধন দেয় না বলে এগুলোকে অবৈধ যানবাহন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় তিন চাকার যানবাহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, অটোভ্যান ইত্যাদির দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৯৭ জন মারা গেছে, যা মোট নিহত মানুষের ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
এদিকে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য অবৈধ তিন চাকার যানবাহনের প্রকৃত হিসাব সরকারের কোনো দপ্তরেই নেই। বিআরটিএ, যাত্রী অধিকার সংগঠন, পুলিশ ও অন্যান্য অংশীজনের হিসাবে, ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত তিন চাকার অবৈধ যানবাহন এখন ৬০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে আছে প্রায় ৫০ লাখ। আর ঢাকায় আছে ১০ লাখের মতো। কেউ কেউ মনে করেন, ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত রিকশার সংখ্যা ১৫ লাখের কম হবে না।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, এই ব্যাটারিচালিত যান দিয়ে পুরো দেশেই একটি বিশাল সমস্যা সৃষ্টি করে ফেলা হয়েছে। এটি যেমন আর্থ-সামাজিক, তেমনি মানবিকও। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, যেখানে কর্মসংস্থানের অভাব বেশ প্রকট, সেখানে এমন সংকট নানা ধরনের অভিঘাত নিয়ে হাজির হয়। তবে এই সংকটের মূল একটাই, তা হলো সঠিক নিয়ম-নীতি প্রবর্তন না করা এবং উপযুক্ত সময়ে ন্যায্য পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশের চালনাকারী হিসেবে সরকারের ঘাড়েই এই নিষ্ক্রিয়তার দায় চাপে, তা যে সময়ের সরকারই হোক না কেন।
দুঃখের বিষয় হলো, সড়কে শৃঙ্খলাসংশ্লিষ্ট এসব আলোচনা বছরের পর বছর ধরেই চলছে। এর, ওর ঘাড়ে দোষ চাপানো চলছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান কিছু হচ্ছে না। এই যেমন, গত মঙ্গলবারই রাজধানীতে ন্যায়ভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞদের মতামত–রিকশা নয়, রাজধানীতে অস্বাভাবিক যানজটের মূল কারণ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যক্তিগত গাড়ি। রিকশাচালকদের ওপর আইন প্রয়োগ করা হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত গাড়ি পার পেয়ে যাচ্ছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে গণপরিবহনের মানোন্নয়ন করার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গণপরিবহনের মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্যের কারণে সৃষ্ট সমস্যা কতটা ভয়াবহ, তা নিয়ে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত বিরতিতে আলোচনা হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু এ যেন এমন এক সমস্যা, যা নিয়ে শুধু আলাপ-আলোচনাই সার। কোনো উন্নতি আর চোখে পড়ে না। সরকারি উদ্যোগ প্রায়ই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় না। আর এসবের ফলে জনমানুষের দুর্ভোগ চলতেই থাকে। তার যেন কোনো অন্ত নেই।
সুবিধা-অসুবিধা আসলে সবকিছুরই থাকে। যেমনটা ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়িরও আছে। কেউই বলতে পারবে না যে, যেকোনো একটি শ্রেষ্ঠ বিকল্প! মোদ্দা কথা, সঠিক নিয়ম থাকলে এবং শৃঙ্খলা মেনে চালাতে পারলে যেকোনো যানই মানুষের উপকারেই আসবে। সঠিক নিয়ম ও শৃঙ্খলা ঠিক করে দেওয়ার ও তা মানতে বাধ্য করার কথা সরকারি প্রশাসনের। মূল গলদ আদতে সেখানেই। ফলে কোনো সংকট থেকেই আর গণের মুক্তি মেলে না। গণমানুষ যেন কেবলই দুর্ভোগ ভোগ করে যাওয়ার কপাল নিয়েই জন্মেছে!
তাই এমন সংকটের সঠিক ও কার্যকর সমাধান খুঁজতে হলে আগে সরকারি প্রশাসনকে ঠিক পথে আনা জরুরি। সেটি না করে এর-ওর ওপরে দায় চাপানো অর্থহীন। পরিতাপের বিষয় হলো, এখনও আমরা ওই দুষ্টচক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি। ঘুরতে ঘুরতে মাথা ঘুরে একেবারে পড়ে না যাওয়া পর্যন্ত হয়তো মোদের রক্ষে নেই!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


চার ঘণ্টারও বেশি অবরুদ্ধ মহাখালী, ভোগান্তি চরমে
ব্যাটারিচালিত রিকশার যন্ত্রাংশ আমদানিতে কড়াকড়ির তাগিদ
