জিএম কৃষিপণ্য যে ফাঁদে ফেলছে মানুষকে

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৫, ১০:০০ এএম

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সংক্ষেপে ইউএসএফডিএ সম্পর্কে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও সে দেশের মানুষের যাবতীয় খাদ্য, ওষুধ ও শরীর-স্বাস্থ্যবিষয়ক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা রক্ষার্থে দেশে উৎপাদিত কিংবা আমদানিকৃত সকল খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পণ্য-যন্ত্রপাতি, প্রসাধনী, নব উদ্ভাবিত কৃষিজাত খাদ্যপণ্য-ওষুধ ইত্যাদির যথোপযুক্ত মান নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বব্যাপী সুনাম রয়েছে। এই এফডিএ বিশ্বব্যাপী সংশ্লিষ্ট সকল মহলের কাছে বহুল প্রত্যাশিত জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) কৃষিপণ্য সম্পর্কিত গাইডলাইন ২০২৪ প্রকাশ করেছে গত বছরের শেষের দিকে, যা সে দেশের জিএম কৃষিপণ্য শিল্পের জন্য প্রযোজ্য। কিন্ত বিশ্বের বহু দেশ এফডিএ-এর সিদ্ধান্তের অনুগামী হয়। যেমন কানাডাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হুবহু এফডিএ গাইডলাইন বা নীতিমালা অনুসরণ করে থাকে। কাজেই বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কৃষি খাদ্যপণ্য সংশ্লিষ্ট কর্মী, বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এফডিএ গাইডলাইন খুবই দরকারি বিষয়।

শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (জিন প্রকৌশল বিদ্যা) ও অ্যাটমিক জেনেটিকস (আণবিক কৌলিতত্ত্ব) শাখার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের চিরায়ত কৃষিজাত ও উদ্ভিজ্জাত খাদ্যপণ্য বিষয়ে চিরপরিচিত ধারণার প্রতিনিয়ত বদল ঘটছে। চিরায়ত (ক্লাসিক্যাল) কৌলিতত্ত্ব বিজ্ঞানের জনক গ্রেগর জন মেন্ডেলের ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত আট বছরব্যাপী পরিচালিত বিখ্যাত মটরডাল গাছ নিয়ে করা গবেষণার কথা সকলেই অল্পবিস্তর জানেন। তাঁর আবিষ্কারের সূত্রে পৃথিবীজুড়ে এ পর্যন্ত বিভিন্ন কৃষি ও উদ্ভিদের হাইব্রিডিং বা শঙ্করায়ণের ফলে যে নানা রকম উচ্চফলন ও উচ্চ পুষ্টিমূল্যসম্পন্ন জাত পাওয়া গেছে। এখনো সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে বলেই বিশ্ব প্রায় প্রতিনিয়ত নানা রকম উন্নত জাত আবিষ্কারের ঘোষণা শুনতে অভ্যস্ত।

এই সমস্ত উচ্চ ফলনশীল শস্য বা গাছের কল্যাণেই ধরিত্রী তার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপুল খাদ্য চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু কৌলিতত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখানেই থেমে থাকতে চাইছেন না! খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, ওষুধ, জীবনমান, ইত্যাদির উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে। তাঁরা এই ক্রমবর্ধনশীল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন। এ কারণে তাঁরা বিজ্ঞানী মেন্ডেলের চিরায়ত কৌলিতত্ত্ব (ক্লাসিক্যাল জেনেটিকস) থেকে আণবিক কৌলিতত্ত্বে (অ্যাটমিক জেনেটিকস) এগিয়ে গেছেন। যেখানে তাঁরা শুধু শঙ্করায়ণের মাধ্যমে নয়, জীবের বংশগতি নিয়ন্ত্রণকারী ক্রোমোজোমের আনবিক বা গাঠনিক স্তরে পৌঁছে বংশানু কণিকা বা জিন কণিকা পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুনতর উদ্ভিদ বা জীব বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিতে সক্ষম হচ্ছেন। বস্তুত জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিজ্ঞানীদের কাজকে এক লাফে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই বিজ্ঞানের মাধ্যমে পরিবেশের চেনাশোনা উদ্ভিদ বা প্রাণির শরীরে ইচ্ছেমতো অভীষ্ট বা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বা নতুনতর বৈশিষ্ট্য যোগ করে বিশ্ববাসীকে চমৎকৃত করছেন।

জিএম সয়াবিন। ছবি: ফ্রিপিকযা হোক, এই বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রাপ্ত কৃষি বা জীব পণ্যকে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) কৃষিপণ্য হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। আর এই বিষয়টিই বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের মাঝে ভবিষ্যৎ মানবজাতির জন্য আশার সঞ্চার করেছে। আবার একই সাথে আশঙ্কার বাতাবরণও সৃষ্টি করেছে এটি। এই আশা-আশঙ্কার বিষয়টিই এই আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৌলিতাত্ত্বিক প্রকৌশল বিদ্যা, যা আবার বায়োটেকনোলজি নামে পরিচিত, এর মাধ্যমে উদ্ভাবিত ভবিষ্যতের কৃষি/জীব ও উদ্ভিজ্জাত খাদ্যপণ্য নিয়ে সরকারিভাবে এফডিএ কী দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে, বিগত কয়েক বছর ধরে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসমূহ, বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মহলের সেদিকে সজাগ দৃষ্টি ছিল। অবশেষে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এ বিষয়ে তাদের অবস্থান জানিয়ে দীর্ঘ গাইডলাইন বা খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করেছে। সেই সুপারিশমালা দেখার আগে বরং জেনে নিই যে, কেন বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের এত কৌতূহল ও অপেক্ষা ছিল এবং এর মধ্যে বিতর্কিত বিষয়গুলোই‑বা কী!

জেনেটিক প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট তর্ক-বিতর্ক
প্রথমেই দেখা নেওয়া যাক, জেনেটিক প্রকৌশল বিদ্যা আদতে কী। এই প্রক্রিয়া নিষ্পন্ন করতে রিকমবিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এই প্রযুক্তিতে যেকোনো উদ্ভিদ বা প্রাণিজ উৎস, এমনকি এই উৎস ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুও হতে পারে, থেকে কোনো একটি অভীষ্ট বা নির্বাচিত বৈশিষ্ট্যবাহী একটি একক জিন বা জিন অনুগুচ্ছ নিয়ে সরাসরি টার্গেট উদ্ভিদ, কৃষি, জীবাণু, বা প্রাণীর জিনোমে সংস্থাপন বা প্রতিস্থাপন করা হয়, যেন টার্গেট জীবে সেই নির্বাচিত বৈশিষ্টের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এটি বারবার করার মাধ্যমে টার্গেট জীবে সেটি কীভাবে বা কতটা প্রকাশ পায়, তা নির্ধারণ করা হয়। তাহলে পুরোনো উদ্ভিদ শঙ্করায়ণের সাথে এই প্রক্রিয়ার পার্থক্য কী? এতে একেবারে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উদ্ভিদ জাত বা নতুন বৈশিষ্ট্য আরোপিত উদ্ভিদের উৎপত্তি হয়। এটি সহজতর ও কম সময়ে করা সম্ভব। তারপর দূর সম্পর্কিত উদ্ভিদ, প্রাণী, জীব বা জীবাণুর, যাদের মধ্যে শঙ্করায়ণ সম্ভব নয় (যেমন ভিন্ন ক্রোমোজোম সংখ্যা বা উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে), সেরকম উদ্ভিদ বা জীবের বৈশিষ্ট্য  (যেমন ধরা যাক, জৈব আলো) অন্য উদ্ভিদে বা জীবের বংশানু কণিকায় প্রতিস্থাপন বা সংস্থাপন করা যায়। এই কাজে টার্গেট গাছে বা জীবে একটি একক জিন অনু, এক জোড়া জিন, একগুচ্ছ জিন, বা একটি সম্পূর্ণ ক্রোমোজোমের সংস্থাপন বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। যার ওপর বিজ্ঞানীদের নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং স্বল্পতম সময়ে নতুন বংশবিস্তারের মাধ্যমে ক্রোমোজোমে প্রকৌশল প্রযুক্তির প্রয়োগ-ফলাফল প্রত্যক্ষ করতে পারে।

সকলেই জানেন যে, নির্বাচিত উদ্ভিদের শঙ্করায়ণ কৃষিক্ষেত্রে একটি সুপ্রাচীন চর্চা। জেনেটিক প্রকৌশল ব্যবহারের প্রাথমিক পর্যায়ে এটিকে বৈশ্বিক ক্ষুধার বিরুদ্ধে অন্যতম একটি হাতিয়ার হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু কালক্রমে জেনেটিক প্রকৌশলের মাধ্যমে যে সমস্ত নতুনতর বৈশিষ্ট্যাবলী যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, তার মধ্যে মূলত সামষ্টিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকারে রেখে অধিক পরিমাণে ফলন, আকারে বড় হওয়া, স্বাদে-গন্ধে-বর্ণে নতুনত্ত্ব আনা, পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি, কম জলে ও শুষ্ক জলবায়ু সহনশীলতা, পোকা-মাকড়-আগাছা-বালাইনাশক ক্ষমতা, ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোই প্রধান্য পেতে থাকে। 

জিএম ভুট্টা। ছবি: ফ্রিপিকঅনেক বিজ্ঞানী গোপনে এর বাইরেও অনেকরকম বৈচিত্র্যময় বিষয়ে গবেষণা করে থাকেন বা করেছেন বলে জানা গেছে। যেমন সুপার হিউম্যান বা অতিমানব সৃষ্টি, ফুল বা তরকারি-সবজি বা অন্য উদ্ভিদ শরীরে জৈবউজ্জ্বলতা দানকারী জোনাকি পোকা, মাছ বা মাশরুম থেকে নেওয়া জৈব আলো বা উজ্জ্বলতা সৃষ্টি, ধানের জিনে সুনির্দিষ্ট কোনো ভিটামিন বা প্রাণিজ আমিষের অনু সংস্থাপন, ইত্যাদি অনেক বৈচিত্র্যময় বিষয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন। এখন প্রশ্ন হলো, লক্ষ কোটি বছরের ধীর বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিতে সৃষ্ট প্রাণী বা উদ্ভিদ শরীরে  বৈজ্ঞানিক পন্থায় এভাবে যে অতিদ্রুত বদল আনা হলো, তা কি সামগ্রিক মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশগতভাবে সহনশীল? জিন প্রকৌশল নিয়ে যে বিতর্ক, তা ঠিক এই প্রশ্নগুলো থেকেই শুরু। এই প্রক্রিয়া নিয়ে মৌলিক বিতর্কের বিষয়গুলোতে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

যে পরিবর্তিত বা নতুন বৈশিষ্ট্য আরোপ করে উদ্ভিদ, জীবাণু বা প্রাণী সৃষ্টি করা হলো, সেই জীব পরিবেশগতভাবে ও খাদ্য হিসেবে গ্রহণের পর মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ভালো না মন্দ–কী ধরনের ফলাফল নিয়ে আসছে। কারণ, পুরো বিষয়টি আণবিক স্তরে মানুষের অগোচরে ঘটে থাকে। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে বসে অতি উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্যে জীবের আণবিক স্তরে ঢুকে তাদের বংশানু বা জিন কণিকা কেটে দিয়ে বা বদলে দিয়ে থাকেন। অতঃপর নতুনতর সেই জীবের শরীরের অভ্যন্তরে অভীষ্ট ফলাফলটা নিয়েই তাঁরা খুশী! কিন্তু অভীষ্ট ফলাফলের বাইরে সেই জীবের শরীরাভ্যন্তরে ঠিক কী ঘটছে বা কাঙ্ক্ষিত বিষয়‑বহির্ভূত নতুনতর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতিকর জৈবযৌগ তৈরি হচ্ছে কি না, সে পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল, ইত্যাদি নিয়েই আরেক পক্ষ বিতর্ক উপস্থাপন করছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের একটি উদাহরণ হিসেবে কোভিড জীবাণুর নাম উল্লেখ করা যায়। জিএমও জীবের স্বপক্ষে সাদা চোখে অসংখ্য যুক্তি প্রদর্শন সম্ভব, যার মধ্যে বৈশ্বিক ক্ষুধা ও দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য। আবার প্রাকৃতিক উদ্ভিদের চেয়ে এগুলো ১৫-২০ শতাংশ বৃহদাকার হতে পারে। এতে উদ্ভিদ অধিক পরিমাণে সালোক সংশ্লেষণ সম্পন্ন করে, যা ভালো বলে মনে করা যায়। কিন্তু সেগুলো একই সময়ে অধিকতর জল, সার ও খনিজ ব্যবহার করে, যা প্রকারান্তরে মানুষকে রাসায়নিক দূষণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখন সংক্ষেপে দেখে নিই জিএমও জীবের বিপক্ষে কী কী অভিযোগ আছে–

১। অণুজীব যেমন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থেকে বংশগতি কণিকা নিলে তা থেকে নিঃশব্দে মানুষ, গবাদিপশু কিংবা প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলে ক্রমিকভাবে ও দীর্ঘমেয়াদে অ্যালার্জি কিংবা রোগ-ব্যাধি স্থানান্তর পারে। টার্গেট উদ্ভিদেও নিত্যনতুন রোগের সৃষ্টি হতে পারে।

২। কোনো প্রতিষ্ঠান বা জাতি অসৎ উদ্দেশ্যে দূষণ বা জৈব অস্ত্র হিসেবে এগুলো ব্যবহার করতে পারে।

৩। খাদ্যের চিরাচরিত বা প্রচলিত চেনা আকার-আকৃতি ও স্বাদের বদলে অপরিচিত অনাকাঙ্ক্ষিত উদ্ভট আকার-আকৃতি বা স্বাদের সৃষ্টি হয়।

৪। বিষজাতীয় ও এলার্জেন অণুর পাশাপাশি এতে স্বল্প পরিমাণে পুষ্টিমান থাকে কিংবা একেবারেই পুষ্টিহীন হতে পারে। এমনকি টাটকা অবস্থায় পুষ্টির উপস্থিতি দেখা গেলেও স্বল্প সময়ের মধ্যে তা থেকে পুষ্টিগুণ হারিয়ে যেতে দেখা যায়।

৫। বিষাক্ত বা এলার্জেন কিংবা পুষ্টি‑সংক্রান্ত উদ্বেগের চেয়ে পরিবেশগত বিপদ-আপদ অধিকতর উদ্বেগের কারণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

জিএম টমেটো। ছবি: সংগৃহীত৬। ব্যাকটেরিয়ার যেমন অ্যান্টিবায়োটিক সহনক্ষমতা সৃষ্টি হচ্ছে তেমনি জিএমও জীবেরও বিষক্রিয়া সহনক্ষমতা সৃষ্টি হতে পারে, যা প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

৭। প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলে ঋণাত্মক বা ধ্বংসাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। প্রকৃতিতে পোকামাকড়, আগাছা, বা উদ্ভিদের রোগ-ব্যাধির জন্য খুবই সংকটজনক বলে বিবেচনা করা হয়। এমনকি নুতনতর উদ্ভিদে রোগ-ব্যাধির উদ্ভব ঘটতে পারে।

৮। বিভিন্ন পতঙ্গজাতীয় প্রাণী যেমন মৌমাছি বা প্রজাপতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। মৌমাছি বিলুপ্তির সাথে মানবজাতির বিলুপ্তির শঙ্কা বাস্তব সত্য।

৯। জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি খুবই ধ্বংসাত্মক বলে মনে করা হচ্ছে। যেহেতু দ্রুতবর্ধনশীল ও আপাতদৃষ্টিতে অধিক হারে উৎপাদনক্ষম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার কারণে প্রচলিত ধীরবর্ধনশীল ও স্বল্পহারে উৎপাদন সক্ষম প্রজাতিসমূহ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

১০। খোলা পরিবেশে স্বাভাবিক ফসলের সাথে জিএমও ফসলের পরগায়ন-দূষণ রোধ সম্ভব নয়, যা স্বাভাবিক উদ্ভিদের জন্য অতীব ক্ষতিকর। বিষয়টি আইনগত বিবাদ সৃষ্টি করছে।

১১। এই জীবের আভ্যন্তরীণ বংশ কণিকার পরিবর্তন গবাদিপশু ও মানুষের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিনষ্ট করতে পারে। শরীরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন হরমোনের অনুপাত বিনষ্ট হতে পারে।

১২। শরীরে অজান্তে ক্যানসার সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি করতে পারে।

১৩। বৃহৎ করপোরেট পূঁজির হাতে পেটেন্ট বা মালিকানা স্বত্ত্বরক্ষা আইনের কারণে বীজের একচ্ছত্র অধিকার (মনোপলি) সাধারণ কৃষকদের অসহায় করে ফেলতে পারে। ফলে বীজের উচ্চমূল্যের ফাঁদে পড়তে পারে কৃষক। এতে করপোরেট পূঁজির কাছে মানবসমাজের বীজ ভাণ্ডারের চিরায়ত সার্বজনীনতা ক্ষুণ্ন হবে।

জিএম আলু। ছবি: সংগৃহীত১৪। বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই দেখা গেছে, জিএমও বীজের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি ব্যাপকহারে ফসলহানি হয়েছে, যার কোনো প্রতিকার বীজ কোম্পানির থেকে পাওয়া যায়নি।

১৫। এমনকি বীজের প্রান্তিক ব্যবহারকারী হিসাবে করপোরেট কোম্পানির সরবরাহকৃত বীজ থেকে চাষী যেন কোনোভাবেই নিজস্ব বীজভাণ্ডার তৈরী করতে না পারে, তার জন্য এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে নুতন বীজের প্রকৌশল করাকালেই জিনের মধ্যে ‘আত্মহত্যাকারী জিন’ বা ‘কিলিং জিন’ ঢুকিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

১৬। দেখা গেছে, বায়োটেকনোলজির ক্ষেত্রে বৃহৎ করপোরেট কোম্পানিগুলো গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে এই বিষয়ে স্বাধীনভাবে ব্যক্তি বা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে চায়। যেন সাধারণ মানুষে তাদের প্রদত্ত তথ্যের বাইরে এ সম্পর্কিত কোনো তথ্য না জানতে পারে।

১৭। এই জীব বিষয়ে অন্যতম বিতর্কের একটি কারণ হলো–এগুলো প্রচলিত সামাজিক প্রথা, নীতি-নৈতিকতা কিংবা ধর্মীয় বিধিবিধানের বিপক্ষে যায়। যেমন জৈব পিতৃত্ত্ব বা মাতৃত্ত্ব ধারণার অবসান ঘটে। 

জিএমও-এর বিরুদ্ধে এ রকম আরও অভিযোগ রয়েছে। এই বিতর্কে দু’টি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষ হলো–জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কাজের সাথে যুক্ত কৃষি-জীব প্রকৌশল শিল্পের সাথে যুক্ত উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী ও এই চক্রের পক্ষে কর্মরত অপরাপর বিশেষজ্ঞ, প্রচারমাধ্যম, রাষ্ট্রসমূহের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সমর্থক গোষ্ঠী ইত্যাদি। এই চক্রের নাম হলো–এগ্রো-বায়োটেক বা কৃষি‑জীব প্রকৌশল শিল্প। এই পক্ষের মত হলো–খাদ্য ঘাটতি, বিরূপ জলবায়ু, আগাছা-বালাই আক্রমণ ইত্যাদি মোকাবিলার জন্য কৃষি‑জীব প্রকৌশলই একমাত্র সমাধান। বলাবাহুল্য, এই মতাবলম্বী পক্ষ হচ্ছে তারাই, যারা পৃথিবী নামক গ্রহটাতে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতি-ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এটাকে রোগ-ব্যধি-ক্ষুধা-দারিদ্র্য-যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষে আবদ্ধ রেখে মহাকাশে নতুন কোনো বসবাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে ফেরেন।

অপর পক্ষে আছে তারাই, যাদের মতামত ঠিক এই মতপন্থীদের বিপরীত। সে দলেও আছেন, বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী, গবেষক, পরিবেশ সচেতন সমাজ, প্রচারমাধ্যমের নিঃস্বার্থ অংশ, কৃষক ও সাধারণ মানুষ। এদের মত হচ্ছে–প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে অন্ধের মতো চোখ বন্ধ করে গবেষণালব্ধ যে খাদ্য মানুষের মুখে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা বরং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ধ্বংসের নতুনতর পদক্ষেপ। বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন শৃঙ্খলের মধ্যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে নির্মম বেনিয়া করপোরেট পূঁজির কালো হাত। ফসল ও বীজ উৎপাদন, বিতরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের হাত থেকে সুকৌশলে সুবৃহৎ পূঁজির নিয়ন্ত্রণে তুলে দেওয়া মূলত তাদের জীবন-জীবিকার অধিকারকে পূঁজির নিগড়ে আটকে দেওয়া। এই পক্ষের আরও অভিযোগ–এতে সামগ্রিক প্রকৃতির ক্ষতিসাধন, জীব বৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন, অতি আগাছা-বালাইয়ের আর্বিভাব (যেমনটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব ঘটেছে), মানুষের শরীরে অ্যালার্জি-বিষক্রিয়া ছাড়াও নানাবিধ অজ্ঞাত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতির আর্বিভাবের আশঙ্কা বাড়ছে। তাদের বক্তব্য হলো–উদ্ভিদ বা প্রাণীর কোষীয় স্তরে গিয়ে ক্রোমোজোমের বংশকণিকাস্থ ডিএনএর যে অংশটুকু বদল করা হয়, জীবিত শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপে সেই অংশটুকু যে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্যই দায়ী ছিল, তার কোনো প্রমাণ নেই।

অন্যান্য ক্রোমোজোমের সাথে সেই সব অংশের সম্মিলিত কার্যাবলীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে মানুষের জ্ঞান এখনো একেবারেই অপর্যাপ্ত। সে সব বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়াই নির্দিষ্ট একটিমাত্র বেশিষ্ট্যকে নির্বাচন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে গবেষণালব্ধ তথ্যের ঘাটতিকে আড়াল করা হচ্ছে এবং মানুষকে উচ্চাশার লোভের মধ্যে নিক্ষেপ করা হচ্ছে।

জিএম পেঁপে। ছবি: পেক্সেলএ ছাড়া তাঁরা দাবি করেছেন যে, জেনেটিক পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট জীবের শরীরজাত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনসংশ্লিষ্টতায় যেমন সেই খাদ্যের পুষ্টিমান ও খাদ্যমানে পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তেমনি তা থেকে উৎপাদিত বিষক্রিয়া মানুষের শরীরের আণবিক স্তরে বিশেষত বংশকণিকায় (ডিএনএ) অজ্ঞাতসারে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, নতুন কোনো এলার্জেন তৈরি করতে পারে। এবং এ সমস্ত বিষয়ে কোনো গবেষণাই হচ্ছে না। সে জন্য এসব খাদ্য মানুষের পাতে দেওয়ার আগ পর্যাপ্ত গবেষণা সম্পন্ন করা হোক। এই বিষয়ে একটি উদারণ এ রকম–কৃষি‑জীব প্রকৌশলের মাধ্যমে উদ্ভিদ শরীরের অভ্যন্তরেই বালাই (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পরজীবী, পোকামাকড়) নিরোধক হরমোন তৈরি করানো হচ্ছে, যা একেবারেই জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি বিরোধী। এক সময় এসে এটি বৈশ্বিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। আবার এই উদ্ভিদ বা উদ্ভিজ্জাত খাদ্যের যারা ভোক্তা; যেমন মানুষ, গবাদি, প্রকৃতিতে বিচরণকারী মৌমাছি-কীটপতঙ্গের শরীরে, এমনকি উদ্ভিদাংশ মৃত্তিকায় মিলিয়ে যাবার সময় কী কী অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া হবে, সে সবের কোনো গবেষণা বা তথ্য এখনো নেই। কারণ, যারা পূঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে এই উচ্চফলনশীল বা বালাইনিরোধী জাত বা ভিন্নতর উদ্ভাবনের নেতৃত্বে আছেন, তাঁদের চিন্তার স্তরে অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তার চেয়ে কত তাড়াতাড়ি বিনিয়োগকৃত অর্থের সহস্রগুণে ফেরত আনা যায় সেটাই মূখ্য!

এখানে আবার মজার বিষয় হলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষি-জীব প্রকৌশল শিল্পের সাথে যুক্ত উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী ও এই চক্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের কাছে ওই জাতীয় কোন তথ্য নেই। কাজেই এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তো এই বিষয়গুলো গবেষণা করবে কারা? তারাই তো করবে, না? আবার তারাই বলবে যে তথ্য-উপাত্ত নেই! অন্যদিকে এক পক্ষ নতুন উদ্ভাবনী নিয়ে পূঁজির মুনাফা তুলবে আর অন্য কেউ এসে তার উপকার-অপকার নিয়ে গবেষণা করবে, তা কি আবার হয় নাকি! প্রথম পক্ষ তাই উচ্চফলন, উচ্চ পুষ্টিমান, বালাইনিরোধী ইত্যাদি বিষয়কে সামনে রেখে প্রচারের মাধ্যমে জিএম কৃষিপণ্য নিয়ে বিনিয়োগকৃত পূঁজির মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে সুপার রিচ (অতি ধনী) হওয়ার দৌড়ে নরমেধ যজ্ঞ চালাতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না আবার কোভিডের মতো বিপর্যয় বা জীববৈচিত্র্যে তেমন একটি ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে না আসছে! বিষয়টি বস্তুত শাঁখের করাত! ওই রকম কোনো বিপর্যয় (যেমন কোভিড) এসে গেলে সেটি আবার তাদের জন্য আরেক প্রস্থ মুনাফাখোরি বাণিজ্যের দরজা খুলে দেবে! এই পূঁজির পণ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের অমূল্য প্রাণ তো সব সময় বিনা খরচে উৎসর্গিত হয়েই আছে! (চলমান)

লেখক: কানাডাপ্রবাসী লেখক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

কৃষকের এই অনিশ্চয়তার উৎসও কম নয়। কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কখনও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আবার কখনও বাজারের অস্থিরতা কিংবা উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি—সব মিলিয়ে কৃষকের জীবন হয়ে ওঠে কণ্টকিত। ফলে বছরের পর...
​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৬–৩৮ শতাংশ নারী এবং শিল্প খাতে নিয়োজিত নারীদের প্রায় ৬০ শতাংশই রেডিমেড গার্মেন্ট (আরএমজি) খাতে কাজ করেন। অর্থাৎ,...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
বিশ্বজুড়ে আজ মুক্তি পেল ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি ‌‘দ্য ওডিসি’। গ্রিক কবি হোমারের একই শিরোনামের মহাকাব্য অবলম্বনে এটি নির্মিত হয়েছে। আর সেই মহাকাব্য এতই প্রাচীন, যা আনুমানিক ২,৮০০ বছর আগে লেখা...
পাকিস্তানের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেলুচিস্তানের ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণার খবর। গত বুধবার নিজেকে বেলুচিস্তানের প্রতিনিধি দাবি করে মীর ইয়ার বালুচ নামের এক ব্যক্তি নিজের এক্স হ্যান্ডলে দাবি...
বান্দরবানে বন্যাদুর্গত নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এনজিও ঋণের কিস্তি ও সুদ এক মাস মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল। পাশাপাশি পুনর্বাসন, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, কৃষি সহায়তা এবং...
বিরোধী দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জুলাইকে ব্যবহার করতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় এ...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর