জনপ্রিয় বাউলশিল্পী শফি মণ্ডলের কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়ি ও আশ্রমে নিরাপত্তা জোরদার করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মূলত দৌলতপুরে হত্যাকাণ্ডের শিকার পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তাঁর একটি ছবি সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এরইমধ্যে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এবার সেই ভাইরাল হওয়া ছবির বিষয়ে মুখ খুললেন বাউল শফি মণ্ডল।
তিনি জানান, প্রায় দেড় বছর আগে ওই দরবারে গান গাইতে গিয়েছিলেন। সেদিনই প্রথমবারের মতো পীর শামীম রেজার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে শফি মণ্ডল বলেন, ‘আমি মূলত একজন বাউলশিল্পী। কাজ করি বাউল ঘরানার। আমার মত-পথ হচ্ছে লালন ফকিরের। সারাদেশের যত দরবার আছে, সেসব দরবারেই আমি বেশি প্রোগ্রাম করি। একেক তরিকার বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন মত-পথ থাকতেই পারে।’

যোগ করে তিনি বলেন, ‘সেদিন সেখানে (পীর জাহাঙ্গীরের দরবার) গান করতেই গিয়েছিলাম, তা দেড় বছর আগে। সেই ছবিই ভাইরাল হয়েছে। ওখানে আমার কোনো বক্তব্যও নাই। তাছাড়া আমার মনে হয় ওনার সঙ্গে ওই একদিনই আমার দেখা হয়েছিল। তাঁর আমন্ত্রণে ওই একদিনই যাই সেখানে; এ রকম দেশের সমস্ত দরবারেই আমি যাই এবং গান করি। কখনও এ রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি, এখন হচ্ছি। ওখানে আমার গ্রামের বাড়ি, কোনো কারণে কারও ব্যক্তিগত আক্রোশ আমার ওপর থাকলে থাকতেও পারে। কিন্তু কারও প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নাই।’
গ্রামের বাড়ি ও নির্মাণাধীন ভাবনগর আশ্রমে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ গ্রহণ করায় নতুন সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাউল শফি মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘দৌলতপুরে ওই হত্যাকাণ্ডের পর ফেসবুকে একটি পোস্ট ছিল যে এরপর শফি মণ্ডলের বাড়িতে হামলা হবে। আমি তো ছিলাম না ওখানে, এখনও বাইরেই আছি। এ বিষয়ে সরকার নিজ থেকেই পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আমার আখড়াবাড়ি ভেঙে দেওয়ার জন্য নাকি প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তারপর সরকারের দায়িত্বেই ওখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আমি নিজে জানিও না, এটা সরকার তাদের দায়িত্বেই করেছে।’
বর্তমানে কিংবা আগে কখনও মৃত্যুর হুমকি পাননি বলে জানান এই বাউলশিল্পী। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আস্তে আস্তে ব্যাপারটা এত বড় হয়ে গেছে! এমন ঝামেলায় কখনও পড়িনি। আমি একজন সাধারণ বাউল মানুষ। কাজ করি মানবতার, লালন ফকিরের ফেরিওয়ালা আমি। এমন ঝামেলায় তো কখনও পড়িনি, এখন হঠাৎ করে বিষয়টি নিয়ে একটু মানসিকভাবে আঘাত পেলাম। একুট ব্রেনে লাগছে। কিন্তু কোনো শঙ্কা নাই। এখন আর কী শঙ্কা থাকবে! ধরেন আমার বয়স হয়ে গেছে অনেক! ৭৪ বছর!’

সহজভাবে একটি প্রশ্ন রাখলেন শফি মণ্ডল– ‘সে-ও (নিহত পীর) একটা তরিকার লোক, তার সাথে আমার ব্যক্তিগত মতামতের মিল না থাকতে পারে। কিন্তু সে-ও তো মানুষ? আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, দুটো গান করে চলে এসেছি।’
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে বাউল শফি মণ্ডলের একটি ছবি প্রকাশ করেন এক ব্যক্তি। এভাবে ছবি প্রকাশ মূলত ভাইরাল হওয়া কিংবা নিজের প্রোফাইল ভারি করার জন্যই করা হয়েছে বলে মনে করেন শফি মণ্ডল। ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে তিনি বলেন, ‘আমার ছবিটা যিনি শেয়ার করেছেন, এটা তাঁর আইডি ভারি করার জন্য। আমার ছবি দিলে দ্রুত ছড়াবে– এটাই তিনি কাজে লাগিয়েছেন। কোথাও কোনো দরবারে গেলে, সেখানে সারাদিন মানুষ আমার ছবি তুলতেই থাকে, কাকে নিষেধ করব? এখন একটা বিড়ম্বনায় পড়েছি, তাছাড়া জীবনে আমি কাউকে কষ্ট দিয়ে কখনও একটা কথাও বলিনি। এখন কেমন লাগছে, সেটা আমি বোঝাতে পারব না। নতুন একটা অভিজ্ঞতা হচ্ছে, হয়তো আমার এই আঘাত পাওয়াটা প্রয়োজন ছিল! ভুল হচ্ছে কিনা আমার চলাফেরায়, আমি নিজেও জানি না।’
বর্তমানে রাজধানী ঢাকার একটি এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন বাউল শফি মণ্ডল। সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ কিংবা পুলিশ মোতায়েন জরুরি কিনা– এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই এলাকার লোকও আমাকে ভালোবাসেন। একটু সাবধানতা অবলম্বন করছি। বেশি কিছু দরকার নাই।’
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুরনো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তাঁর দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। আর এই ঘটনার পর ভিন্ন মত-পথের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে।


অন্তঃসত্ত্বাকালীন শ্বশুরবাড়ি ছাড়তে হয়েছিল আশা ভোঁসলেকে
বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের পদচারণা, ঢাকায় এল যুক্তরাজ্যের প্রযোজক দল
