বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে, দায় কি শুধুই নারীর?

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:২০ পিএম

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। বৈবাহিক সম্পর্কের শেষ সমীকরণ বিবাহ বিচ্ছেদ। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই একা নারীর ওপর দোষ চাপাতে দেখা যায়। আসলেই কি তাই? এ ক্ষেত্রে বিয়ে যেমন, তেমনি বিচ্ছেদকেও একটি সামাজিক ঘটনা হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল দেখা দিতেই পারে। সেই অমিল যখন অসহনীয় পর্যায়ে ঠেকে, তখন দাম্পত্য সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন স্বামী-স্ত্রী। এরই জেরে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পারেন। এটা নারী বা পুরুষ যে কোনো পক্ষই নিতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ভাঙার দায় একা নারীর ঘাড়ে চাপানোর একটা সংস্কৃতি আমাদের রয়েছে। কিন্তু কেন?

বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ

একটু পরিসংখ্যানে নজর দেওয়া যাক। চলতি মাসের ১১ আগস্ট অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘জয়পুরহাটে গড়ে প্রতিদিন ১০ তালাক’। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো জয়পুরহাটে গত এক বছরে দিনে গড়ে ১৪টি বিয়ে নিবন্ধিত হলেও বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ১০টি। জয়পুরহাটের জেলা রেজিস্টার কার্যালয়ের সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৫ হাজার ২৬০টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়। এই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হয় ৩ হাজার ৭৩৬টি। এর মধ্যে ছেলের পক্ষ থেকে প্রদত্ত তালাকের আবেদন ছিল ৭৭৩টি; আর নারীর পক্ষ থেকে ছিল ১ হাজার ৪৭১টি। এ ছাড়া উভয়পক্ষে সম্মতিতে তালাক কার্যকর হয়েছে ১ হাজার ৪৯২টি। ২০২২ সালে বিয়ে ও তালাকের সংখ্যানুপাত ছিল ১০০:৭১। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ বিয়ের বিপরীতের তালাক হয়েছে ৭১টি।  ২০২০, ২০২১ সালে এ হার ৫০-এর আশপাশে ছিল।

শহর নাকি গ্রাম

এ কথা সত্য যে, দেশে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন নারীরাই বেশি করছে। নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে বা পারিবারিক নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতেই বিবাহবিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স-২০২২’ এর ফলাফলে থেকে জানা যায়, দেশে বিগত বছরের তুলনায় ২০২২ সালে স্থূল তালাকের হার (প্রতি হাজার জনসংখ্যায়) বেড়েছে। আবার এ হার শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি। ২০২২ সালে তালাকের হার ছিল ১.৪ শতাংশ। অথচ ২০২০ ও ২০২১ সালে এ হার ছিল যথাক্রমে ০.৮ ও ০.৭ শতাংশ।

পরিসংখ্যান

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারীরা বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন বেশি করছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গত পাঁচ বছরের বিবাহবিচ্ছেদের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২০১৯ সালে মোট তালাক কার্যকর হয়েছে ৬৩৬০টি। এর মধ্যে নারীদের করা আবেদন ছিল ৩ হাজার ৮২৪টি। আর পুরুষ করেছে ২ হাজার ৩২০টি আবেদন। ২০২০ সালে মোট তালাক  কার্যকর হয়েছে ৬ হাজার ৩৪৫টি, যার মধ্যে ৩ হাজার ৮২৪টি নারী এবং ২ হাজার ৩২০টি পুরুষ আবেদন করেছে। ২০২১ সালে মোট তালাক কার্যকর হয়েছে ৭ হাজার ২৪৫টি, যার মধ্যে নারীর করা আবেদন ৩ হাজার ৮২৪টি এবং পুরুষের করা আবেদন ছিল ২ হাজার ৩২০টি। ২০২২ সালে মোট তালাক  কার্যকর হয়েছে ৭ হাজার ৬৯৮টি। এর মধ্যে নারীর করা আবেদন ছিল ৩ হাজার ৮২৪টি এবং পুরুষের করা আবেদনের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩২০টি।  আর ২০২৩ সালের জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত সময়ে মোট তালাক কার্যকর  হয়েছে ৪ হাজার ২২২টি। এ মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেই কার্যকর হয়েছে ১ হাজার ৯৯৯টি।

এবার একটু বড় পরিসরের হিসাব নেওয়া যাক। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গত ১৩ বছরের (২০১১-২০২৩ সাল) বিবাহবিচ্ছেদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে মোট তালাক কার্যকর হয়েছে ৪৭ হাজার ৯৮৯টি। এর মধ্যে নারীর করা আবেদন ছিল ৩৯ হাজার ৩৬৯টি এবং পুরুষের করা আবেদন ছিল ১৯ হাজার ৬০০টি।

বিবাহবিচ্ছেদ কেন বাড়ছে?

নারীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, বিবাহবহির্ভুত সম্পর্ক এবং স্বনির্ভর নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, অভাব-অনটন, বেকারত্ব, সন্দেহ, দাম্পত্য কলহকে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মো. নূর খান মনে করেন, ‘তালাক নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার। আগে আমাদের দেশের নারীরা নির্যাতন মুখ বুঁজে সহ্য করে সংসার করতেন। কারণ তখন তাদের অর্থনৈতিক কোনো স্বাধীনতা ছিল না। তারা সংসারের সব কাজ করতেন। এখন শহর কিংবা গ্রামের নারীদের বড় একটা অংশ কর্মজীবী। এ কারণে আত্মসম্মানে আঘাত এলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তালাকের দিকে যেতে পিছপা হচ্ছেন না। তবে, তালাক কিন্তু দুই পক্ষের কারণেই হচ্ছে। পুরুষদের পক্ষ থেকেও তালাক দেওয়া হচ্ছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে যেটা হয়, তা হলো পুরুষেরা অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন, অথবা পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারছেন না কিংবা পরিবারের অসন্তোষের কারণে তালাকের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। এতে বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে।’

বিবাহবিচ্ছেদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই নারীর ওপর দোষ চাপানো হয়। প্রতীকী ছবিটি পিক্সাবের সৌজন্যে

তালাকের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে দোষারোপ না করে বিষয়টিকে আর দশটি সামাজিক ঘটনার মতো করেই দেখা দরকার বলে মনে করেন আসকের নির্বাহী পরিচালক মো. নূর খান। তিনি বলেন, ‘নারীদের সামাজিক অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। পরিবার, সমাজ, রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রগুলোতে এখনও নারীরা অনেকাংশে পিছিয়ে। ফলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তালাকের দায়টা নারীদের ওপর বর্তাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কী কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হলো, সে ঘটনাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বিবাহবিচ্ছেদের পর যে কাজটা করা বেশি জরুরি, সেটা হলো দেনাপাওনার বিষয়টি নিশ্চিত করা। সন্তান থাকলে সন্তানের ভরনপোষণের বিষয়টি দেখা। সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা কাজ করে। বিশেষ করে তালাকের পর নারীদের দেনা-পাওনা পরিশোধ করতে অনেকেই অপারগতা প্রকাশ করে। আর সন্তানদের ভরনপোষণের ভার তো নিতেই চান না।’

নারীর স্বনির্ভরতা

নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা৷ আগে নারীরা স্বামীর নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতেন। এখন নারীরা অসম্মানজনক সম্পর্কে বন্দী থাকতে চান না। তাই তারা এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিবাহবিচ্ছেদকেই শ্রেয় মনে করছেন৷

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইফফাত গিয়াস আরেফিন বলেন, ‘বৈবাহিক চুক্তি বাতিলের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটানোর প্রক্রিয়াকে বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্স বলে। স্বামী-স্ত্রী একত্রে বসবাস করলে অনেক সময় কারণে-অকারণে মতের অমিল হয়। এতে সৃষ্ট দাম্পত্য কলহের জেরে অনেক সময় তারা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে অনাগ্রহী হন। একপর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেন।  এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের পরিমাণ বাড়ছে।’

তবে বিচ্ছদের প্রধান কারণ হিসেবে যৌতুককে অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করেন এ আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘বরপক্ষ কনেপক্ষের কাছে যৌতুক দাবি করে। কনেপক্ষ যৌতুক দিকে ব্যর্থ হলে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। আবার শ্বশুর বাড়ির মানুষদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে অনেক নারী বিবাহবিচ্ছেদকে বেছে নেন। এ ছাড়া সন্তান না হলে এখনও এই সমাজে সাধারণত নারীদের দায়ী করা হয়। এ কারণেও বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। দাম্পত্য কলহের কারণে অনেক সময় বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। এর বাইরে দারিদ্র্যের কারণেও স্বামী তার স্ত্রীর ভরণপোষণ অক্ষম হয়ে পড়েন, যা বিবাহ বিচ্ছেদে গড়ায়। আবার বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কের কারণেও বিবাহবিচ্ছেদ ঘটছে। কাজেই নারীর কারণেই যে বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে তা বলা যাবে না। নারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাবলম্বী। ফলে নিজের সম্মান রক্ষায় বাজে পরিস্থিতিতে বিবাহবিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। একটি বিষাক্ত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার বদলে এটা বরং ভালো। ’

পারস্পরিক বোঝাপড়া

পরিশেষে বলতে হয়, দুজন মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা থেকে যে আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়, সেটার নামই সম্পর্ক। যেকোনো সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বোঝাপড়া। বোঝাপড়াতে ভাঙন ধরলে বা মতের অমিল অসহনীয় পর্যায়ে ঠেকলে সম্পর্কেও দেখা দেয় ফাটল। সেই ফাটল থেকে নিয়ম মেনে হয় বিবাহবিচ্ছেদ। বিয়ের মতো বিচ্ছেদও একটি সামাজিক ঘটনাই। এ জন্য দোষারোপ নয়, বরং কোনো মানুষের এ ধরনের সিদ্ধান্তকে আর সবার সম্মান জানানো উচিত।

হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক, আর কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু এর উল্টো পিঠটাও বড্ড নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের মহারণ শেষে আজ রাত ৩টায় আমেরিকার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর