মধ্যপ্রাচ্য এখন আগ্নেয়গিরির মুখে। গত ছয় সপ্তাহ ধরে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে তছনছ করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ, তেলের বাজারে আগুন আর নিরাপত্তা কাঠামোর চুরমার অবস্থা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো সৌদি আরবের ভূমিকা।
না তারা সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে, না তারা ইরানকে পুরোপুরি ত্যাগ করেছে। রিয়াদের এই ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতির পেছনে আসলে কী পরিকল্পনা কাজ করছে? কেন তারা ওমানের মতো ইরানের বন্ধু হচ্ছে না, আবার আমিরাতের মতো ইসরায়েলের কট্টর সঙ্গীও হচ্ছে না?
সৌদি আরব বড় একটি শিক্ষা পেয়েছে ২০১৯ সালে। যখন হুতিরা তাদের তেল স্থাপনায় বড় হামলা চালিয়েছিল, তখন ওয়াশিংটন শক্ত কোনো জবাব দেয়নি। সেই থেকেই রিয়াদ বুঝে গেছে—যুক্তরাষ্ট্রের ‘সিকিউরিটি গ্যারান্টি’ এখন আর আগের মতো অটুট নয়। ফলে তারা এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। তারা একদিকে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে সম্পর্ক জোড়া দিয়েছে,
অন্যদিকে পাকিস্তানের সাথে ডিফেন্স প্যাক্ট করেছে। রিয়াদ এখন আর ইসরায়েল বা ইরানের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয়; তারা চায় এমন এক ভারসাম্য, যেখানে সৌদি আরব হবে চালকের আসনে।
রিয়াদের সবচেয়ে বড় ভয়—ইরানের মিত্র হুতি গোষ্ঠী। সৌদি আরব জানে, তারা যদি সরাসরি ইরানবিরোধী যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে লোহিত সাগরে তাদের তেল রপ্তানি থমকে যাবে। তাদের ‘ভিশন-২০৩০’ বা অর্থনৈতিক বিপ্লব মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই তারা চুপচাপ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—ইরান যদি সরাসরি সৌদি অবকাঠামোতে হামলা করে, তবে কি রিয়াদ চুপ থাকবে? উত্তর হলো—না। সৌদি আরব এখন মিসর, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সাথে একটি বিশাল সামরিক অক্ষ তৈরি করছে, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ইরান ও ইসরায়েলের টানাপোড়েন
গাজা যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য সব হিসাব বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে পথ যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছিল, তা এখন জনরোষের কারণে প্রায় অসম্ভব। ইসরায়েল চায় সৌদি আরব যেন ইরানের বিরুদ্ধে তাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ইরান চায়—সৌদি মাটি যেন মার্কিন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। রিয়াদ এখন এমন এক সন্ধি খুঁজছে যেখানে ইরান বা ইসরায়েল কেউ যেন আঞ্চলিক ‘বস’ হতে না পারে।
নতুন আঞ্চলিক জোট: পাকিস্তান-মিসর-তুরস্ক
রিয়াদ এখন আর কেবল পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে নেই। তারা গড়ে তুলছে মুসলিম বিশ্বের এক শক্তিশালী সামরিক জোট। একদিকে পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি ও মিসাইল প্রযুক্তি, অন্যদিকে তুরস্কের উন্নত ড্রোন এবং মিসরের বিশাল সেনাবাহিনী—এই তিন শক্তিকে নিয়ে সৌদি আরব এক নতুন নিরাপত্তা ছাতা তৈরি করছে। এটি শুধু ইরানকে ঠেকানোর জন্য নয়, বরং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকেও বার্তা দেওয়া যে—সৌদি আরব এখন নিজের নিরাপত্তা নিজেই সামলাতে সক্ষম।
ইতিহাস বলে, ভূগোল পাল্টানো যায় না। ইরান এবং সৌদি আরব চিরকাল প্রতিবেশীই থাকবে। হয় তাদের ধ্বংসাত্মক সংঘাত বেছে নিতে হবে, না হয় ইতিবাচক সহাবস্থান। সৌদি আরব এখন যে পথে হাঁটছে, তা যদি সফল হয়—তবে এই যুদ্ধ শেষে তারা কেবল একটি তেল সমৃদ্ধ দেশ নয়, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।



