লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ঘরে ঢুকে একই পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় হামলাকারী অনন্ত মজুমদারও বিক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। ফলে এ ঘটনায় মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা ডাকাতিয়া নদীপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত শাহীনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। প্রায় ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে তিনি রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। কয়েক বছর ধরে তিনি সন্তানদের নিয়ে আমির হোসেন মাস্টারের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। ২০১৯ সালে তার স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তিনি সেখানে বসবাস করে আসছিলেন।
অন্যদিকে, হামলাকারী অনন্ত মজুমদার স্ত্রীসহ প্রায় দেড় বছর একই এলাকায় ভাড়া থাকতেন। প্রায় সাত-আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার সকালে তিনি শাহীনুরের বাসায় যান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসায় ঢুকেই অনন্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহীনুর ও তার তিন মেয়ের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালান। এতে ঘটনাস্থলেই শাহীনুর বেগম ও তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার নিহত হন। সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর মারা যায় শাহীনুরের আরেক মেয়ে শিফা আক্তার। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে কলেজছাত্রী ইকরা আক্তারের মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর স্থানীয়রা হামলাকারী অনন্ত মজুমদারকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং রায়পুরে ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী ছিলেন।
এদিকে, ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইটপাটকেলে সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।
প্রাথমিকভাবে প্রেমঘটিত বিরোধ বা অর্থনৈতিক লেনদেনসংক্রান্ত কোনো বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, ‘নিহত শাহীনুরের একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঘটনার সময় সিফাত কর্মস্থলে ছিলেন। পরে পরিবারের সদস্যদের হত্যার খবর পেয়ে তিনি ভেঙে পড়েন এবং কারও সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না।’
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম বলেন, ‘হাসপাতালে পাঁচজনকে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মা ও দুই মেয়ে মারা যান। পরে গুরুতর আহত আরেক মেয়েকে ঢাকায় পাঠানো হলে পথেই তার মৃত্যু হয়। নিহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।’
রায়পুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘এ ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। সন্দেহভাজন হামলাকারীকে জনতা গণপিটুনি দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, ‘বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনন্ত মজুমদার আগে ওই এলাকায় ভাড়া থাকতেন। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি ঘটনাস্থলে এসেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাণী নামে এক প্রতিবেশী তাকে বাড়িতে দেখে সন্দেহ করেন এবং স্থানীয়দের খবর দেন। এরপর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।’



