মিলনায়তনজুড়ে শিশুদের মিলনমেলা। শুক্রবার বিকেলটি মুখর হয়ে উঠেছিল তাদের কলকাকলিতে। কেউ নাচছে, কেউ গাইছে, আবার কেউ পাঠাভিনয় করছে। এই উৎসবে বাদ পড়েনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও। তাদের পরিবেশিত লোকনৃত্য দর্শক-শ্রোতাদের বাড়তি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। শিশুদের পাশাপাশি পরিবেশনায় অংশ নেন বাতিঘরের শিক্ষাকর্মীরাও।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ও সাহিত্যিক আখতার হুসেনকে উৎসর্গ করে ‘শিকড়ের টানে শৈশবের প্রাণে’ স্লোগানে এ উৎসবের আয়োজন করে বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
উৎসবে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক, সাহিত্যিক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার অরুণ কুমার বিশ্বাস এবং গল্পকথক ও আবৃত্তিশিল্পী তামান্না তিথি।
জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এরপর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ও সাহিত্যিক আখতার হুসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে বাতিঘরের শিশুরা ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ এবং ‘আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ গানের সঙ্গে উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করে।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এরপর তাঁর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় নির্মিত ‘মনের কথা’ পাপেট শোর একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। এতে শিশুদের সহজভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আঁকার পদ্ধতি দেখানো হয়। পতাকা আঁকার মধ্য দিয়ে শিশুদের মনে দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার বিষয়টিও উঠে আসে। পাপেট শোর এ পর্বে পারুল চরিত্রে কণ্ঠ দেওয়া তামান্না তিথি মঞ্চে এসে মুস্তাফা মনোয়ারের সৃজনকর্ম এবং চরিত্রটির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
জ্ঞানব্রত, শ্রমব্রত, সত্যব্রত, ঐক্যব্রত ও আনন্দব্রত—এই পাঁচটি মূল আদর্শ নিয়ে ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে গড়ে ওঠে ব্রতচারী আন্দোলন। বাঙালি তরুণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা, জাতীয় চেতনা ও নাগরিকত্ববোধ জাগিয়ে তোলাই ছিল এ আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। এর পথিকৃৎ গুরুসদয় দত্তের সেই আদর্শ শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বাতিঘরের শিশুরা ব্রতচারী পরিবেশন করে।
এ পরিবেশনায় অংশ নেয় মাহদী ইমাম সান্নিধ্য, লামুমা আজরিন, ত্রিবেণী কর নোরা, আনহা আরওয়া, শাহতাজ নূর ফারহান, শাফাকাত হুসাইন সানাফ, রিদিত চৌধুরী স্পর্শ, অমরাবতী হক বিমূর্ত, ওয়ারদাহ বিনতে মুনতাকিম এভলিন, জুনাইরা সিদ্দিকা, উনাইশা সিদ্দিকা, সুলগ্না দাস রাই, রুশাইদ রহমান, জুনাইরা আহসান ও জায়েদ আহসান।
ব্রতচারী পরিবেশনার পর সাহিত্যিক আখতার হুসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিশুদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক।
এরপর পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের নাটক ‘মালঞ্চ ও মাধব’-এর পাঠাভিনয় পরিবেশন করে বাতিঘরের শিশুরা। এতে অংশ নেয় নুসাইর বিন মাহতাব (রায়ীদ), অয়ন্তিকা কর, আরিশ ইবনে আব্দুল্লাহ, রায়াজ ফাউজান নিহান, সুবাইতা সামহা, কাওনাইন রেজা আরাফ, আরহাম রেজা আরিশ, সৈয়দা সামরীন নূর জাইভী, সৈয়দ সাফীর ওয়াহিদ জাদিদ, আরীবা হোসেন, এম এম যারীব হোসেন, শামস সুকৃতি, পরমা প্রকৃতি ও পূর্ণতা সংস্কৃতি।
উৎসবে লোকনৃত্য পরিবেশন করে কিডি সিটি স্পেশাল স্কুল অ্যান্ড থেরাপি সেন্টারের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা। এ পরিবেশনার নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন এ এস এম উজ্জ্বল মণ্ডল। এতে অংশ নেয় মাইমুন আরাবি, সাফিন আহমেদ, মুপ্তাসিন হাসান সাইয়ান, জুবাইদা খান জারা, নাবিল মাহমুদ, আরহা হক মেহেজা, মেহেরান আবদুল্লাহ ও মার্জুক আহমেদ। তাদের পরিবেশনায় পুরো মিলনায়তনে ছড়িয়ে পড়ে মুগ্ধতা।
শিশুদের পরিবেশনার পর বাতিঘরের কর্মীরা ‘বাংলার পথে সুরের সাথে’ শীর্ষক নৃত্যালেখ্য পরিবেশন করেন। এতে অংশ নেন শ্রাবন্তী পাল তন্বী, সাবিহা সুলতানা শিমু, আমির হামজা, সিনথিয়া নূর জান্নাত, এস এম তামিমুজ্জামান তামিম, নূর আল জান্নাত মিলি, তানভীর ইরফান, তানজিলা আমিনা ইন্দিরা, ঊর্মি তালুকদার ও মো. আরমান ইসলাম।
বাতিঘরের পরিচালক মরিয়ম ইউসুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশ ও সাংস্কৃতিক চর্চায় এমন আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।


