বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বর-কনেসহ ১৪ জনের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।
নিহত ১৪ জনের মধ্যে বর, তাঁর বাবা, ভাই-বোন, ভাবি, ভাগ্নে-ভাগ্নিসহ এক পরিবারেরই ৯ জন। ভোররাতে তাদের মরদেহ পৌঁছায় বাগেরহাটের মোংলা পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম শেহলাবুনিয়া এলাকায়। আর কনে, তাঁর বোন, দাদি ও নানির মরদেহ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়।
শুক্রবার সকাল থেকে মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলাবুনিয়ায় বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে অসংখ্য মানুষ ভিড় করতে শুরু করেন। সবাই যেন শোকস্তব্ধ। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর শুনে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন। নিহত আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছে পরিবারের চার নারীর মরদেহ। পাশে উপজেলা পরিষদ চত্বরে আব্দুর রাজ্জাকসহ পাঁচ জনের মরদেহ রাখা হয়েছে।
প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘একসাথে এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না। আজ এই বাড়িতে হাসি আনন্দে গমগম করবে, সেখানে কান্নার রোল পড়েছে।’
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার বলেন, ‘আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়েছে কয়রায়। ছোট ছেলেরও বিয়ে দিয়েছিল সেখানে। একটি দুর্ঘটনা সব ওলটপালট করে দিল। আশপাশের ৯টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ একে একে ৯ স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে। আজ জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।’
মোংলা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. নুর আলম শেখ বলেন, ‘বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের এতোগুলো মানুষ মারা যাওয়ায় এলাকার সব মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার মানুষ তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, সবার চোখ অশ্রুসিক্ত। এমন মৃত্যুর দায় কার? স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি?’
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের। কনের বাড়িতে বিয়ের পর বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তারা কয়রা থেকে বাগেরহাটের মোংলার উদ্দেশে রওনা হয়। বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৩ জন ওঠেন মাইক্রোবাসে। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় আসলে বিপরীত দিক দিয়ে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হয়।
নিহতরা হলেন– বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, বড় ভাইয়ের স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল ও চার শিশু ফাহিম, আলিফ, আরফা, ইরাম। কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈম।


ছেলে-নববধূকে নিয়ে ফেরার পথে নিহত বিএনপি নেতা ও স্বজনেরা
