টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে দুই উপজেলার তিন ইউনিয়নের ২২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি ঢুকে পড়ে। এতে সদর উপজেলার লস্করপুর ও পইল ইউনিয়ন এবং বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়।
হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় বসতঘর, মাছের ঘের, ফসলি জমি, শাকসবজির ক্ষেত, পোল্ট্রি খামার ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। ভেসে গেছে শতাধিক পুকুরের মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষক, মৎস্যচাষি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়রা জানান, বন্যার পানি থেকে রক্ষা পেতে অনেকে গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, আবার কেউ আশ্রয়কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে বন্যার পানিতে হবিগঞ্জ-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ এলাকা পরিদর্শন করেন হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ।
প্রাথমিক হিসাবে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ও সদর উপজেলার পইল ইউনিয়নেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫০ হেক্টর আউশ ধান, ৫০ হেক্টর শাকসবজি এবং ৮ হেক্টর ফলের বাগান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। মাছের ঘের থেকে মাছ ভেসে গিয়ে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। এছাড়া হাঁস-মুরগি, পোল্ট্রি খামার ও ছোট ছোট সিরামিক কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং বানভাসিদের জন্য শুকনো খাবারসহ ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবর্তে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ও নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন।
এদিকে লস্করপুর ইউনিয়নের কিছু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করলেও সেই পানি পাশের পইল ও বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকায় প্রবেশ করছে। এতে দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন বানভাসিরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলন ও বাঁধের কাজে অনিয়মের কারণে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তারা দ্রুত বাঁধ সংস্কার ও ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
খোয়াই নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার অন্যান্য নদ-নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষি অফিসার মাকসুদুল আলম বলেন, ‘বাঁধ ভাঙার কারণে এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় ৪৫০ হেক্টর আউস আবাদ পানিতে ডুবে গেছে। শ্বাক-সবজির জমি প্রায় ৮৫ হেক্টর এবং ফল বাগান প্রায় ৮ হেক্টর পানিতে ডুবে গেছে। এ ছাড়া কৃষকদের কুল বাগান, আম বাগানসহ মিশ্র ফলফলাদির বাগান এগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে।’
এই কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করতে আমাদের দুই থেকে তিনদিন সময় লাগবে। পানির নামার পর আমরা বুঝতে পারব ক্ষতির হারটা শতকরা কত। এ ছাড়া কৃষকদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এতে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে চূাড়ান্ত ক্ষতি নির্নয় করে সরকারের কাছে আমরা প্রতিবেদন পাঠাব।’



