মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সার ও কাঁচামাল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছ। এতে বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। সার উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের প্রধান টোরে হোলসেদার সতর্ক করেছেন, এতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ বিলিয়ন খাবারের সমপরিমাণ উৎপাদন কমে যেতে পারে। এই বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর কৃষি অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের বড় অংশ নির্ভর করে আমদানিকৃত সারের ওপর। বিশেষ করে ইউরিয়া, ডিএপি ও পটাশ। এই সারগুলোর একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য বা সেই রুট দিয়ে আসে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বাজারে সারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়বে। এতে কৃষকের জন্য সারের প্রাপ্যতা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
ফসলে সারের ব্যবহার কম করলে সরাসরি ফলনে ধাক্কা লাগে। বোরো মৌসুমে সার ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। যদি সরবরাহ কমে বা দাম বেড়ে যায়, কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন। এতে ধানের ফলন কমে যেতে পারে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
এ সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে দেখা নাও যেতে পারে। এখন যে ধান রোপণ করা হচ্ছে, তার ফলন কম হলে প্রভাব দেখা যাবে ৪ থেকে ৬ মাস পরে। এতে চাল, ডাল, সবজি—সবকিছুর দাম বাড়তে পারে
বিশ্ব খাদ্য সহায়তা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম এরইমধ্যে সতর্ক করেছে যে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। বাংলাদেশে একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনও নিম্ন বা নিম্ন-মধ্য আয়ের। খাদ্যের দাম বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে অপুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে।
যদি বৈশ্বিকভাবে খাদ্যের ঘাটতি তৈরি হয়, ধনী দেশগুলো বেশি দামে খাদ্য কিনবে। সেই খাবার বাংলাদেশকে বেশি দামে আমদানি করতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও খাদ্য ভর্তুকি বাড়াতে সরকারের ওপর চাপ পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য বড় কিছু চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। যেমন, পর্যাপ্ত সার আমদানি নিশ্চিত করা, ভর্তুকি বাড়িয়ে কৃষকদের সহায়তা করা, খাদ্য মজুদ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কর্মসূচি বাড়ানো।
যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে সার সংকট দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে। এতে পরবর্তীতে কয়েক মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন কমতে পারে। ফলে আমদানি নির্ভরতা আরও বাড়বে। এভাবে চলতে থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় জাতীয় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
সার সংকট শুধু কৃষির সমস্যা নয়—এটি অর্থনীতি, বাজার এবং মানুষের জীবিকার সাথে সরাসরি যুক্ত। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের এই ধাক্কা বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন হ্রাস এবং সামাজিক চাপ—সবকিছুকে একসাথে বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও বাংলাদেশে সরাসরি দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি এখনই নেই, কিন্তু “নীরব সংকট” তৈরি হতে পারে। যেখানে বাজারে খাবার থাকবে, কিন্তু অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পরিকল্পনা, বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের সহায়তা—এগুলোই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



