চলচ্চিত্র নির্মাতা স্যার ক্রিস্টোফার নোলানের সর্বশেষ সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’ বক্স অফিসে ঝড় তোলার পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। তবে এই সিনেমা নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নন একজন—তিনি এমিলি উইলসন।
২০১৭ সালে মহাকবি হোমারের মহাকাব্য ‘ওডিসি’র ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন একাডেমিক এমিলি উইলসন। সেই অনুবাদ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে নোলান তাঁর চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন বলে একাধিক সাক্ষাৎকারে জানান। তবে সিনেমাটি দেখার পর এক তীব্র আক্রমণাত্মক রিভিউ লিখেছেন উইলসন।
লন্ডন রিভিউ অব বুকসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে উইলসন লিখেছেন, ‘এই চিত্রনাট্যের যেকোনো একটি অংশ নিজের লেখা বলে পরিচয় দিতেও আমার লজ্জা বোধ হচ্ছে।’
পাশাপাশি সিনেমাটির গল্প বলার কৌশলকে তিনি সস্তা চটকদার বলে অভিহিত করেছেন।
উইলসন আরও লেখেন, ‘চিত্রনাট্যের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ছবির কোনো চরিত্রের কথাবার্তা বা আচরণের পেছনে কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ নেই। সিনেমায় কোনো যৌন দৃশ্য নেই এবং খাবারের দৃশ্যগুলোও দেখতে জঘন্য লেগেছে।’
তাঁর মতে, সিনেমাটিতে মনস্তাত্ত্বিক, আবেগীয়, রাজনৈতিক বা নৈতিক গভীরতার অভাব রয়েছে। তবে ক্রিস্টোফার নোলানের এই কাজ যে হোমারের মূল মহাকাব্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ফেরাতে সাহায্য করেছে, তা-ও স্বীকার করেছেন উইলসন।
এমিলি উইলসন উল্লেখ করেন, ‘তারপরও দ্য ওডিসি মুক্তি পাওয়াটা আনন্দের একটি ঘটনা। এই মহাকাব্যটি দর্শককে সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনছে... আমার অনূদিত বইসহ ওডিসির অন্যান্য অনুবাদ হু হু করে বিক্রি হচ্ছে। হয়তো এই সিনেমার কারণে বিভিন্ন কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের সাহিত্য, ভাষা ও ইতিহাস বিভাগগুলো বন্ধ করা থেকে পিছিয়ে আসবে। নোলান সাধারণ মানুষকে আবার বইমুখী করার সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন এবং সে জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।’
তবে তিন ঘণ্টার এই বিশাল বাজেটের সিনেমাটি নিয়ে উইলসন হতাশাই বেশি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আশা ছিল, হোমারের এই থিমের সঙ্গে নোলানের সংযোগ তাঁকে নতুন এক সৃজনশীল উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং আরও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। কিন্তু দ্য ওডিসি-তে নোলানের সেই পরিচিত আড়ম্বর আর উপরিভাগের উপস্থাপনই ফুটে উঠেছে। সিনেমাটিতে বড় বড় ধারণা প্রকাশের কথা বলা হলেও এতে বিভ্রান্তিকর ভাবনা ও দুর্বল চরিত্রের উপস্থিতি দেখা গেছে। অবশ্য বড় ধরনের বিস্ফোরণ আর বড় আকারের দানব দেখানোর ক্ষেত্রে ছবিটি বেশ সফল।’
নোলানের অন্যান্য সিনেমার তুলনায় এতে নারী চরিত্রের সংখ্যা বেশি হলেও মূল কাব্যের মতো তারা সংলাপে বা ব্যক্তিত্বে তেমন কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি বলে দাবি করেন উইলসন।
সিনেমা মুক্তির প্রচারাভিযানে নোলান নিজেই সাময়িকী এম্পায়ারকে জানিয়েছিলেন, উইলসনের অনুবাদের প্রথম লাইন অনুসরণ করেই তিনি মূল চরিত্র অডেসিয়াসের ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। সিনেমাটিতে অডেসিয়াস চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন।
উইলসনের এমন সমালোচনার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে চলচ্চিত্র সমালোচকদের মূল্যায়নে। আন্তর্জাতিক অধিকাংশ ফিল্ম ক্রিটিক সিনেমাটিকে ভূয়সী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। ২০২৩ সালের অস্কারজয়ী ‘ওপেনহাইমার’-এর পর এটি নোলানের প্রথম সিনেমা।
দ্য টেলিগ্রাফ সিনেমাটিকে ‘বছরের সেরা ছবি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। মেট্রো পত্রিকা লিখেছে, এই সিনেমা ‘চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ চিরতরে বদলে দেবে’। দ্য টাইমস একে ‘সব দিক থেকে এক মাস্টারপিস’ বলেছে এবং স্ট্যান্ডার্ড একে ‘চলচ্চিত্রের এক বিশাল সৃষ্টি’ বলে প্রশংসা করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন, জেনডায়া, টম হোল্যান্ড, রবার্ট প্যাটিনসন, অ্যান হ্যাথাওয়ে, শার্লিজ থেরন এবং লুপিতা নিওঙ্গো। ট্রজান যুদ্ধ শেষে গ্রিক রাজা অডেসিয়াসের (ম্যাট ডেমন) নিজের রাজ্য ইথাকায় ফেরার দীর্ঘ ও বিপজ্জনক সফর এবং স্ত্রী (অ্যান হ্যাথাওয়ে) ও ছেলেকে (টম হোল্যান্ড) উদ্ধারের গল্প তুলে ধরা হয়েছে সিনেমাটিতে।



