প্রায় এক দশক আগে বলিউড কাঁপানো কঙ্গনা রানাউত ও হৃতিক রোশনের চরম তিক্ততার গল্প ফের ইন্টারনেটে গরম খবর হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি এখন অন্যতম শীর্ষ আলোচনার বিষয়।
এই সুপ্ত আগ্নেয়গিরি নতুন করে জেগে ওঠার কারণ কঙ্গনার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য। ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন নিয়ে দেওয়া তাঁর একটি মন্তব্যের জেরে কীভাবে যেন হৃতিক রোশনও এই আলোচনায় চলে এলেন।
এরপরই ঝড়ের গতিতে ‘#SorryHrithik’ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং হতে শুরু করে, পুরনো ইন্টারভিউগুলো আবার সামনে আসে এবং দুই তারকাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখ খোলেন। ফলে বলিপাড়ার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এই বিতর্ক ফের আলোচনায়। কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল এই বিতর্ক?
সবকিছুর শুরু কীভাবে?
২০১০ সালে ‘কাইটস’ সিনেমায় প্রথম একসঙ্গে কাজ করেন হৃতিক রোশন ও কঙ্গনা রানাউত। এরপর ২০১৩ সালের নভেম্বরে মুক্তি পায় ব্লকবাস্টার ‘কৃশ ৩’। এতেও এক সঙ্গে কাজ করেছেন দুই তারকা। সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পরপরই গুঞ্জন ছড়ায়—পর্দার বাইরেও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন এই দুই তারকা। তবে সে সময় হৃতিক কিংবা কঙ্গনা—কেউই প্রকাশ্যে এ নিয়ে মুখ খোলেননি।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এক বিতর্ক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ‘আশিকি ৩’ সিনেমা থেকে বাদ পড়ার পর এক সাক্ষাৎকারে কঙ্গনা নাম না করে একজন প্রাক্তনকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি জানি না প্রাক্তনরা মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য কেন এত বোকামি করে।’
কঙ্গনা কোথাও হৃতিকের নাম বলেননি। কিন্তু তারপরও সেই ‘সিলি এক্স’ মন্তব্যটি সরাসরি হৃতিকের দিকেই ইঙ্গিত করে করা হয়েছে বলেই ধরে নেয় সবাই। আর মুহূর্তেই তা খবরের শিরোনামে চলে আসে।
সে সময় প্রতিক্রিয়া জানাতে একদমই সময় নেননি হৃতিক রোশন। সম্পর্ক থাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘সংবাদমাধ্যমে যেসব নারীদের নাম আসছে, তাঁদের কারও সঙ্গে প্রেম থাকার চেয়ে পোপের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি!’
এর পরপরই কঙ্গনাকে একটি আইনি নোটিশ পাঠান হৃতিক। সেই নোটিশে বলা হয়, কঙ্গনাকে লিখিতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে এবং মন্তব্যটি প্রত্যাহার করতে হবে। কঙ্গনা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে পাল্টা আইনি নোটিশ পাঠান। এরপর বিষয়টি আর শুধু সাক্ষাৎকার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ইমেইল বিতর্ক
লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন আলোচনার মূল কেন্দ্রে চলে আসে হৃতিক ও কঙ্গনার মধ্যকার ইমেইল চালাচালির খবর। হৃতিকের দাবি ছিল, তাঁর নামে যেসব ইমেইল পাঠানো হয়েছে, সেগুলো এমন একটি অ্যাকাউন্ট থেকে গেছে যা তিনি ব্যবহার করেননি এবং কেউ হৃতিকের ভুয়া পরিচয় বানিয়ে তা করেছে। অন্যদিকে, কঙ্গনা তাঁর দাবিতে অনড় থেকে জানান, হৃতিকের সঙ্গে তাঁর সত্যি প্রেম ছিল।
পরে বিতর্কিত এসব ইমেইলই পুলিশি তদন্তের মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে ফেসবুক বার্তায় দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দেন হৃতিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুইজন জনপ্রিয় তারকার মধ্যে এতদিন ধরে প্রেম কীভাবে চলতে পারে, যেখানে তাঁদের একটিও ছবি, প্রত্যক্ষদর্শী বা কোনো প্রমাণ নেই? প্যারিসে কঙ্গনার দাবি করা কথিত এনগেজমেন্টের কথা নাকচ করে দিতে তিনি নিজের পাসপোর্টের ট্রাভেল রেকর্ডও তুলে ধরেন।
পুলিশি তদন্ত
মামলাটি প্রথমে মুম্বাই পুলিশের সাইবার সেল তদন্ত করে। পরবর্তীতে তা স্থানান্তর করা হয় মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের ক্রাইম ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে। তদন্তকারীরা ইমেইল এবং যেসব ইলেকট্রনিক ডিভাইস জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো খতিয়ে দেখেন। অভিযোগ দায়েরের প্রায় পাঁচ বছর পর হৃতিক নিজে মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের কার্যালয়ে গিয়ে বয়ান রেকর্ড করেন, যা ঘটনাটিতে আবার নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
পুরো তদন্তজুড়েই দুই তারকা যাঁর যাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ভুয়া ইমেইল সংক্রান্ত হৃতিকের অভিযোগের বিষয়ে মুম্বাই পুলিশ আদালতের কাছে ক্লোজার রিপোর্ট জমা দেয়। এই রিপোর্টের মাধ্যমে ইমেইল সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে পুলিশি তদন্তের ইতি ঘটে। তবে হৃতিক ও কঙ্গনার প্রেমের সম্পর্কের দাবি নিয়ে যে বাদানুবাদ ছিল, তার চূড়ান্ত সত্যতা এতেও স্পষ্ট হয়নি।
২০১৬ সালের স্মৃতিতে কঙ্গনা
২০২৬ সালের শুরুতেই ইনস্টাগ্রামে ‘2026 is the new 2016’ ট্রেডিশনে অংশ নিয়ে ২০১৬ সালের স্মৃতিচারণ করেন কঙ্গনা। প্রথম পোস্টে হৃতিকের নাম না নিয়েও কঙ্গনা বলেন, ২০১৬ সাল ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন এক সময়। আইনি নোটিশ পাওয়া এবং বছরের পর বছর আইনি লড়াই ও মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়ার স্মৃতি তিনি আবার স্মরণ করেন।
বিতর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয় যখন সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাসের সঙ্গে কঙ্গনার একটি মন্তব্যের জেরে বাকযুদ্ধ বাঁধে। কঙ্গনার মন্তব্যের জবাবে সৌরভ রসিকতা করে বলেন, ‘আমার বন্ধুরা বলে আমাকে নাকি তরুণ বয়সের হৃতিক রোশনের মতো দেখতে। হয়তো সে কারণেই কঙ্গনা আমাকে আক্রমণ করছেন।’
মন্তব্যটি মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং ২০১৬ সালের হৃতিক-কঙ্গনা দ্বন্দ্ব নিয়ে ইন্টারনেট ট্রোল ও মিম আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রাতারাতি এক্স, ইনস্টাগ্রাম ও রেডিটে ‘আমাদের হৃতিক রোশনের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত’ এবং ‘#SorryHrithik’ ট্রেন্ড শুরু হয়ে যায়।
ক্যানভাস যখন গরম, লেখক ফ্রেডি বার্ডি ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ‘হৃতিক রোশনের কাছে পুরো বিশ্ব ঋণী এবং তাঁর কাছে সবার ক্ষমা চাওয়া উচিত।’
হৃতিক নিচে মন্তব্য করলেও অন্ধের মতো ভক্তদের সেই আন্দোলন সমর্থন করতে নিষেধ করেন। তিনি লেখেন, ‘আমার বন্ধু, শুধুই 'B' কে পছন্দ করো না বলে 'A' এর পক্ষ নেওয়াটা আমাদের সমাজের সিস্টেমেটিক সমস্যার অংশ। আমি সেই সময়টার জন্য অপেক্ষা করব যখন আলোচনাটি সঠিক প্রেক্ষিতে এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হবে।’
কঙ্গনার তোপ
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হৃতিকের কমেন্টের রিপোর্ট শেয়ার করে নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে এক কড়া বার্তা দেন কঙ্গনা।
কঙ্গনা লেখেন, ‘প্রিয় হৃতিক, আমি আনন্দিত যে তুমি তোমার সঠিক জীবনসঙ্গী সাবা আজাদকে খুঁজে পেয়েছ এবং তোমাদের দারুণ মানায়ও। তুমি এখন একটি সম্পর্কের মধ্যে আছ, তাই এভাবে এক নারীকে নিয়ে খোঁচা মারা তোমাকে মানায় না। বরং তোমার উচিত যারা তোমার নাম ভাঙিয়ে আমাকে বুলিং ও হেনস্তা করছে তাদের নিন্দা জানানো। আগুনে ঘি ঢালা বন্ধ করো এবং সঙ্গীকে লজ্জিত করো না। আশা করি বুদ্ধির উদয় হবে এবং অহেতুক মন্তব্য করা বন্ধ করবে।’
হৃতিক রোশনের দায়ের করা মামলার পুলিশি তদন্ত শেষ হলেও, দুই তারকা এখনো তাঁদের নিজ নিজ অবস্থানে অটল আছেন। ফলে এক দশক পার হয়ে গেলেও এই কঙ্গনা-হৃতিক বিতর্ক আজও বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।



