
আমেরিকার চিরচেনা রূপ দেখা যাবে না। উল্টো এমন এক আমেরিকার দেখা মিলবে, যেখানে একজন নির্দ্বিধায় গুলি করে মেরে ফেলছে আরেকজনকে। টায়ারে বেঁধে একজন মানুষের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়াটাও স্বাভাবিক সেখানে। হাতে হাতে বন্দুক এই আমেরিকায়। আছে একনায়কও। সব মিলিয়ে গৃহযুদ্ধের মোড়কে এমন এক আমেরিকার দেখা পাওয়া যাবে, যা এখন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না!
এমনই এক কল্পিত আমেরিকার দেখা পাওয়া যাবে ‘সিভিল ওয়ার’ ছবিতে। গত এপ্রিলে হলিউডের এই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। ৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এই সিনেমা বেশ ব্যবসাও করেছে। এখনও পর্যন্ত ১২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে ছবিটি। বর্তমানে অ্যাপল টিভিতে এই সিনেমাটি দেখা যাচ্ছে।

চলতি বছরে হলিউডে মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘সিভিল ওয়ার’ বেশ আলোচিত। এত আলোচনার জন্মের কারণ হলো এর গল্প বা প্লট। প্রথম দৃশ্যেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ভাষণ দেওয়া দেখা হয়। সেখানে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর দেন প্রেসিডেন্ট। তবে এই প্রতিপক্ষ অন্য কোনো দেশের নয়, বরং নিজের দেশেরই অন্য রাজ্যের বিরোধীদের। তাদের ওপরই বিমানহামলা করা হচ্ছে, বোমাও ফেলা হচ্ছে দেদারসে। এভাবেই প্রেসিডেন্টের দেওয়া ‘বিজয়’-এর সংবাদের মধ্যেই শোনা যায় আমেরিকাজুড়ে চলা গৃহযুদ্ধের ডঙ্কা। এর মধ্যেই কয়েকজন সাংবাদিক চান প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকার নিতে, যদিও তা নেওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই তাদের সহকর্মীদের বিশ্বাস। তবু তারা প্রায় হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এই যুদ্ধের মধ্যেই ওয়াশিংটন ডিসির দিকে যাত্রা শুরু করেন। আর এভাবেই শুরু হয় সিনেমার বয়ে চলা।
সিভিল ওয়ার ছবিতে খুবই বাস্তবিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি ও সেই সময়ের নৃশংসতা। পুরোপুরি ডিসটোপিয়ান একটি প্লটে বাস্তবের আবহ এতটা নিদারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা কঠিন বটে। তবে সেই কাজটিই অবলীলায় করেছেন পরিচালক অ্যালেক্স গারল্যান্ড। ছবিটির সিনেম্যাটোগ্রাফি ও সাউন্ড ডিজাইন দুর্দান্ত ছিল। অত্যন্ত সাবলীল ছিল অভিনয়শিল্পীদের পারফরম্যান্সও।

সিনেমায় মূল চরিত্র মূলত তিনটি। চরিত্রগুলো হলো—বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক লি, জোয়েল ও সাংবাদিকতার হাতেখড়ি নিতে চাওয়া জেসি। চরিত্রগুলোকে পর্দায় রূপ দিয়েছেন যথাক্রমে কারস্টেন ডানস্ট, ওয়াগনার মোরা ও কেলি স্প্যানি। কারস্টেনের অভিনয় নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এমন একজন ভাবলেশহীন সাংবাদিকের চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, যিনি কিনা বোমার বিস্ফোরণ থেকে বাঁচার পরপরই ক্যামেরা হাতে অকুস্থলে নেমে যান ধ্বংস ও রক্তের ছবি তুলতে। মানুষের মৃত্যু তাকে বিচলিত করতে পারে না খুব একটা। অন্যদিকে জোয়েল সাংবাদিক হিসেবে যুদ্ধকে কখনো এড়িয়ে চলতে চায় না, বরং আরও সম্পৃক্ত হতে চায়। আর জেসি যেন আরেক লি হয়ে ওঠার সংগ্রাম করছে। এই তিনটি চরিত্র পুরো সিনেমায় পুরোপুরি সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। কারও অভিনয়ে মেদ ছিল না। ফলে দর্শক হিসেবে সিনেমার প্লটের সঙ্গে অভিনয়শিল্পীদের নৈপুণ্য মেলাতে কখনো ধাক্কা খেতে হয় না। যুদ্ধের উত্তেজনার সাথে সুন্দরভাবে মিশে যায় শিল্পীদের অভিনয়।

সিনেমাটি নিয়ে সমালোচকদের আলোচনা উল্লেখযোগ্য। এই আলোচনার প্রধান একটি কারণ হলো এর গল্প। সারা বিশ্বকে গণতন্ত্রের সবক দেওয়া সামরিকভাবে অত্যন্ত উন্নত একটি দেশে যদি একনায়কতন্ত্র আসে, তবে পরিস্থিতি আসলে কেমন হবে! এই সিনেমায় যেমন আমেরিকার বহুবিভক্ত সমাজের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, তেমনি আছে বর্ণবাদ ও সব কিছু থেকে সরে গিয়ে উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থাকার প্রবণতার উল্লেখও। সিভিল ওয়ার দেখতেই দেখতেই বোঝা হয়ে যায় যে, দিন শেষে সংঘাতে গুলি-বোমা সবই আসলে চলে কোনো কারণ না জেনেই! যে গুলি ছোঁড়ে, সে শুধু জানে কেউ তাকে হত্যা করতে চাইছে। আর কিছু না। এভাবেই চলে যুদ্ধের ময়দানের হত্যা ও পাল্টা হত্যা।
সিভিল ওয়ার-এর একটি দৃশ্যে খুবই ছোট একটি চরিত্রে ছিলেন জেসি প্লেমনস। তবে গণহত্যার পর লাশ গুমের সেই দৃশ্যটি এই সিনেমার শ্রেষ্ঠ দৃশ্য। হাতে বন্দুক থাকলে, হত্যা করার লাইসেন্স থাকলে, একটা মানুষ আরেকজনকে কতটা তুচ্ছ কারণে হত্যা করতে পারে, তার প্রামাণ্য দলিল হয়ে থাকবে এই দৃশ্য।
সব মিলিয়ে ‘সিভিল ওয়ার’ আপনাকে দেবে নতুন স্বাদ। যুদ্ধের উত্তেজনা আপনাকে পেয়ে বসবে পুরোপুরি। আর শেষটায় হয়তো পাবেন কঠোর বাস্তবতার মোড়কে বিষণ্ণ বোধোদয়ের এক মিশ্র অনুভূতি। তবে দর্শক হিসেবে আপনার ১০৯ মিনিট খরচা করা যে জলে যাবে না, সেটি নিশ্চিত।
রেটিং: ৪.৬/ ৫.০০



