এক বাক্যে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন বটে। পরিবারের বাইরে আনন্দ কিংবা দুঃখে আপনার পাশে যে বা যারা থাকলে প্রশান্তি মেলে তিনি বন্ধু। জীবনের নানা অধ্যায়ে, বিভিন্ন বয়সে, ভিন্ন কর্মকাণ্ডে বারবারই সামনে আসে বন্ধুত্ব। তাই তো বন্ধুত্বের অসাধারণ সব গল্প নিয়ে লেখা হয়েছে গল্প, বানানো হয়েছে সিনেমা এবং সিরিজ। চলুন বন্ধু দিবসে এমন পাঁচটি সিরিজ সম্পর্কে জানা যাক।
ফ্রেন্ডস
টেলিভিশন সিটকম ফ্রেন্ডসকে বলা হয় সর্বকালের সেরা সিরিজের অন্যতম। নব্বই দশকের সাড়া জাগানো এই সিরিজ এখনো সমান জনপ্রিয়। ফ্রেন্ডস নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এই ক্ল্যাসিক কমেডি সিরিজটি দেখেননি এমন মানুষ কমই আছেন। রস, র্যাচেল, মনিকা, ফিবি, চ্যান্ডলার আর জোয়ি– এই ছয় বন্ধুর বন্ধুত্ব আর খুনসুটি দেখে আপ্লুত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।
নিউইয়র্কের মতো ব্যস্ত শহরে নিজ নিজ কাজের বাইরে বেশির ভাগ সময়ই ছয় বন্ধুকে আড্ডা, হাসি-তামাশা করেই কাটিয়ে দিতে দেখা যায়। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের নানা মজার ঘটনা নিয়েই মূলত ফ্রেন্ডস। বন্ধুত্ব শব্দটি আপনাকে নতুন করে ভাবাবে এই সিরিজটি।
১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সম্প্রচার হওয়া দশ সিজনের এই সিটকমটি নির্মাণ করেছেন ডেভিড ক্রেন ও মার্টা কফম্যান। ফ্রেন্ডসের মাঝে আপনি খুঁজে পাবেন নিজেকে, নিজের বন্ধুদের আর বন্ধুত্বকে। এ যেন আপনার চেনা বন্ধুদের গল্প। বিশ্বে সর্বাধিক বার দেখা সিরিজগুলোর মধ্যে অন্যতম ফ্রেন্ডস। বিভিন্ন সংস্থার করা সর্বকালের সেরা টেলিভিশন অনুষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে ফ্রেন্ডসের নাম।
দ্য বিগ ব্যাং থিওরি
তুমুল জনপ্রিয় সিটকম 'দ্য বিগ ব্যাং থিওরি' বন্ধুত্বের চমৎকার চিাত্রায়ন। ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডেনা শহরের দুই অতিপ্রতিভাধর তরুণ পদার্থ বিজ্ঞানী ও তাদের নিকটতম কয়েকজন বন্ধুর ভিন্ন আঙ্গিকে দেখা দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র করেই এই গল্প। শেলডন, লেওনার্ড, হাওয়ার্ড আর রাজের বন্ধুত্ব, হিউমার এবং অদ্ভুত কার্যকলাপ দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সিরিজে। তাঁদের বন্ধুত্বে নতুন মাত্রা দেয় প্রতিবেশী পেনি।
১২টি সিজনের এ সিরিজের প্রায় প্রতিটি পর্বেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চমক। দ্য বিগ ব্যাং থিওরি নির্মাণ করেছেন মার্ক চেন্ড্রোওস্কি। চিত্রনাট্য লিখেছেন বেশ কয়েকজন প্রতিভাধর লেখক। তাঁদের কেউ টিভি শো নির্মাতা, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, কেউ প্রকৌশলী, আর কেউবা সাহিত্যিক।
কেন্দ্রীয় চরিত্র শেল্ডনের অদ্ভুত স্বভাব ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিজ্ঞানের যোগ সিরিজটিকে অনন্য করে তুলেছে। শেল্ডন কুপার চরিত্রটি এতটা জনপ্রিয়তা পায় যে, বিগ ব্যাং থিওরি শেষ হলে 'ইয়ং শেল্ডন' নামে একটি সিরিজ বানানো হয়। যেখানে শেল্ডনের শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। এই সিরিজটিও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
হাউ আই মেট ইওর মাদার
রোমান্সের সঙ্গে কমেডি, হিউমার আর বন্ধুত্বের মিশেলে নির্মিত জনপ্রিয় সিটকম ‘হাউ আই মেট ইওর মাদার’। গল্পের শুরুতেই দেখানো হয় সিরিজের অন্যতম চরিত্র টেড মোজবি ২০৩০ সালে তাঁর ছেলে ও মেয়েকে একটি গল্প শোনায়। গল্পের বিষয়বস্তু হলো, কীভাবে স্ত্রী ট্রেসির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর।
গল্প শুরু ২০০৫ সালে। তখন টেড ছিল ২৭ বছর বয়সী একজন স্থপতি। বন্ধু মার্শাল ও লিলিসহ তাঁরা নিউইয়র্কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকত। এই সিরিজের আরও দুটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে বার্নি এবং রবিন। এই পাঁচ বন্ধুর দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন মজার ঘটনা নিয়ে এগিয়ে যায় গল্প।
৯ সিজনের ‘হাউ আই মেট ইওর মাদার’ নির্মাণ করেছেন কার্টার বেস ও ক্রেগ থমাস। শেষদিকের কয়েক সিজনে দর্শক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখালেও জনপ্রিয় সিরিজের তালিকায় এটি শুরুর দিকেই থাকবে।
স্ট্রেঞ্জার থিংস
‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ বর্তমান সময়কার একটি জনপ্রিয় সিরিজ। সায়েন্স ফিকশন ও হরর জঁরার মিশেলে নির্মিত সিরিজটি। প্রথম সিজনের সফলতা ও জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় সিরিজটির মোট চারটি সিজন বানানো হয়। সিরিজটি নির্মাণ করেছেন ডাফার ব্রাদার্স।
কাহিনির প্রেক্ষাপট আশির দশক। এক ছুটির দিনে মাইকের বাসায় এসে খেলছিল ওর তিন বন্ধু উইল, ডাস্টিন ও লুকাস। খেলা শেষে রাতে বাড়ি ফেরার পথে রহস্যময়ভাবে উইল নিখোঁজ হয়। উইলের বন্ধুরা হন্যে হয়ে ওকে খুঁজতে শুরু করে। উইলের নিখোঁজ হওয়ার প্রায় পরপরই দৃশ্যপটে আসে অদ্ভুত স্বভাবের একটি মেয়ে। মেয়েটির কিছু অতিমানবীয় ক্ষমতাও আছে। এই মেয়েটির কে, উইলের নিখোঁজ হওয়ার সাথে কি এই মেয়ের কোনো যোগ আছে? অন্যদিকে উইলের মা ও বড় ভাইও খুঁজছে উইলকে। একপর্যায়ে তারা আবিষ্কার করল তাদের ছোট্ট শহর হকিন্সের বিভিন্ন জায়গায় অস্বাভাবিক, অদ্ভুত ও বিপদজনক কিছু কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। এভাবেই এগোয় সিরিজের গল্প।
২০১৬ সালে স্ট্রেঞ্জার থিংস মুক্তির আগে পরিচালকদ্বয় জানান, স্টিভেন স্পিলবার্গ, জন কার্পেন্টার এবং স্টিফেন কিংয়ের বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকর্ম তাদের এই সিরিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। সিরিজে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশু শিল্পীদের দুর্দান্ত অভিনয়, রহস্যময় চিত্রনাট্য ও অসাধারণ নির্মাণশৈলি স্ট্রেঞ্জার থিংসকে উপভোগ্য ও জনপ্রিয় একটি সিরিজে পরিণত করেছে।
লিভিং সিঙ্গেল
নব্বইয়ের দশকে যেসব টিভি সিরিজ দর্শককে মুগ্ধ করে রেখেছিল লিভিং সিঙ্গেল সেগুলোর অন্যমত। লিভিং সিঙ্গেলের গল্প তিন নারী বন্ধুকে ঘিরে, যারা নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। সবাই যার যার মতো স্বাধীন পেশায় কাজ করেন। তবে তাঁদের মধ্যে খাদিজা জেমস চরিত্রটি গল্পের মূল অনুঘোটক। ব্রুকলিনের একই ভবনের আলাদা আরেকটি অ্যাপার্টমেন্ট থাকেন সিরিজের অন্যপ্রধান দুই পুরুষ চরিত্র। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ডেক্সটার নাইট আলাদা থাকেন।
ছয় চরিত্রের সবার বয়স বিশের কোটায়, অবিবাহিত। সবাই ছোটবেলা থেকে পরিচিত। এখন নিউইয়র্কে থাকলেও বেড়ে উঠেছেন ওহাইওতে। খাদিজা পেশায় একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক। শহুরে জীবন কেন্দ্রীক সাময়িকীটি ফিকশন ধর্মী। বর্ণবাদ থেকে শুরু করে নাগরিক অধিকার, নারীবাদ সমসাময়িক নানান চিন্তার প্রতিফল আছে এতে।
পাঁচ সিজনের এই সিরিজটি সমসাময়িক অন্য সিরিজগুলোর চেয়ে বিভিন্নভাবে আলাদা ছিল। এর ছয় কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্যে সবাই ছিল কৃঞ্চাঙ্গ। এমনকি এর নির্মাতা ইভেট ডেনিস লি বাউসারও ছিলেন একজন কৃঞ্চাঙ্গ নারী। লিভিং সিঙ্গেলে স্বাধীন কৃঞ্চাঙ্গ নারীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা দিকে আলো ফেলা হয়েছে। এর প্রতিটি সিজন তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সিরিজটি মার্কিন সমাজকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। বলা হয়ে থাকে, থাকে ১৯৯৪ সালে 'ফ্রেন্ডস' সিরিজটি শুরু না হলে লিভিং সিঙ্গেলের জনপ্রিয়তা কোথায় পৌঁছাত তা কল্পনা করা যায় না।
তথ্যসূত্র: কসমোপলিটন, ভ্যারাইটি, রোটেন টোমাটোস



