গত বৃহস্পতিবার ভারতে বিরল একটি ভাইরাসের দুটি সংক্রমণ শনাক্তের কথা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ভাইরাসটির নাম নিপাহ। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের অর্ধেকই মারা যায়। এটি ও হাম একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তবে নিপাহ হামের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী বলে জানানো হয়েছে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে।
যেভাবে ছড়ায়
নিপাহ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত আক্রান্ত শূকর বা বাদুড়ের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া আক্রান্ত বাদুড়ের মূত্র বা লালায় দূষিত ফল বা ফলজাত পণ্য—যেমন কাঁচা খেজুরের রস খেলে নিপাহ আক্রান্তের ঝুঁকি থাকে। আবার এটি মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে।
যেভাবে বুঝবেন
আপনি আক্রান্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নিপাহ আক্রান্ত হলে এর লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৪ থেকে ১৪ দিন সময় লাগতে পারে। এর প্রাথমিক লক্ষণ অনেকটা ফ্লুর মতো। এর ফলে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, বমি ও গলাব্যথা হতে পারে। সাধারণত দুই-তৃতীয়াংশ রোগীর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হতে পারে এবং তাঁরা ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে কোামায় চলে যেতে পারেন। আবার অনেকের শ্বাসকষ্টের সঙ্গে কাশিও হতে পারে।
মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র নিপাহকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা বায়োসেফটি লেভেল ফোর শ্রেণিভুক্ত করেছে। ইবোলাও একই শ্রেণিভুক্ত। নিপাহকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এর অবশ্য বেশ কিছু কারণও আছে। যেমন: এতে মৃত্যুহার অনেক বেশি, মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ক্ষমতা, দ্রুত প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা এবং অনুমোদিত টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা না থাকা।
বিশেষ ক্ষেত্রে ভাইরাসটি মস্তিষ্কে আক্রমণ করতে পারে। এতে চোখের নড়াচড়া, হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। যাঁরা আক্রান্তের পরও বেঁচে যান, তাঁদের অনেকেরই স্নায়ুতন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয় এবং এটি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
নিপাহর চিকিৎসা কী?
সাধারণত রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে নিপাহ শনাক্ত করা হয়। আগেই বলা হয়েছে, এই ভাইরাসের জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। ফলে চিকিৎসকেরা মূলত সহায়ক চিকিৎসা দেন। যাঁদের স্নায়বিক সমস্যা গুরুতর হয়, তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা দিতে হতে পারে।
এক্ষেত্রে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধকেই চিকিৎসকেরা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রাণী থেকে মানুষের সংক্রমণ কমানো এবং আক্রান্তের সংস্পর্শে আসার সময় কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রাদুর্ভাব কোথায় বেশি?
এশিয়ার কিছু অঞ্চলে প্রায় প্রতি বছরই নিপাহর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এবং সিঙ্গাপুর। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। এর বড় কারণ হলো যেসব বাদুড় এই ভাইরাসের বাহক, সেগুলো এই অঞ্চলের স্থানীয় প্রাণী।
সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে নিপাহ বেশি ছড়াতে পারে। এই সময় বাদুড়ের প্রজনন মৌসুম। পাশাপাশি এই সময়টাতে খেজুরের কাঁচা রস সংগ্রহ করা হয়।
২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৫৪টি নিপাহ সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।



