মা’কে নিয়ে একটা গান শুনছি। শুনতে শুনতে কখন যে দুই চোখে পানি চলে এসেছে তা বুঝতে পারিনি। এমন সময় আমার ছোট মেয়ে আনিসা চিৎকার করে তার মাকে বলে, ‘মা, বাবা দাদুর কথা মনে করে কান্না করছে।’
আমি আনিসার কাছে জানতে চাইলাম, ‘তুমি কীভাবে বুঝলে, আমি মায়ের জন্য কান্না করছি?’ আনিসা উত্তরে বলে, ‘বাবা, আমি জানি তুমি দাদুর জন্য কান্না করছ।’ আসলে, পৃথিবীতে যার মা নেই, সেই-ই বুঝে, তাঁর জীবন কতটা শূন্য, কতটা অপূর্ণ, যা অন্য কোনো কিছুতেই পূরণীয় হওয়ার নয়।
আজ আমি দুই সন্তানের বাবা। বাবা হয়ে নিজেকে নতুনভাবে চিনতে শিখেছি। এখন বুঝতে পারি, একজন মা কত কষ্ট করে সন্তানকে মানুষ করেন। দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেন তিনি। এরপর সেই সন্তানের জন্ম হয়। মা অনেক কষ্ট করে সেই সন্তানকে নিজের মধ্যে লালন করেন। এই সময়টাতে মাকে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার সহ্য করতে হয়। এসব বুঝেছি যখন আমার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হন। শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি আবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তও হয়েছিলেন তিনি। কত কষ্ট তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর একলামসিয়া হয়েছিল আমার স্ত্রীর। সে কী ভয়ানক অবস্থা! একলামসিয়া হওয়ার পর আবার পাইলসের অপারেশন করতে হয়েছিল। ওহ্, সে অনেক কষ্টের কথা!
গর্ভকালীন সময়ে নারীর অস্তিত্বে বড় হতে থাকে সন্তান। এই সময় মায়ের মন মেজাজ ঠিক থাকে না। ঠিকমতো খেতে পারে না, বমির উদ্রেক হয়। এমন হাজারখানেক দোটানার মধ্যে থেকে সন্তানকে জন্ম দেওয়া মানুষটাই মা। গর্ভধারণ, দুধপান, রাত জেগে সন্তানের তত্ত্বাবধানসহ নানাবিধ কষ্ট একমাত্র মা-ই সহ্য করেন। তাই, মায়ের তুলনা অন্য কারো সঙ্গে চলে না। মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ির সম্পর্ক, যা একটু আঘাত পেলেই প্রতিটি মানুষ ‘মা’ বলে চিৎকার দিয়ে জানান দিয়ে থাকে।
২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি মা’কে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। আর বাবাকে হারাই ২০০৯ সালের ১১ মে। বাবার মৃত্যু পর যত না কষ্ট পেয়েছি, তাঁর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কষ্ট পেয়েছি মা’কে হারিয়ে। মায়ের চলে যাওয়ায় মনের ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সারাক্ষণই মনে হয় কী যেন নেই! গত কিছুদিন ধরে নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না। কারণ ১২ মে রোববার মা দিবস। মাকে নিয়ে যতবারই লিখতে বসেছি, ততবার চোখে পানি এসেছে। ঝাপসা চোখে কেবল মায়ের মুখখানিই ভেসে উঠেছে। কী লিখব জানি না। শুধু জানি মা’কে খুব মনে পড়ে, অসম্ভব রকম মনে পড়ে।
মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্যই বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার ‘মা দিবস' হিসেবে পালন করা হয়। যে দিবসের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯১৪ সালের ৮ মে। আমাদের দেশে কয়েক বছর ধরে গণমাধ্যমে বিভিন্ন প্রচারের মাধ্যমে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভরে ওঠে মায়ের সঙ্গে সন্তানদের ছবিতে, নানা লেখায়। এদিনে বিশেষ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে। মাকে নিয়ে বিশেষ প্রবন্ধ প্রকাশ করে পত্র-পত্রিকাগুলো। এ ছাড়া আলোচনা অনুষ্ঠান, র্যালিসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই মা’কে এই দিনে বিশেষ উপহার দিয়ে থাকেন।
আমাদের দেশে মা দিবস নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মতামত। কারও কাছে মা দিবস পালন করাটা এক ধরনের আদিখ্যেতা। আবার কেউ কেউ এই দিনে মায়ের জন্য বিশেষ কিছু করার চেষ্টা করেন। অনেকে আবার এই দিনটির ব্যাপারে কিছু জানেন না। তবে বিশেষ একটি দিন যদি শুধু মায়ের জন্য হয়, তাহলে মন্দ কী! বিশেষ মানুষটির জন্য বিশেষভাবে না হয় দিনটি কাটানো যাবে।
আমার মা ছিলেন গৃহিণী। মায়ের হাতেই হয়েছে আমার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। বাবা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার কারণে থাকতেন তাঁর কর্মস্থলে। রোজ সকালে মা সংসারের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। চার ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম পরিবারের তৃতীয় সন্তান। কখনো কোনো কিছু খেতে ইচ্ছে করলে মা যেন সেটা কেমন করে বুঝে যেতেন। কোন সন্তানের কী পছন্দ, সে অনুযায়ী মা রান্না করতেন।
‘কই বাবা তোরা খেতে আয়’—মায়ের সেই হাঁক-ডাক নয় বছর ধরে আর শুনি না। ভাই-বোনেরা হইচই করতে করতে রান্না ঘরে খেতে বসতাম। মায়ের হাতের গরুর গোশত, খিচুড়ি, ভাপা পিঠার স্বাদ আজও আমার জিভে লেগে আছে। মা মজা করে রান্না করতেন, আমরা তৃপ্তি করে ভাত খেতাম। কত বছর মায়ের হাতের রান্না খাইনি! আগে বাড়িতে গিয়ে রাস্তা থেকে যখন মা মা বলে ডাকতাম, তখন মা বলতেন, ‘আমার পাগলা ছেলেটা এসেছে।’ আজ বাড়িতে গিয়ে আর মা মা বলে ডাকতে পারি না। সে কি কষ্ট!
ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি, আমার মা কীভাবে সংসার, স্বামী, সন্তানদেরকে পাখির ডানার মতো আগলে রেখেছেন। ২০১১ সালে মা ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে তা ব্লাড ক্যানসারে পৌঁছায়। ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি মা মারা যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েও মা সব সময়ই হাসিখুশি ছিলেন। মায়ের স্নেহ ও মমতা আমাকে এখন শুধু কাঁদায়। এখন কেউ আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকে না। খোঁজখবর নেয় না। বলে না, ‘বাবা, তুমি খেয়েছ? কোথায় আছ? কী খেয়েছ? সাবধানে থেকো।’
আজ মা নেই। আমি বুঝি মায়ের অভাব। বিশেষ করে আমার সন্তানদের জন্য। তারা আজ বড় হচ্ছে দাদা–দাদুর ভালবাসা ছাড়াই। আমার বড় মেয়ে আনিসা স্কুলে যায়। সে মাঝে মধ্যে বলে, দাদা–দাদু থাকলে কত ভাল হত! আজ যদি বাবা–মা বেঁচে থাকতেন, তাহলে কতই না খুশি হতেন।
আজকাল কত ছেলে-মেয়ে, পুত্রবধূকে দেখি মায়েদের অযত্ন, অবহেলা করতে। এসব দেখে খুব খারাপ লাগে। যে মা-বাবা আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে, কথা বলতে শিখিয়েছেন, মুখে তুলে দিয়েছেন অন্ন। সেই বাবা-মাকে অনেক সন্তান বৃদ্ধ বয়সে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে।
পৃথিবীর সকল মাকে মা দিবসের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। ভালো থাকুক সকল মা।
লেখক: উপপরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


আমার ‘ম্যাট্রিক ফেল’ মা যেভাবে পাস করিয়েছেন জীবনের পরীক্ষায়
এমন উদার, মহৎ, সর্বংসহা মা কোথাও দেখিনি
মা, সন্তানের প্রথম শিক্ষক
