সরকারি হাসপাতালের অনেক কর্মচারী আঙুলে আঙুলে চিকিৎসক। একজন কর্মচারী বায়োমেট্রিক হাজিরা দেন কয়েকজন চিকিৎসকের। হাসপাতালে দেরিতে যাওয়া চিকিৎসকেরাই এই জালিয়াতিতে জড়িত। এসব বন্ধে সব সরকারি হাসপাতালে ফেইস ডিটেকশন পদ্ধতি চালু করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
ফরিদুপরের সদরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালের স্বাস্থ্য সহকারী আরিফুল ইসলাম। বায়োমেট্রিক মেশিনে আঙুলের ছাপ দিতে বললে রাজি হন। ব্যবহার করলেন ডান হাতের তর্জনী। এবার অন্য আঙুলের ছাপ দিতে বলা হলে রাজি হলেন না। এরপর আশ্রয় নিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ওমর ফয়সালের কক্ষে।
আরিফুল একা তিনজনের আঙুলের ছাপ দেন- এমন তথ্য ডা. ফয়সালকে জানালে, সত্যতা যাচাই না করেই কর্মচারীর পক্ষ নেন তিনি। এদিকে আবারও আরিফুলকে তাঁর বাকি আঙুলের ছাপ দিতে বললে, ঘুরতে থাকেন পুরো হাসপাতাল। একপর্যায়ে হাসপাতাল থেকে সটকে পড়েন আরিফুল।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন আরিফুল শুধু ডা. ওমর ফয়সালের জন্য ফিঙ্গার দেন না, বরং ডা. ওমরের স্ত্রী ওই হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রেজিনা সুলতানা হয়েও প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যেই ফিঙ্গার দেন আরিফুল। এই দুই চিকিৎসকের নামে তাঁর দুটি আঙুল বায়োমেট্রিক মেশিনে রেজিস্ট্রেশন করা। এসব বিষয় জানতে যাওয়া হয় ডা. রেজিনা অফিস কক্ষে।
হাসপাতালে কখন এসেছেন- এমন প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে কিছু না বলে উঠে পড়েন জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রেজিনা সুলতানা। যাওয়ার সময় বলতে থাকেন, ‘আপনি এভাবে আমার ইয়ে করতে পারেন না।’
এদিকে, ডা. ফয়সাল তাঁর নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করতে চান নিজেই। ডা. ওমর ফয়সল বলেন, ‘এটাতে তদন্তের বিষয় রয়েছে। যেহেতু এটা তদন্ত করে দেখা লাগবে, আপনি আমাকে জানিয়েছেন, আমাকে একটু টাইম দিতে হবে। এটা তদন্ত করে দেখব।’
বায়োমেট্রিক মেশিনের সামনে দুটি সিসি ক্যামেরা আছে। ফুটেজ দেখতে চাইলে শুরু হয় টালবাহানা। সিসিটিভি ক্যামেরা চালু আছে কিনা জানতে চাইলে ওইখানে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তার জানান সেটি চালু আছে।
ডা. ওমর ফয়সল বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে গেলে রাউটার লাগবে। কিন্তু সেটা তো নাই আমার এখন।’ ফুটেজ পাবো কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে পরে দেব।’
কিন্তু এরই মধ্যে সরিয়ে ফেলা হয় হার্ডডিস্ক। পরের দিন ফুটেজ চাইলে খবর প্রচার না করার প্রস্তাব দেন ডা. ফয়সাল।
আপনি কি ফুটেজ সরিয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. ওমর ফয়সল বলেন, ‘এটা গুরুত্বপূর্ণ না। আপনি এখন এসব বলে তো লাভ নেই। আমি বলি শোনেন, আপনার জন্য কী করতে হবে সেটা বলেন, আমি করে দেবো।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্ভারে দেখা যায়, ডা. ফয়সাল, রেজিনা সুলতানা ও আরিফুলের হাজিরার মধ্যে ব্যবধান মাত্র কয়েক সেকেন্ড। অক্টোবরের ২১ দিনের মধ্যে ১৭ দিনই ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ফিঙ্গার (আঙুল) দিয়েছেন এ তিনজন। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব?
জানা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে সরকারি হাসপাতালে বসানো হয় ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন। এতে একজনের আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে অন্যজনেরও নিবন্ধন করা যায়। জালিয়াতি বন্ধে ফেইস ডিটেকশন হাজিরা চালু হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবিএম আবু হানিফ বলেন, ‘মানুষের যে-রকম ভালো বুদ্ধিও বাড়ে, সাথে সাথে যে কিছু দুষ্ট বুদ্ধিও যে বেড়ে যাচ্ছে না এমনটা বলা যাবে না। তার জন্য সিস্টেমটাও আপডেট করার জন্য আমরা সচেষ্ট আছি।’
বর্তমানে ৪০০টি সরকারি হাসপাতালে আঙ্গুলের ছাপে বায়োমেট্রিক হাজিরা দেওয়া হয়।



